বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা সমাজে; সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে

‘সাম্প্রদায়িকতা’ ও ‘মৌলবাদ’ প্রপঞ্চ দুটি বাঙালির সমাজ ও সাহিত্যের প্রভাবশালী অনুষঙ্গ। যুগে যুগে এ অনুষঙ্গগুলো সমাজ ও সভ্যতার দুষ্টক্ষতরূপে আবির্ভূত হয়েছে। একেক যুগের মানুষের জীবনে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ একেকভাবে কাজ করেছে। বাঙালি সমাজে এর উদ্ভব, বিকাশ ও প্রভাব সুদূরপ্রসারী। বহুমাত্রিক প্রবণতা ও ক্রিয়াকর্মের মধ্য দিয়ে বাঙালি সমাজে এর প্রভাব পড়েছে। এক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি নানা ভাবধারা, চিন্তাচেতনা ও রাষ্ট্রনৈতিক নানা প্রপঞ্চ কাজ করেছে। তবে একটি কথা সত্য যে, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ কখনোই বাঙালির মূলচেতনা ও ভাবধারাকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। এর বিপরীতে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতাবাদী চেতনা বাঙালি জীবন ও তার অগ্রযাত্রার পথকে প্রসারিত করেছে।
সমাজ ও জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে বাঙালির শিল্প-সাহিত্যে-সংস্কৃতিতেও সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রভাব পড়েছে। বস্তুত প্রাচীন কাল থেকে বাঙালি জীবনে ধর্মের বাতাবরণে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বীজ উপ্ত হয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্রকাঠামোর বিকাশ ও পরিবর্তনশীলতার সাথে সংগতি রেখে বিভিন্ন যুগে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রকাশভঙ্গিতে কিছু পার্থক্য পরিলক্ষিত হলেও মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করে এর মূল ক্রিয়াকর্ম পরিচালিত হয়েছে। মানুষের অন্ধ ধর্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে সমাজ ও রাষ্ট্রের উচ্চকোটির ব্যক্তি-মানুষ, গোষ্ঠী ও ক্ষমতাসীন অথবা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতি প্রলুব্ধ এলিট শ্রেণিটি তাদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মকে বেছে নিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিষবাষ্প ছড়িয়েছে।
বাঙালি সমাজে প্রধানত হিন্দু ও ইসলামি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কর্মকা- বেশি ক্রিয়াশীল ছিল এবং এখনও আছে। বৌদ্ধ ধর্মে মূলানুগত্য বেশি দিন টেকেনি। যে ধর্মে ঈশ্বর-ভাবনা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেখানে খোদ গৌতম বুদ্ধকেই ভগবান বুদ্ধে পরিণত করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে অসংখ্য দেবদেবীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ফলে গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধধর্ম মূলানুগত্য হারিয়ে নতুন নতুন মতাদর্শ ও আচার-আচরণ সংযোজিত হয়েছে। বৌদ্ধধর্মে এক ধরনের মতান্ধতা-কুসংস্কার প্রকটিত হলেও ‘মৌলবাদিতা’ সৃষ্টির অবকাশ পায়নি। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছে ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে। এ কথা হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপারে যতটা খাটে, বৌদ্ধদের ব্যাপারে ততখানি খাটে না। তবে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলমানদের ক্ষেত্রে সর্বজনীন সত্য হলো এই যে, স্ব স্ব ধর্মের অর্থাৎ একই ধর্মের বিভিন্ন উপসম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর মধ্যেও সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও হানাহানি ঘটেছে।
সাহিত্য সমাজ ও জীবনের প্রতিচ্ছবি। মানুষের প্রাত্যহিক জীবন ও সামাজিক কর্মকা-গুলো, সাহিত্যেও প্রতিফলিত হয়। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ও রক্ষণশীলতার বেশ দৃষ্টিগ্রাহ্য প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ না ঘটলেও বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন উপসম্প্রদায়ের মধ্যেকার বিভাজন স্পষ্টরূপে প্রতিভাত হতে দেখা যায়। ধর্মান্ধ বৌদ্ধদের সাধনার বিচিত্র পদ্ধতি চর্যাপদে নানাভাবে রূপায়িত হয়েছে। হিন্দু মৌলবাদী গোষ্ঠীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ বৌদ্ধদের হাঁফ ছেড়ে বাঁচার উল্লাসধ্বনি শোনা যায় রামাই প-িতের শূন্যপুরাণের মধ্যে। এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের ও পরে নবাগত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের অত্যাচারের কথাও স্থান পেয়েছে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন কবির কাব্যে বিভিন্নভাবে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরোধ-বিসম্বাদের চিত্র যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, তেমনি দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে মিলন ও সংশ্লেষণের অভিপ্রকাশও লক্ষ করা যাবে। বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য, পুঁথিসাহিত্য, চৈতন্য জীবনীসাহিত্য প্রভৃতির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও রক্ষণশীল চেতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। আবার আমাদের লোকসাহিত্যে, গীতি-কাব্য, বাউল সংগীতে এবং বৈষ্ণব সাহিত্যে অভিন্ন মানবিক ও বাঙালি চেতনার সুস্পষ্ট প্রকাশও কারও দৃষ্টি এড়াবে না।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রকাশ ঘটেছে আরও ব্যাপক ও গভীরভাবে। ইতিহাসের উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতায় এক ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অত্যাচারিত হয়েছে। আধুনিক যুগে ইতিহাসের অনুসন্ধান করতে গিয়ে অনেক প্রতিভাবান লেখক প্রকারান্তরে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে উসকে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে মূলত ভারতবর্ষের দুই প্রধান ধর্ম-সম্প্রদায় হিন্দু ও মুসলমানরা একে অপরের মধ্যে বিষোদ্গারের মাধ্যম হিসেবে সাহিত্যকে বেছে নিয়েছে।
সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদকে রাজনৈতিক দানবরূপে আবির্ভূত হতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী। তারা শাসনক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও কুক্ষিগত করতে গিয়ে একেক সময় একেক সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আনুকূল্য পোষণ করেছেন এবং সাম্প্রদায়িক সংকট ঘনীভূত করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা, যেমনÑ প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক, ছোট গল্প প্রভৃতির মধ্যে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
ভারতীয় তথা বাঙালি সমাজে সাম্প্রদায়িকতার মনস্তত্ত্ব সৃষ্টির একটি অদ্ভুত উপাদান হচ্ছে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যকার যুক্তিহীন আবেগ, স্পর্শকাতরতা এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস, সন্দেহ-সংশয়। একজন হিন্দু বা মুসলমান যদি স্ব স্ব ধর্মের কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রের বা ঘটনার অথবা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের নিন্দা বা প্রশংসা করেন, তখন কিন্তু কেউ কাউকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি দেয় না। কোনো মুসলমান আকবর বা আওরঙ্গজেবের সমালোচনা করলে তাকে কেউ সাম্প্রদায়িক বলবে না। কিন্তু বিদ্বিষ্ট না হয়ে, সত্যের অপলাপ না করেও যদি একই সমালোচনা হিন্দু ব্যক্তিবিশেষ (তিনি কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক যা-ই হোন) করেন তা হলে মুসলমানরা তাকে সাম্প্রদায়িক বলে তুলোধুনো করবেন। একই কথা হিন্দুর ক্ষেত্রেও সত্য। অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ বা ঘৃণার মনোভাব পোষণ না করেও কোনো নিষ্ঠাবান ধার্মিক যদি স্বধর্মের গৌরব প্রকাশ ও প্রশংসা করেন তাকে আমরা সাম্প্রদায়িক বলতে পারি না। যেমনটি ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ক্ষেত্রে।
ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরোধ রাজনৈতিক চরিত্রলাভ করে ইংরেজ শাসকদের প্রত্যক্ষ উসকানির ফলে। একপর্যায়ে সাম্প্রদায়িক মতপার্থক্য থেকে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও কলহবিবাদ। সাম্প্রদায়িক চেতনার চূড়ান্ত প্রকাশ লক্ষ করা যায় ১৯৪৭ সালের ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির ফলে। এ সময় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদী উন্মাদনায় অনেক কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক লেখনী ধারণ করেন। ইসলামি তমদ্দুন, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের প্রচার করতে গিয়ে এবং পাকিস্তানকে ইসলামি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে এক শ্রেণির কবি-সাহিত্যিক উঠে-পড়ে লাগলেন। কিন্তু সাময়িকভাবে মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হলেও এই সাম্প্রদায়িক ধারাটি কখনোই মূলধারা হয়ে উঠতে পারে নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা নতুন গতিময়তা অর্জন করে। শাসকশ্রেণির রবীন্দ্র-বিরোধী, বাঙালি সাহিত্য-সংস্কৃতি বিরোধী এবং ইসলামিকরণের ষড়যন্ত্র-বিরোধী সংগ্রাম এবং বাঙালির জাতীয় জাগরণ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবল আবেগ বাঙালির সমাজ ও সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই দৃঢ়মূল করে। বিকশিত হয় বাঙালির সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক জাতি-চেতনা এবং জাতি-রাষ্ট্র গঠনের সংগঠিত আন্দোলন।
বাঙালি সমাজ, বাংলা সাহিত্য তথা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিকভাবে এসে যায় পুঁজিবাদী পরাশক্তিগুলোর ক্রিয়াকর্মের কথা। সা¤্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন ও ¯œায়ুযুদ্ধের অবসানের পর একমেরু নতুন বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একপাক্ষিক কর্তৃত্ব মৌলবাদী শক্তির উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারিত্ব ঠেকাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের সহযোগিতায় এবং সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল দেশগুলোর অর্থানুকুল্যে তালেবান সন্ত্রাসীদের গড়ে তোলে। বিন লাদেন ও তার আল-কায়দা গোষ্ঠীও সোভিয়েত-বিরোধী জিহাদে যুক্তরাষ্ট্রের মদদ পেয়েছে। কেবল আফগানিস্তান নয়, পাকিস্তান, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন দেশে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো তাদের অর্থে জন্ম দিয়েছে একাধিক সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠী। অনেক সময় এই জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো পরাশক্তিসমূহের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর তাদের টনক নড়ে। এরপর আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক অভিযানের পর মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের তৎপরতা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে।
সোভিয়েত-বিরোধী জিহাদের সময়ে শুরু হয়ে আফগানিস্তানে তালেবানি ট্রেনিং গ্রহণ করে অনেক মুজাহিদ দেশে ফিরে আসে এবং বিভিন্ন মাদ্রাসাকে তাদের কর্মকা-ের নিরাপদ স্থানরূপে বেছে নেয়। শুধু তাই নয়, ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগান’ এমন স্লোগান তুলতেও তারা দ্বিধাবোধ করেনি। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে এই জঙ্গিগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক শক্তি অর্জন করে। এরা মিত্র হিসেবে খুঁজে পায় ভারতবর্ষের মৌলবাদী শক্তির পুরনো সংগঠন জামাতে ইসলামকে। সাংগঠনিক ও জঙ্গি কার্যক্রম চালানোর জন্য তারা নামে-বেনামে নানা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে। একদিনে বাংলাদেশের প্রায় সবক’টি জেলায় বোমা ফাটিয়ে তারা তাদের শক্তির জানান দেয়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকা- ও প্রগতিশীল চিন্তার বাহকদের তারা নিজেদের প্রতিপক্ষ মনে করে তাদের হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। এককথায় বাংলাদেশ হয়ে ওঠে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অভয়ারণ্য। এই সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর মদদপুষ্ট এক শ্রেণির লেখক ও বুদ্ধিজীবী লেখনী ধারণ করেন। তাদের সাহিত্যে ঘটে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের প্রভাব।
আমরা আগেই বলেছি, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বাঙালি সমাজ ও বাংলা সাহিত্যে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করলেও মূল বাঙালি জনগোষ্ঠীকে ও বাংলা সাহিত্য-বাঙালি সংস্কৃতিকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। প্রাচীনকাল থেকেই অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ধারাকে বাঙালি সমাজ ও এখানকার সাহিত্যিকগণ লালন করেছেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, সম্প্রদায়Ñ সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে তারা মানবতার জয়গান গেয়েছেন। চ-ীদাস, নানক, কবীর, দাদু, লালন শাহ এরা সবাই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথাই তাদের সাধনার মাধ্যমে প্রচার করেছেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান সাহিত্যিকেরা সবার ওপরে মানবতাকে স্থান দিয়েছেন। ধর্মীয় উন্মাদনায় ভারত-পাকিস্তান নামের রাষ্ট্র তৈরি হলেও বাঙালিরা লালন করেছে অসাম্প্রদায়িকতাকে। সেজন্য ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে এসে তারা জন্ম দিয়েছে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশের মূলধারার কবি-সাহিত্যিকগণ মানবতাবাদী ধারাকে তাদের সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বুকে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল, মানবতাবাদী ভাবধারা প্রকাশে তারা লেখনী সঞ্চালন করে যাচ্ছেন। হুমায়ুন আজাদের মতো লেখকসহ অনেক প্রগতিশীল অধ্যাপক, প্রকাশক, ব্লগার এবং সংস্কৃতিকর্মী জঙ্গিগোষ্ঠীর হিং¯্র আক্রমণের শিকার হয়েছেন; জীবন দিয়েছেন। হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও খ্রিস্টান যাজক যেমন আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন তেমনি মুসলমান মুসল্লিরাও বাদ যান নি। জঙ্গিদের হাতে নিহত হয়েছেন বিদেশি নাগরিক এবং নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। কিন্তু এতে করেও বাঙালি জাতিকে ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদিতার ফাঁদে ফেলা যায় নি। বাঙালি জাতির অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক চৈতন্যই তাকে সংশ্লেষণের ধারায় পুষ্ট করেছে। এই সংশ্লেষণ এবং অসাম্প্রদায়িকতাই হচ্ছে বাঙালির মূল চেতনা এবং বাংলা সাহিত্যের মূলধারা।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *