বিজয়ের মাত্র দু’দিনের মাথায় ফকা চৌধুরী ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সময় লুটে নেয়া প্রায় দেড় মণ ওজনের স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি নৌযানে পালানোর চেষ্টা করে।

সাকা চৌধুরী কারা অভ্যনত্মরে মৃত তার পিতা ফকা চৌধুরীর মৃত্যুর বিচার চাচ্ছেন। আলবত বিচার হওয়া উচিত। ফকার বিচার হওয়া উচিত স্বাধীনতাবিরোধী, দেশদ্রোহী, যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। কারা অভ্যনত্মরে পিতার মৃত্যুতে বিচার দাবি করেছেন চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের (ফকা) চৌধুরীর ছেলে সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। তাঁর এই দাবি নতুন নয়। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকারীদের ফাঁসির পরের দিন এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি আবার কারা অভ্যনত্মরে তাঁর পিতার মৃত্যুর বিচার দাবি করছেন। ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, সাকার এই আস্ফালন ‘৭১-এর অপকর্মের দায় থেকে নিজেকে বাঁচানোর অপচেষ্টা। বিশেষভাবে উলেস্নখ্য, চট্টগ্রামে গুডস হিলে ফকার বাসভবন ছিল পাকবাহিনীর টর্চার ক্যাম্প। ফকা-সাকা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নতুন সিংহসহ স্থানীয় শত শত মুক্তিকামী মানুষকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত। বিজয়ের মাত্র দু’দিনের মাথায় ফকা চৌধুরী ১৯৭১ সালের ১৮ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের সময় লুটে নেয়া প্রায় দেড় মণ ওজনের স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি নৌযানে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বিধি বাম। আনোয়ারা উপজেলার গহীরা উপকূলে ধরা পড়ে যান। পরে তিনি আটক অবস্থায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হার্ট এ্যাটাকে মারা যান।
মীরজাফর মোশতাক গোলাম আযম আর নিজামীদের নামের ধারায় বাংলাদেশে পরিচিত এই ফজলুল কাদের চৌধুরী। ‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এদেশে পাকবাহিনীর অন্যতম দোসর ফকা চৌধুরীকে বাংলাদেশের মানুষ আদ্যপানত্ম জানে। রক্তপিপাসায় উন্মত্ত পাক হায়েনার নারী ধর্ষণ, অগি্নসংযোগ, লুটপাট আর মুক্তিযোদ্ধা হত্যার মতো ঘৃণ্য কর্মে ফকা চৌধুরীর সম্পৃক্ততা প্রায় চার দশক আগের কথা। স্বদেশ আর স্বজাতির বিরম্নদ্ধে ফকা চৌধুরীর এক বুক ঘৃণা-বিদ্বেষের শিকার চট্টগ্রামের প্রত্যনত্ম জনপদের অনেক মানুষ এখনও সেদিনের দুঃসহ স্মৃতির পাতায় ফিরে গেলে অাঁতকে ওঠেন। স্বাধীনতাপরবর্তীতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে ফকা চৌধুরী কারাবন্দী হন। কারাবন্দী থাকা অবস্থায় হার্ট এ্যাটাকে মারা যান তিনি। এখন হার্ট এ্যাটাকে মারা যাওয়ার ঘটনার বিচার দাবি করছেন সাকা চৌধুরী।
ফকা চৌধুরীর হাতে ‘৭১-এর নির্মম নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলো, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সংগঠন যুদ্ধাপরাধের হাতে ফকা চৌধুরীর বিচারের দাবি অব্যাহত রেখেছে। সেক্টর কমান্ডার ৫০ জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর যে তালিকা তৈরি করেছে তাতে ১৫ নম্বর নাম হচ্ছে সাকা চৌধুরীর এবং ১৬ নম্বর নামটি হচ্ছে ফকা চৌধুরীর। এখন প্রশ্ন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার বিচার হবে নাকি কারাভ্যনত্মরে মৃতু্যর বিচার হবে। তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরম্ন হলে ফকা-সাকা কেউই রেহাই পাবেন না বলেই মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের বক্তব্য। আর সেই শঙ্কা থেকেই বঙ্গবন্ধু মামলায় খুনীদের ফাঁসি হওয়ার পর সাকার হৃদকম্পন বেড়ে গেছে এবং কারাভ্যনত্মরে পিতার স্বাভাবিক মৃতু্যর ঘটনায় তিনি বিচার দাবি করছেন।
সাকা চৌধুরী নিজেই গত বছরের আগস্ট মাসে এক সভায় বলেছেন, যেহেতু আমার বাবা একাত্তরে পাকিসত্মানের পৰে ছিলেন তাই তার সনত্মান হিসেবে আমাকে স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে চিহৃিত করা হয়। ফজলুল কাদের চৌধুরী মুসলিমের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি তৎকালীন পাকিসত্মান মুসলিমলীগ (কনভেনশন) সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশের মানুষ যখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিহত করতে ফকা গঠন করেন স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। চট্টগ্রামে গুডস হিলে তাঁর বাসভবন ছিল পাকবাহিনীর টর্চার ক্যাম্প। সেই টর্চার ক্যাম্প থেকে সেদিন গগনবিদারী চিৎকার ভেসে আসত। গুডস হিলের বাসভবনে পাকবাহিনী ও ফকা-সাকা বাহিনীর নির্মম হত্যা-নির্যাতনের শিকার মুক্তিযোদ্ধাদের আহাজারিতে এই পাষ-ের হৃদয় গলেনি।
১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল। নিজের প্রতিষ্ঠিত রাউজানের কু-েশ্বরী ঔষধালয়ে কাজ করেছিলেন চট্টগ্রামের কৃতী পুরম্নষ নতুন চন্দ্র সিংহ। তাঁর প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ করে ঢুকে পড়ে পাকবাহিনী। তবে ধর্ম -বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের জন্য নতুন সিংহের কল্যাণকর্মের কার্যক্রম দেখেশুনে ফিরে যান পাকবাহিনীর ক্যাপ্টেন বালুচ। কিন্তু কিছুৰণ পরেই ফকা-সাকার নেতৃত্বে পরিচালিত একটি রাজাকার গ্রম্নপ পাক বাহিনীর ঔই সেনাদের আবার নিয়ে আসে। কিন্তু ঘটনা অাঁচ করতে পেরে মন্দিরে প্রবেশ করে প্রাণ বাঁচাতে প্রার্থনায় বসে যান নতুন সিংহ। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। নতুন সিংহকে মন্দির থেকে টেনেহিঁচড়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে রাজাকাররা ফেলে দেয় পাকবাহিনীর পায়ের কাছে। পাকবাহিনীকে গুলি করতে বিলম্ব দেখে সাকা নিজেই বুকে পাঁজরে বাম চোখের নিচে ও বাহুতে উপর্যুপরি গুলি করেন। নিজ প্রতিষ্ঠানের সামনে মৃতু্য হয় নতুন সিংহের। অশ্রম্নসিক্ত নয়নে এভাবেই ওয়ারক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রতিনিধিদের কাছে পিতৃ হত্যার চিত্র বর্ণনা করেন নতুন চন্দ্র সিংহের ছেলে পিআর সিংহ। পিআর সিংহ আরও বলেন, ‘সাকা ও তাঁর বাহিনীর হাতে খুন হওয়া ব্যক্তি কেবল আমার বাবাই নন, এভাবে খুন করা হয়েছে ৬৭ জনকে। এরপর রাজাকার সাকা স্বাধীন বাংলাদেশে ঘুরেছেন বীরদর্পে। যে জাতীয় পতাকার জন্য আমার বাবাসহ ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে সেই পতাকা গাড়িতে নিয়ে যখন সাকা ঘুরে বেড়ান তখন বাবার মৃতু্যটা অনেক বেশি কষ্ট দেয়।
ফকা চৌধুরীর গুডস হিলে নির্যাতনে শিকার ওই সময়ে রয়টারের সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন। তিনি সাম্প্রতিক এক স্বাৰাতকারে বলেছেন, একাত্তরের জুলাইয়ে মিরাজনগরের হাজারী লেনে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বৈঠককালে সাকা তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে এসে আমাদের ঘিরে ফেলে এবং গুডস হিলের বাড়িতে ধরে নিয়ে যায়। ১৪ দিন সেখানে চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। পানির পিপাসায় গুডস হিলে বন্দী অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত তখন ওরা বাপ-বেটা মিলে প্রস্রাব করে মুক্তিযোদ্ধাদের পান করতে বাধ্য করত। তিনি জানান, গুডস হিলের নির্যাতন কৰে ছিল একটি টেবিল। টেবিলে গাঁথা ছিল তিন ইঞ্চি মাপের অনেক পেরেক (নেইল)। মুক্তিযোদ্ধাদের সেই পেরেকের ওপর শুইয়ে ওপর থেকে তক্তা দিয়ে চেপে ধরা হতো। ফলে বন্দী মৃক্তিযোদ্ধাদের সারা শরীর ৰতবিৰত হতো। ফকার গুডস হিলে এভাবে নির্যাতিত হওয়া মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক সর্দার ১৯৮০ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ‘৭১ সালে ফকা-সাকা ও তাদের পরিবার রাউজানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। কেবল নতুন সিংহকে নয়, তখন হত্যা করা হয়-আব্দুল মান্নান, পঙ্কজ বড়ুয়া, জাফর আলম চৌধুরী, বিকাশ বড়ুয়া, শামসুল আলম, মুসা খান, শফিকুল আলম, রম্নহুল আমিন, সুবেদার আবুল কাশেম, সুবেদার বাদশা মিয়া, সুবেদার নুরম্নল আমিন, সুবেদার আবুল বশার, এজাহার মিয়াসহ ৬৭ মুক্তিযোদ্ধাকে খুন করেছে। পঙ্গু করেছে অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। নারী ধর্ষণ আর অগি্নসংযোগেও তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন না।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয় ১৯৮৩ সালে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র’ নামে গবেষণাধর্মী তথ্য সমৃদ্ধ বই প্রকাশ করেছে। এই প্রকাশনায় ফকা চৌধুরী ও তার বড় ছেলে সাকা চৌধুরীর যুদ্ধাপরাধের বিসত্মারিত তথ্যচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে রাউজান থানাতেই ফকা চৌধুরী ও সাকা চৌধুরীর বিরম্নদ্ধে কমপৰে ছ’টি মামলা দায়ের করা হয়। ‘৭১-এর মাঝামঝি সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে আহত হন সাকা চৌধুরী । পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি পাকবাহিনীর সহায়তার লন্ডনে চলে যান। ‘৭৫-এর আগস্ট ট্র্যাজেডির পর তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালে রাউজান থানায় যে ছ’টি মামলা ফকা এবং সাকার বিরম্নদ্ধে হয়েছিল সেটি পুনরম্নজ্জীবিত করলেই যুদ্ধাপরাধের দায়ে পিতা-পুত্রের বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব। সাকা চৌধুরী পিতার মৃতু্যর বিচার চান। অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধারা ‘৭১-এ যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফকা চৌধুরীর বিচার দাবি করছেন। দু’পৰেরই দাবি বিচার চাওয়া । তাই মৃতু্যর বিচার নয়, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফকার বিচার হবে সেটিই মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের সরকারের কাছে দেশবাসীর প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *