বিজয়োল্লাসে মাতোয়ারা দেশবাসী

উত্তরণ প্রতিবেদন: চারদিকে বিজয়োৎসব। লাল-সবুজের বিজয় নিশান আর ফুল হাতে জন¯্রােত সর্বত্র। মুখে বিজয়ের গান আর যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার ও মৌলবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার শপথ। এমন নতুন প্রজন্মের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস অনেক দিনই দেখা যায়নি। অন্যরকম এক স্বস্তি ও চেতনায় বিজয়ের উল্লাসে মেতেছিল পুরো জাতি। এবারের বিজয় দিবসে কোটি মানুষের মনে ছিল প্রশান্তি আর স্বস্তির হাসি। অহঙ্কার আর অর্জনের বিজয়োল্লাসে মেতেছিল পুরো বাংলাদেশ। রক্তের ঋণ শোধ করার গর্ব, নিষ্ঠুরতার বিচার করতে পারার তৃপ্তি। রাজাকার-আলবদর ও স্বাধীনতাবিরোধী মুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথে একাত্তরের মতোই যেন গর্জে উঠেছিল তারা। গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের ৪৫ পেরিয়ে ৪৬ বছরে পদার্পণের দিনে দেশবাসী যেন দ্বিতীয় যুদ্ধজয়ের আনন্দেই ছিল মাতোয়ারা। আর সেই দ্বিতীয় যুদ্ধজয় হচ্ছে জঙ্গি-রাজাকার-সাম্প্রদায়িকতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণ।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির গণজাগরণ আর স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের তীব্র ঘৃণা ও গণধিক্কার ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল এবারের মহান বিজয় দিবসে। বিজয়োৎসবে মাঠে নামা কোটি মানুষের একাত্তরের বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত শির আর চোখে ছিল একাত্তরের ঘাতক রাজাকার-আলবদর-যুদ্ধাপরাধী ও তাদের দোসরদের প্রতি তীব্র ঘৃণার আগুন।
বিজয় দিবসে গোটা দেশই মেতে উঠেছিল বাঁধভাঙা বিজয়োৎসবে। নেচে-গেয়ে উঠেছিল বিজয়ের আনন্দে। বিজয়ের আনন্দ আর নতুন প্রজন্মের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। বিজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হতে রাজপথে নেমে আসা লাখ লাখ শিশু-কিশোর থেকে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার চোখে-মুখে যেমন ছিল বিজয়ের আনন্দ, ঠিক তেমনি ছিল একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা-ধিক্কার আর জামাত-শিবির নিষিদ্ধের প্রচ- দাবি। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের পর রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ বিনির্মাণের শপথ নিয়ে এবার বিজয়ের ৪৫ বছর পূর্তি উদযাপন করেছে বাংলাদেশ। তবে আনন্দমুখর এই উৎসবে বরাবরের মতো এবারও অন্তঃ¯্রােত বয়ে গেছে স্বজন হারানোর বেদনা।
বাঙালি জাতি আনন্দ, বেদনা আর বিন¤্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লাখো শহীদকে, স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দিবসটির মূল অঙ্গীকারই ছিল পরাজিত অপশক্তি ও তাদের দোসরদের সব ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত রুখে দিয়ে জঙ্গিবাদমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ-স্বনির্ভর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার। রাজধানীর জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে সম্মিলিত বাহিনীর দৃষ্টিনন্দন-মনলোভা কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানমালা উল্লেখযোগ্য।
দিবসটি ঘিরে আলোচনা, সেমিনার, বক্তৃতা ও যুক্তিতর্কসহ সব কিছুতেই ঘুরেফিরে প্রাধান্য পায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়ার স্বস্তি। জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ, ক্ষুধা-দারিদ্র্য ও দুর্নীতিমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন এক জন্মভূমির স্বপ্নের কথাও ধ্বনিত হয়েছে সর্বত্র। রাজধানীসহ সারাদেশের রাস্তাঘাট, অফিস-আদালত, দোকানপাট, যানবাহন এবং বাসাবাড়িতে পতপত করে উড়েছে লাখো শহীদের রক্ত¯œাত লাল-সবুজ পতাকা। ছোট ছোট কাগজ বা কাপড়ের তৈরি পতাকা হাতে নিয়ে বা বুকে-পিঠে লাগিয়ে শিশু-কিশোররা বেরিয়েছিল ঘরের বাইরে। কেউ কেউ মুখে এঁকেছিল লাল-সবুজ পতাকা।
তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর এলাকায় সূর্যোদয়ের সময় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে ১৬ ডিসেম্বর ভোরে বিজয় দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়। ভোর থেকেই সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের সামনে নামে জনতার ঢল, সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের ভিড় ছিল লক্ষণীয়। অন্যদিকে রাজধানীজুড়ে ছিল বিজয় দিবস ঘিরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা। পথে পথে সংগীত, নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকথা এবং সব কর্মসূচিতে স্বাধীনতা-বিরোধীদের প্রতি ঘৃণা ও ধিক্কার প্রকাশ পায়।
বঙ্গবন্ধুর ভবন অভিমুখে জনতার ঢল : মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৬ ডিসেম্বর সকালে জনতার ঢল নেমেছিল রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই জনতার ঢল নামে সেখানে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মিছিল করে ৩২ নম্বর সড়কের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মোড়ে জমায়েত হতে থাকে। সকাল ৭টার মধ্যেই সর্বস্তরের মানুষের ভিড়ে গোটা এলাকা পরিপূর্ণ হয়ে যায়। সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমে সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় তিনি সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে দলীয়প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে মোনাজাতে অংশ নেন। এরপর জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধু ভবন এলাকা ত্যাগ করার পর সাধারণ মানুষের জন্য স্থানটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এরপর দিনভর অজ¯্র সংগঠন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করে। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানায়। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ফুলে ফুলে ভরে যায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি।
৫টি স্মারক ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ৫টি স্মারক ডাকটিকিট, দুটি উদ্বোধনী খাম, দুটি ডাটা কার্ড এবং একটি স্মরণিকা অবমুক্ত করেছেন। ওইদিন সকালে গণভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্মারক এবং বিশেষ সিলমোহরের মাধ্যমে ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন।
বিজয়ের ৪৫ বছর উদযাপন উপলক্ষে (১৯৭১-২০১৬) প্রধানমন্ত্রী ১৬ টাকা মূল্যের বিশেষ একটি স্মারক ডাকটিকিট এবং একই সাথে ৩, ৭, ১০ ও ১২ টাকা মূল্যের আরও ৪টি ডাকটিকিট অবমুক্ত করেন। পাশাপাশি ১০ টাকা মূল্যমানের দুটি উদ্বোধনী খাম এবং ৫ টাকা মূল্যমানের দুটি ডাটা কার্ড এবং ৪৫ টাকা মূল্যমানের একটি স্যুভেনির অবমুক্ত করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *