বাংলা নববর্ষ : বাঙালির সর্বজনীন উৎসব

প্রত্যেক দেশেই কতগুলো জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় উৎসব থাকে। কখনও কখনও কোনো কোনো জাতীয় (অর্থাৎ জাতিগত-সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক) উৎসব রাষ্ট্রীয়ভাবেও উদযাপিত হয়। তেমনি কোনো কোনো রাষ্ট্রীয় উৎসব আর জাতীয় উৎসবও অভিন্ন হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস প্রভৃতি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস), ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস এবং ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পালনের সঙ্গে রয়েছে আমাদের জাতিসত্তার আত্মপরিচয় এবং স্বতন্ত্র জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক সংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রামের ইতিহাস। পক্ষান্তরে পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালনের পেছনে রয়েছে আমাদের হাজার বছরের লোক সংস্কৃতি ও লোক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন। তবে বাংলাদেশে নববর্ষ পালনের পেছনেও রয়েছে জাতিসত্তার আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাঙালি সংস্কৃতির পুনর্নির্মাণের সচেতন প্রয়াস।
পাকিস্তানি শাসকরা বাংলা নববর্ষকে কোনোদিন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে তারা মনে করত ‘হিন্দুয়ানি’। অথচ এটি একটি নিখাদ অসাম্প্রদায়িক লোক উৎসব। মুঘল স¤্রাট আকবর হিজরি চন্দ্রবর্ষ এবং বাংলা সৌরবর্ষকে ভিত্তি করে বাংলা বর্ষ বা বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করেন ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০/১১ মার্চ। তবে এটি কার্যকর বলে গণ্য করা হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। মুঘলদের আগেও বাংলায় ঋতুচক্রের সাথে মিলিয়ে আবর্ত উৎসব বা ফসল উৎসব পালিত হতো। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে একসময়ে বর্ষা শেষে আমন ধান কাটার সময়টিকে, অর্থাৎ হেমন্তের শেষ মাস অগ্রহায়ণ থেকে বছর গণনা শুরু হতো। সেই বিচারে ১ অগ্রহায়ণ ছিল নববর্ষের প্রথম দিন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে ফসলচক্রের বৈশিষ্ট্য এবং বছর শেষে রাজস্ব আদায়ের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই মুঘল স¤্রাট আকবর বাংলা ‘ফসলি সন’ গণনার এই ক্যালেন্ডার চালু করেন। মুঘল আমলে প্রবর্তিত জমিদারি প্রথা রহিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত জমিদার, তালুকদার, রায়ত চাষি ও অন্যান্য বর্গের মানুষ ৩০ চৈত্র পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করত। পহেলা বৈশাখ এ উপলক্ষে আয়োজিত হতো মেলা ও অন্যান্য আনন্দ উৎসব। শুভদিন হিসেবে দিনটিতে ব্যবসায়ীরা নতুন বছরের হিসাবের খাতা চালু করতেন। সে জন্য এখনও পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ খোলার প্রথা বিদ্যমান আছে।
বাংলা নববর্ষের সাথে আমাদের গ্রামীণ জীবন, লোক উৎসব এবং নানা আনুষ্ঠানিকতা যুক্ত ছিল। আজকের মতো ‘নববর্ষ’ উৎসব পালনের ধারণা সামন্ততান্ত্রিক যুগে ছিল না। ছিল বটে বছরের প্রথম শুভদিন হিসেবে তার স্বতন্ত্র মর্যাদা। একসময় হালখাতা অনুষ্ঠানের সাথে কিছুটা ধর্মাশ্রয়ী নানা রীতি-প্রথা, পূজা বা প্রার্থনাও চালু হয়। হিন্দু ব্যবসায়ী, দোকানদার এবং গৃহস্থরা যেমন গণেশ পূজা করত, তেমনি মুসলমানরাও পহেলা বৈশাখে প্রতি গদিতে মিলাদ পড়ানো, মিষ্টি বিতরণ ইত্যাদি চালু করেছিল। মেলাগুলো হতো সর্বজনীন। তবে কিছু ধর্মাশ্রয়ী আচার চালু হলেও বাংলা নববর্ষের দিনটি কখনোই ধর্মীয় উৎসবের দিন ছিল না, ছিল সর্বজনীন বর্ষবরণের দিন।
তবে আজকের নাগরিক মধ্যবিত্ত যেভাবে নববর্ষ পালন করছে তা উৎসারিত হয়েছে প্রথমত; বাংলা নববর্ষকে, বাঙালির স্বতন্ত্র জীবনধারাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে। দ্বিতীয়ত; আধুনিক নাগরিক জীবনে নববর্ষ পালনের জাতীয় গৌরববোধের ধারণাটি এসেছে পাশ্চাত্যের নিউ ইয়ার পালনের প্রভাবে।
ইউরোপ-আমেরিকায় নববর্ষের প্রথম দিনটি রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে অনেক আগে থেকেই গণ্য হতো। পাকিস্তান আমলে পহেলা বৈশাখে ছুটি ছিল না। নাগরিক মধ্যবিত্তের মধ্যে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালনের সূচনা এবং একে বর্তমানে সর্বজনীন বিশাল জাতীয় উৎসবে পরিণত করেছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’। ১৯৬৬ সালে, রমনার বটমূলে (আসলে অশ্বত্থ মূল) পহেলা বৈশাখের সূর্যোদয় থেকে বর্ষবরণ উপলক্ষে ছায়ানট সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে। শুরুর বছরগুলোতে অগ্রসর মধ্যবিত্ত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলে কয়েকশ মানুষ রমনায় মিলিত হতো।
কিন্তু কালক্রমে তা লক্ষ লক্ষ নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং সর্বধর্মের মানুষের ব্যাপকতম সমাবেশ ও সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। চারুকলার ছাত্র-শিক্ষকরা চালু করেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। রাজধানী ঢাকার প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লা বা পাবলিক প্লেসে এখন অসংখ্য সাংস্কৃতিক-সামাজিক সংগঠন নববর্ষ উৎসবের আয়োজন করছে। ঢাকা ছাড়িয়ে এখন দেশের সর্বত্র, শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নানা আয়োজনের ভেতর দিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান পালিত হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পহেলা বৈশাখ জাতীয় ছুটি ঘোষণা করেন।
বাঙালির আত্মপরিচয় ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখ, বিশেষত বাংলাদেশে নতুন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলা ভাষাভাষী ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পর্যায়ে নানা আয়োজনে ঠিক আমাদের মতো করে উৎসব পালিত হয় না। বস্তুত, পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের বাঙালির শ্রেষ্ঠ চিরায়ত জাতীয় উৎসব।
আর এ কারণে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলোর বর্ষবরণ উৎসবকে তাদের আক্রমণের টার্গেটে পরিণত করেছে। কয়েক বছর আগে ছায়ানটের অনুষ্ঠানে বোমাবর্ষণ করে অনেকের প্রাণহানি ঘটিয়েছিল জঙ্গিরা।
কিন্তু জঙ্গি-মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর এই হিং¯্র আক্রমণ পহেলা বৈশাখ নববর্ষ পালনকে বন্ধ বা স্তিমিত করতে পারেনি। বরং মানুষের অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
পহেলা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপন কোনো রাষ্ট্রীয় আদেশ-নির্দেশ বা অর্থানুকূল্যের ওপর নির্ভর করে না। একুশে ফেব্রুয়ারি যেমন ভাষা শহিদদের আত্মদানের ভেতর দিয়ে বাঙালির সর্বজনীন শোক ও গৌরবের দিন হিসেবে পালিত হচ্ছে, তেমনি পহেলা বৈশাখও।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *