বিএনপির কমিটি-লেজে গোবরে

বিএনপির কাউন্সিলের প্রায় পাঁচ মাস পর গত ৬ আগস্ট দলটির পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গত ১৯ মার্চ বিএনপির জাতীয় সম্মেলনে চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার ক্ষমতা দেন কাউন্সিলররা। কাউন্সিল হওয়ার ১০ দিন পর মহাসচিব, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও কোষাধ্যক্ষের নাম ঘোষণা করা হয়। পরে পর্যায়ক্রমে তিন দফায় যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদকসহ কমিটির ৪২ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। এই কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে ৩৫ জন, যুগ্ম মহাসচিব পদে ৭ জন, নির্বাহী কমিটির সম্পাদক পদে ২০৯ জন, নির্বাহী কমিটির ২৯৩ সদস্যের নামও ঘোষণা করা হয়। আর উপদেষ্টা পদে এখন পর্যন্ত জায়গা পেয়েছেন ৭৩ জন সদস্য। সর্বমোট ৫৯৪ সদস্যের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির দুটি পদ খালি রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দুটি, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুববিষয়ক সম্পাদকের ৫টি পদ ফাঁকা রয়েছে। ৫৯৪ সদস্যের এই কমিটিতে ঠাঁই পেয়েছে অন্তত ১১৩ নতুন মুখ। এখানে সম্পূর্ণরূপে দলের গঠনতন্ত্রকে যে সংখ্যার উল্লেখ আছে তার চেয়ে বেশি সদস্য রাখা হয়েছে। বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুয়ায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি হবে অনূর্ধ্ব ৩৫১ সদস্য বিশিষ্ট (যঃঃঢ়ং://িি.িনহঢ়নফ.ড়ৎম/ঢ়ধমব/ফবঃধরষং/৪৫৭)। তবে দলের চেয়ারম্যান বিশেষ ক্ষেত্রে ৩৫১ জনের ওপর ১০ শতাংশ বেশি সংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি গঠন করতে পারেন। সেই হিসাবে ৩৫১ জনের স্থলে নির্বাহী কমিটিতে আরও ৩৫ জন বেশি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, মোট সদস্য কোনোমতেই ৩৮৬ জনের বেশি হবে না। এর মধ্যে আবার স্থায়ী কমিটির দুটি পদ খালি রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দুটি, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও যুববিষয়ক সম্পাদকের ৫টি পদ ফাঁকা রয়েছে। গঠনতন্ত্রের সংখ্যার বৃত্ত নিজেরাই ভেঙেছে। আর গঠনতন্ত্র নির্ধারিত ১৭ ভাইস চেয়ারম্যানের বিপরীতে ৩৫ জনকে এই পদ দেওয়া হয়েছে। মোদ্দাকথা হলো যে দল নিজেরাই দলের গঠনতন্ত্র মানে না তবে দলটি দল কি করে পরিচালনা করবে, দলের আদর্শই বা কি, পাশাপাশি প্রশ্ন তো থেকেই যায় আদৌ তারা দেশের সংবিধান মানবে কি বা জনগণের ভাষাই বা বুঝবে কি করে?
২০০৮ সালের বিএনপির সর্বশেষ কমিটির সদস্য ছিলেন ৩৭১ জন। ছাত্রদলের কমিটিতেও গঠনতন্ত্রের কাঠামো তোয়াক্কা না করে ৭০০ জনের কমিটির মতোই বিএনপিরও একই অবস্থা। ১৯ মার্চের কাউন্সিলে দলীয় গঠনতন্ত্র সংশোধন করে এক নেতার এক পদ যুক্ত করা হয়েছে। নতুন কমিটিতে তাও মানা হয়নি। এই কমিটি নিয়ে জনগণের তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না যতটা ছিল দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে। দীর্ঘদিন পর কমিটি হওয়ায় দলের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রতিক্রিয়া যা হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে। তাদের দলের নেতা-কর্মীদের নামে-বেনামে বিরূপ মন্তব্য ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশের সেনাছাউনিতে জন্ম নিয়ে বিএনপির যতটা আদর্শিক রাজনীতি করে তার চেয়ে তাদের আগ্রহ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি, এর কারণও তাদের প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়াতেই নিহীত। কারণ দলটির জন্ম হয়েছিল সরাসরি দখলকৃত ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়। এ প্রসঙ্গে ‘বিএনপির সময় অসময়’ বইয়ের লেখক মহিউদ্দীন আহমদ লিখেছেনÑ ‘জিয়া বিএনপি তৈরি করেছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে। ওই সময় যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন, তারা যে বিএনপির আদর্শের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন তা হয়তো বলা যাবে না। প্রাপ্তিযোগের ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল সন্দেহ নেই। তবে আদর্শের ব্যাপারটা যে একেবারে ছিল না তা নয়। যারা আওয়ামী লীগ বা কমিউনিস্ট রাজনীতি পছন্দ করেন না তাদের তো একটা অবলম্বন দরকার, বিএনপি হয়ে দাঁড়াল ওই রকমের একটা প্লাটফর্ম।’ [পৃষ্ঠা-৩১৯]
বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার বইতে আরও সত্য প্রকাশ করেছেনÑ ‘বিএনপির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এই দলের জন্ম কোনো স্বাভাবিক সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে হয়নি।Ñ একদিকে ছিল সুযোগসন্ধানী, সুবিধাবাদী, গণবিরোধী, স্বার্থপর এবং রাজনৈতিকভাবে সমাজে ধিক্কৃত ব্যক্তিরা।Ñ বিএনপির জন্ম হয়েছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে।’ [চলমান ইতিহাস : জীবনের কিছু সময় কিছু কথা, ১৯৮৩-১৯৯০, পৃষ্ঠা : ১৫৯-১৬০] যদিও মওদুদ সাহেব নিজেই দলছুট রাজনীতি বিশ্বাস করেন এবং অনেকটি দল তিনি পাল্টে বর্তমানে বিএনপিতে আছেন আর বাড়ি দখলের অভিযোগে এখন তাকে দখলিকৃত বাড়িটি ছাড়তে হবে, যা রাজনীতির ইতিহাসে ন্যক্কারজনক ঘটনা।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর জাতীয় কাউন্সিল শেষে ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি ৩৮৬ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়। ২০১১ সালের ১৬ মার্চ মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর ৬ এপ্রিল সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার পর থেকে তিনি এখনও ভারপ্রাপ্তই আছেন। পঞ্চম কাউন্সিলে দল ঘুরে দাঁড়ানোর কথা উঠেছিল; কিন্তু দলের ভেতরে-বাইরে রাজপথে সর্বত্রই ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সাংগঠনিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে দলটি। সেটা ঘুচাতে ছয় বছর পর ১৯ মার্চ ছিল বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিল। কাউন্সিলে খালেদা জিয়া শুধু বক্তব্য দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেন নি বা নিতে পারেন নি; বরং দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের অসাংগঠনিক কর্মকা- তৃণমূল নেতারা তুলে ধরেছেন, যা কাউন্সিলের আগেই কয়েক নেতা বিবৃতিতে বলেছিলেন কিন্তু এতটা তোপের মুখে কেন্দ্রীয় নেতারা পড়বেন তা হয়তো তারা আশা করেন নি। যেহেতু ক্ষমতা কেন্দ্র থেকে জন্ম, তাই দেখা যায় বিএনপি কখনই রাজপথে নিজেদের মেলে ধরতে পারে নি।
বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল এর আগে দলের নেতৃত্ব বহুবার বলেছিল যে কাউন্সিল হলে দল চাঙা হবে, তা তো হয়নি বরং উল্টোটাই হয়েছে, দলের মধ্যেই বিদ্রোহের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। যদিও এতে দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। কারণ বিএনপি এখন কার্যত বিরোধী দল নয় এবং সংসদে তারা নেই। গত কয়েক বছরে বিএনপি কোনো সুষ্ঠু রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারেনি, যখন সংসদে ছিল (২০০৯-১৩) তখনও ভালো ভূমিকা রাখেনি, এখন সংসদের বাইরে থেকেও কার্যত দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই, যা জনগণকে কাছে টানবে। বরং আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মেরে, যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষ নিয়ে এখন তারা জনগণ থেকে দূরে সরে গেছে, উল্টো বর্তমান সরকারের কর্মপ্রচেষ্টায় বাংলাদেশের মানুষ এখন উন্নয়নের সুফল উপভোগ করছে।
বিএনপি কমিটির পর সার্কাস চলল। হাস্যকরভাবে নাটক চলল। পাল্টাপাল্টি দোষারোপের খেলা চলল। বিএনপি থেকে আগেই শমসের মবিন চৌধুরী (উনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশ পাঠাতে সব ব্যবস্থা করেছিলেন) পদত্যাগ করেছেন। কমিটি দেওয়ার পর মোসাদ্দেক আলী ফালুসহ আরও কয়েকজন পদত্যাগ করেছেন, কয়েক জেলার নেতাও দল ছেড়েছেন। খালেদা জিয়া বলতেন তার সাথে নাকি দেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ আছে, এখন তো দেখা যাচ্ছে তার সাথে দলের লোকই নেই, নইলে তারা দল ছাড়বে কেন? মানুষ রাজনীতি করে সুনির্দিষ্ট আদর্শ নিয়ে। দলের নেতৃত্ব সেই আদর্শ ঠিক করে দেয় জনগণকে সম্পৃক্ত করতে, জনগণ নিয়ে কাজ করতে। দলের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা না থাকলে সেই দল করবে কি করে, আর জনগণকেই বা কি বোঝাবে। এখন এই পদত্যাগ পদত্যাগ খেলাই তো প্রমাণ করে বিএনপি দলই ঠিক নেই। গণতান্ত্রিক চর্চা বা আন্দোলনই বা কেমনে করবে, দেশ ও জাতিকে কি দেবে? নিজেরাই তো সংকটে। আরও আশঙ্কা ও হতাশার ব্যাপার হলো, দলে গণতান্ত্রিক চর্চাও নেই।
বিএনপির এই কমিটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বংশধরদের এমনকি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামিসহ বিভিন্নভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে, যা সতিই ভয়াবহ। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার অন্যতম আসামি সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে এবারও সহ-সভাপতির পদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে কারাবন্দি লুৎফুজ্জামান বাবরকেও সদস্য করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদ-ে দ-িত সালাউদ্দিন কাদেরের পুত্রকে সদস্য এবং সাকার ভাই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীকে কমিটিতে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ দেওয়া হয়েছে। আবার যুদ্ধাপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে মৃত্যুবরণকারী আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীমকে নির্বাহী কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সারা জাতির সাথে, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ২ লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন সবার সাথেই প্রতারণা করেছে। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের খবরে আলোচিত আগের কমিটির সহ-দফতর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুকেও রাখা হয়েছে। বিএনপি যে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের দল, তা আবারও প্রমাণ হলো। পারিবারিক ও আত্মীয়তার কল্যাণে (!) পদ পেয়েছেন অনেকে, যার মধ্যে দলের সিনিয়র নেতাদের ছেলে-মেয়েরাই বেশি, প্রয়াত মহাসচিব ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদ, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই মির্জা ফয়সল আমিন, মির্জা ফখরুলের ভগ্নিপতি  লে.  জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছোট ছেলে খন্দকার মারুফ হোসেন, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমির, মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, মির্জা আব্বাসের ছোট ভাই মির্জা খোকন, আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে তাবিথ আউয়াল, তরিকুল ইসলামের ছেলে অনিন্দ্র ইসলাম অমিত, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মেয়ে অপর্ণা রায়, নিতাই রায় চৌধুরীর মেয়ে নিপুণ রায় চৌধুরী, নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টুর স্ত্রী নাসিমা আখতার কল্পনা, সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ, এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার স্ত্রী সাহিদা রফিক, সাবেক মন্ত্রী হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খান রীতা, প্রয়াত হুইপ জাহেদ আলী চৌধুরীর ছেলে ফাহিম চৌধুরী, প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু, এম শামসুল ইসলাম খানের ছেলে মইনুল ইসলাম শান্ত, শাজাহান সিরাজের স্ত্রী রাবেয়া সিরাজ, আলমগীর কবিরের ভাই আনোয়ার হোসেন বুলু, মীর নাছির উদ্দিনের ছেলে মীর হেলাল উদ্দিন, অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। নতুন কমিটিতে একই পরিবারের সদস্যের আধিক্যও রয়েছে। এভাবে কমিটিতে আত্মীয়-স্বজনদের প্রাধান্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের হেয় করা হয়েছে। যা দেশের রাজনীতিতে নজিরবিহীন ঘটনা, যেন পারিবারিক-আত্মীয়তার কমিটি।
আবার দলের ভেতর-বাইরে অনেকে বলছেন, কমিটিতে ‘কট্টরপন্থি’ নেতারাই গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন, যদিও বিএনপি একটি ডানপন্থি দল হিসেবে পরিচিত সেখানে কট্টরদের প্রাধান্য পাওয়াই স্বাভাবিক। একই সাথে কমিটিতে দুর্নীতিবাজ, বিতর্কিত, পৌর, উপজেলা ও ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন এবং পদবাণিজ্যের সাথে জড়িত নেতারা ভালো পদ পাওয়া নিয়েও নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ আছে। পাশাপাশি সাবেক সামরিক-বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ীদের আধিক্য রয়েছে। এমনকি দলে ব্যাপকভাবে আলোচিত একটি সিন্ডিকেটের সাথে সুসম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্যরাও গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি পেয়েছেন। নেতাদের স্ত্রী-সন্তান স্থান পেয়েছে একডজন। কাউন্সিলে সংশোধিত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ‘এক নেতার এক পদ’ নীতি কার্যকর করতে পারেনি বিএনপি। বিগত দিনে আন্দোলনে যাদের ভূমিকা ছিল না, তাদের মধ্য থেকে অনেকেই কমিটিতে স্থান পান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অনেকে বলছেন, বিএনপির বিশাল কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা এখন রাজপথে নামলে একটি মিছিল হয়ে যাবে। তারা নিজেরা রাজপথে নেমে কর্মীদের ডাক দিতে পারেন। তবে রাজনীতি বিএনপির অনেকটা দুই অফিসকেন্দ্রিক, রাজপথে তাদের কোনো কার্যকর গণতান্ত্রিক ভূমিকা নেই।
বিএনপির কমিটি নিয়ে ছোটবেলার পাড়ার বড় মাঠে ফুটবল খেলার স্মৃতি মনে পড়ছে। বিকেলে আমরা যখন খেলতে যেতাম। বড় মাঠ, সবাই খেলতে আসত। সিনিয়র-জুনিয়র সবাই, একটাই মাঠ, দুটো বারপোস্ট, প্রথমে খেলা শুরু হতো আসরের নামাজের পর। তারপর খেলোয়াড় বাড়তে থাকত, খেলা চলতে থাকত, প্রথম দুই গ্রুপে হয়তো সাতজন সাতজন করে, তারপর লোক বাড়ায় ১০ জন ১০ জন, আরও লোক বাড়লে যার যে পক্ষে মন চায় সেপক্ষে খেলবে, ১১ জনের বেশি হলেও দুই পক্ষে ভাগ হয়ে খেলত। কারণ কাউকে তো বাদ দেওয়া যায় না, সবাই পাড়ার পরিচিত। সবাই খেলতে চায়, তাই নিয়মের কোনো বালাই নেই, দেখা যায় এক দলে ১৫ জন আরেক দলে ১৩ জন। আর ফুটবল যেদিকে সেদিকে সবাই দৌড়ায়, সবাই স্ট্রাইকার, কেউ ডিফেন্স বা গোলকিপার হতে চায় না। খেলা চলে টাইমট্যাবল ছাড়াই, যে যখন মন চায় নামে, আবার উঠে, সন্ধ্যা নামলে খেলা শেষ। খেলা শেষে যে যার যার ঘরে ফেরাÑ নতুবা আড্ডা। বিএনপির কমিটি হয়েছে পাড়ার এই সার্কাস মার্কা ফুটবল খেলার মতো। কাউকেই বাদ দেওয়া যায় না তাই সবাইকে রাখ। তবে রাজনীতি কিন্তু পাড়ার ফুটবল মাঠ নয়, এটা হয়তো তাদের মাথায় নেই।
কমিটি দেওয়ার পর স্থায়ী কমিটির মিটিং হলো সেখানে মাত্র ১০ জন উপস্থিত, বাকিরা অনুপস্থিত। স্থায়ী কমিটির দু-একজন তো গণমাধ্যমে বলেই ফেলেছেন, তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। তারেক রহমান এখন দ-প্রাপ্ত আসামি। বিদেশে অর্থপাচার মামলায় সাত বছরের জেল এবং ২০ কোটি টাকা জরিমানার শাস্তি পেয়েছে, আপিল না করলে আগামী নির্বাচনে তারেক অংশগ্রহণ করতে পারবে না। স্থায়ী কমিটির সভায় যেসব আলোচনা হয়েছে তাতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, গঠনতন্ত্র তোয়াক্কা না করে গঠিত কমিটিই বহাল থাকবে। আলোচনা হয় দল পুনর্গঠন নিয়ে। এই দল পুনর্গঠন বর্তমানে দলের নেতাকর্মী ও মানুষের কাছে হাস্যরসে পরিণত হয়েছে কারণ, বেগম জিয়া বিগত কয়েক বছর ধরে শুধু দল পুনর্গঠন হবে বলে নেতাদের চাঙা করতে চাইছেন। মির্জা ফখরুল তো বলেছিলেন কাউন্সিলের পর দল ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে। কোনো কিছুই হয়নি; বরং জনগণ থেকে আরও দূরে সরে গেছে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করায়, গুপ্তহত্যায় বিএনপির নেতাদের নাম আসায়। দল পুনর্গঠনে কার্যত খালেদা জিয়া ব্যর্থ হয়েছেন, হরতাল অবরোধে পেট্রলবোমা মেরে জনমতে ত্রাসের জন্ম দিয়ে ব্যর্থ মনোরথে বাড়ি ফেরেন। কাউন্সিল হলো, কমিটি হলো কোনো দলের নেতা-কর্মীদের চাঙা করতে ব্যর্থ হলো, আসলে আদর্শিক রাজনীতি না করে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করলে এমন অবস্থা হওয়াটাই স্বাভাবিকÑ এই উপলব্ধি হয়তো তাদের হয়নি।
পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাধীনতাবিরোধী দল জামাতকে বিএনপি ছাড়বে কিনা? বিএনপির শুভাকাক্সক্ষী এমাজউদ্দীন সাহেব জামাত ছাড়ার আশ্বাস দিলেও দলের মহাসচিব সরাসরি বললেন, এমাজউদ্দীন দলের কেউ নন, জামাতের সাথে সম্পর্ক ছেদ হবে না। বিএনপির আরেক শুভাকাক্সক্ষী ডা. জাফরুল্লাহ বেগম জিয়াকে জামাত ছাড়তে খোলাচিঠি দিলেও এ নিয়ে তেমন কোনো মন্তব্য বা আলোচনা নেই দলের ভিতর; বরং গত মাসের শেষ দিকে ২০ দলের আলোচনায় জামাতের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন, সেখানের আলোচনা থেকে বোঝা যায় জামাতকে বিএনপি ছাড়বে না; বরং একসাথে থেকে সম্পর্ক আরও কীভাবে শক্তিশালী করা যায় এই চিন্তা-ভাবনা তাদের। অথচ জামাত দল হিসেবে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার যোগ্যতা হারিয়েছে, নির্বাচন কমিশন জামাতের নিবন্ধন বাতিল করেছে, তবে জামাতের ভোট বিএনপিতে পড়বে এটা নিশ্চিত বলা যায়। এই স্বাধীনতাবিরোধী দলকে সাথে নিয়ে অপবাদের পাল্লা ভারী করেই চলবে বিএনপি। যদিও সম্পর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি ও গঠনই বলে দেয় বিএনপি-জামাত আত্মার আত্মীয় এবং একে অন্যের সাথে অচ্ছেদ্য সম্পর্কÑ যা বলবৎ ছিল, আছে এবং থাকবে।
প্রশ্ন হচ্ছে, যে দল ঠিকমতো কমিটি দিতে পারে না, তারা দেশ কী পরিচালনা করবে? মানুষকেই বা কী দেবে? বিএনপির এই কমিটিই বলে দেয় রাজনীতির শুভ পথে তারা নেই; বরং তাদের লক্ষ্য হলো যে কোনোভাবে ক্ষমতায় যাওয়াÑ দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া। জিয়াউর রহমান যেমন যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেছিল, খালেদা জিয়া এখন যুদ্ধাপরাধীদের বংশধরদের পুনর্বাসন করছেন, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। আর বিএনপির রাজনীতি যে শুধু আওয়ামী লীগ বিরোধীদের ক্লাবÑ এটাও পুনরায় স্পষ্ট হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *