বিশিষ্ট আলেম মাওলানা আব্দুস সোবহান এবং আমাদের এছলাম

তিনি মাওলানা আব্দুস সোবহান। বাংলাদেশ নামক দেশটির একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক। জাতীয় সংসদের পাবনা-৫ (সদর উপজেলা) আসনে ২০০১-এর নির্বাচনে ৪ দলীয় জোটের জামায়াত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত সাবেক মাননীয় সংসদ সদস্য। জামায়তে ইসলামীর কেন্দীয় কর্মপরিষদের নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুস সোবহান একজন বিশিষ্ট আলেম হিসাবে একটি শ্রেনীর নিকট খ্যাতিমান। আসুন ফিরে দেখি একাত্তর! দেখে আসি আমাদের এই মহান দেশপ্রেমিক সাবেক সাংসদ এছলামকে রক্ষা করার জন্যে কি কি পদক্ষেপ গ্রহন করেছিলেন এবং সেসব এছলাম সম্মত ছিল কিনা।

‘পৈশাচিক খুনী’ বিশেষনে বিশেষিত তিনি। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও জামায়াতে ইসলামী মহান নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও কামারুজ্জামানের ১৯৭১ সালের নানা দুষ্কর্মের আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর নাম মাওলানা আব্দুস সোবহান। তার বাড়িও কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, জামায়াতের বর্তমান কেন্দ্রীয় আমির মাওলানা নিজামীর নিজ জেলা পাবনায়। পাবনা এলাকায় রাজাকার, আলবদর এবং শান্তি কমিটি গঠনেও মাওলানা আব্দুস সোবহান মুখ্য ভূমিকা পালন করেন বলে অনেক তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। তিনি ছিলেন পাবনার শান্তি কমিটির সহ সভাপতি। পাবনার আলবদর, রাজাকার, শান্তি কমিটির সদস্য সংগ্রহে ছিল মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি। উর্দু ভাষায় ভাল দখল থাকায় পাকবাহিনীর কাছে বিশেষ কদর ছিল তার। পাকবাহিনীর যাবতীয় নৃশংস কাজের সহায়তাকারী ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের ৯মাসে মুক্তিকামী বাঙালীদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়া, ধরিয়ে দেয়া, হত্যা করায় তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। গণহত্যায় পরিকল্পনা ও প্ররোচনা দিয়ে মাওলানা সোবহান বাঙালী জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন এবং দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার আগেই গোলাম আযমের সঙ্গে পাকিস্তানে পালিয়ে যান। পঁচাত্তরের আগস্ট ট্রাজেডির পর জেনারেল জিয়ার হাত ধরে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মাওলানা আব্দুস সোবহান এক ভয়ংকর নাম। স্বাধীনতার এত বছর পর নতুন প্রজন্মের কাছে তার সেই চেহারা অনেকটাই অপরিচিত। আসুন আজ একটু খানি চেষ্টা করি তার সম্বন্ধে জেনে নেয়ার।

আমাদের যাদের বয়স ৪০/৪২ বছরের কম, মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী এবং আব্দুস সোবহান গংয়ের নারকীয় গণহত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা যারা দেখেননি, তাঁদের অনেকেই হয়ত এখন এদের চিনতে পারবেন না। তবে এখনও অনেক প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী বেঁচে রয়েছেন, যাঁরা তার নির্মমতা ও হত্যাযজ্ঞের কথা ভুলেননি। আর তাদের ভাষায় মাওলানা সোবহান একজন ‘পৈশাচিক খুনী’।

১৯৯৫ সালে প্রকাশিত একাত্তরের ঘাতক দালাল ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে জাতীয় গণতদন্ত কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়- এই জামায়াত নেতা (মাওলানা আব্দুস সোবহান) ১৯৭১ সালে পাবনা জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির ছিলেন এবং তথাকথিত উপনির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হন। গণতদন্ত কমিশনের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানে সাহায্যদানকারী অধিকাংশ ব্যক্তি জানিয়েছেন, ‘পাবনা শান্তি কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাওলানা সোবহানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পাবনার আলবদর, রাজাকার এবং শান্তি কমিটি গঠিত হয়। উর্দু ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন বলে পাকিস্তানী বাহিনীর খুব কাছাকাছি আসতে সমর্থ হন এবং নীতিনির্ধারক হিসেবে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধী ভূমিকায় তার সার্বিক কর্মকান্ড পরিচালনা করেন।’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাসে মাওলানা সোবহানের বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাঙালী জাতিসত্তাবিরোধী ভূমিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের সমূলে ধ্বংস করার লক্ষ্যে আলবদর, রাজাকার, শান্তি কমিটি গঠন করে ৩০ লাখ নিরীহ, নিরস্ত্র, শান্তিকামী মানুষ হত্যায় সহায়তা এবং পাকহানাদার বাহিনীর যাবতীয় নৃশংস কার্যকলাপে সহায়তার জন্য তার বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে মামলা রুজু করা হয় এবং ২৯ ফেব্রম্নয়ারি ১৯৭২ সাল, বিকেল ৩টায় আদালতে হাজির হতে বলা হয়। কিন্তু সে সময় তিনি তার দলনেতা যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের সঙ্গে পাকিসত্মানে পালিয়ে গিয়েছিলেন (সূত্র : একাত্তরের দালালেরা : শফিক আহমেদ এবং এ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম শিবলী, পাথরতলা, পাবনা)।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজধানী ঢাকার মতো পাবনাতেও পাকিস্তানী বাহিনী অতর্কিতে নিরীহ বাঙালীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তবে পাবনার অবস্থা ছিল একটু ব্যতিক্রম। তদন্তকালে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী এক মধ্যবয়স্ক মহিলা জানান, ২৫ মার্চ ১৯৭১ সাল রাত থেকেই পাবনার গণ্যমান্য বরেণ্য ব্যক্তিদের পাক আর্মি স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরে নিয়ে আসে। ২৬ মার্চ আনুমানিক বিকেল ৩টার দিকের ঘটনা। এই মহিলা তখন পাবনা রায়েরবাজারে প্রধান সড়কের ধারে একটি পুরনো বাড়ির দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখছিলেন ভীতসন্ত্রস্ত পাবনা শহর। হঠাৎ তিনি (প্রত্যক্ষদর্শী মহিলা) পাক আর্মির একটি লরি রাস্তার ওপর থামতে দেখেন। লরির পেছনে লম্বা দড়ি দিয়ে বাঁধা প্রায় ১০০ মানুষ, যাদের পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে টেনে আনা হয়েছে। প্রত্যেক বন্দীর জামা-কাপড় ছিন্নভিন্ন, তাদের হাঁটু থেকে পায়ের পাতা অবধি সাদা হাড় দেখা যাচ্ছিল। আর শরীর ছিল রক্ত মাখা। লরির ভেতরে তিনি পাকিস্তানী আর্মির সঙ্গে মাওলানা আব্দুস সোবহানকে বসা দেখেছিলেন। আর যাদের সিমেন্টের রাস্তার ওপর দিয়ে টেনেহিঁচড়ে আনা হচ্ছিল তাদের মধ্যে তিনি পাবনার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আবু সাঈদ তালুকদার, এডওয়ার্ড কলেজের প্রফেসর হারুন, বিশিষ্ট দন্ত চিকিৎসক অমলেন্দু দাস ও আওয়ামী লীগ নেতা এ্যাডভোকেট আমিনউদ্দিকে চিনতে পেরেছিলেন।

লরি থেকে নেমে কিছু সৈন্য কয়েকটি দালানের ওপর ওড়ানো বাংলাদেশের পতাকা নামানো এবং পোড়ানোর ব্যবস্থা করে চলে যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, ভীতসন্ত্রস্ত এই মহিলা সংবাদ মাধ্যমকে জানান, ২৯ মার্চ ১৯৭১ সালের মধ্যে তার দেখা ঐসব পরিচিত ব্যক্তির সবাইকে মেরে ফেলা হয়। তিনি আরও বলেন, ২৬ তারিখে এ দৃশ্য দেখার পর ২৭ মার্চ অমলেন্দু দাসের বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে জানতে পারেন, দন্ত চিকিৎসক অমলেন্দু দাসের বাড়িতে মাওলানা আব্দুস সোবহান পাক আর্মিদের নিয়ে এসেছিলেন।

পাবনা জজকোর্টের সিনিয়র এ্যাডভোকেট সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর এবং আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ গোলাম হাসনায়েন (কাচারিপাড়া পাবনা) জাতীয় গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, মাওলানা আব্দুস সোবহান আওয়ামী লীগ নেতা আমিনউদ্দিন সাহেবের বাসা পাক আর্মিদের চিনিয়ে দিয়েছিল। তিনি আরও বলেন, পাবনার আলবদর, রাজাকার, শান্তি কমিটির যত সদস্য ছিল তা মাওলানা সোবহান সংগ্রহ করেছিলেন। সংশিষ্ট সূত্র জানায়,’সাধনের সঙ্গে আরেক মুক্তিযোদ্ধা গেদা মনি ধরা পড়লেও সে পাক আর্মির হাত থেকে ছাড়া পায়। কিন্তু সাধনকে মাওলানা সোবহান বাঁচতে দেয়নি।’

সাবেক অধ্যক্ষ মোঃ আব্দুল গনি (কালাচাঁদপাড়া, পাবনা) গণতদন্ত কমিশনকে জানিয়েছেন, ‘১৭ এপ্রিল দুপুরে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা কুচিয়াপাড়া ও শাঁখারীপাড়ায় মাওলানা আব্দুস সোবহান পাক আর্মিদের সঙ্গে নিয়ে অপারেশন চালায়। ঐদিন সেখানে সুধীর চন্দ্র চৌধুরী, অশোক কুমার সাহা, গোপাল চন্দ্র চৌধুরীসহ ৮ ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়। তারা ২০/২৫টি ঘর পোড়ায় এবং সেই সঙ্গে লুটতরাজ ও নারী নির্যাতনও করেছিল।‘ অধ্য আব্দুল গনি আরও বলেন, ‘মে মাসে পাবনার ফরিদপুর থানার যেমরাতে মাওলানা আব্দুস সোবহান, মাওলানা ইসহাক, টেগার ও আরও কয়েক দালালের একটি শক্তিশালী দল পাক আর্মি নিয়ে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেখানে ঐদিন আনুমানিক ১ হাজার মানুষ হত্যাসহ ঘরবাড়ি পোড়ানো, লুণ্ঠন, নারী নির্যাতন ইত্যাদি করা হয়।’

পাবনার দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যাটি হয় সুজানগর থানায়। ‘মে মাসের প্রথমদিকে এক ভোরে নাজিরগঞ্জ-সাতবাড়িয়া ইউনিয়নে হত্যা করা হয় প্রায় ৪০০ জনকে’-এ কথা বলেন মুজিব বাহিনীর সুজানগর থানা লিডার এবং ঢাকার ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বিশু। তিনি জানান, সুজানগর হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ও শান্তি কমিটির এক সদস্য মৌলভী মধুকে তারা ১৯৭১-এর মে মাসের শেষেরদিকে গ্রেফতার করেন এবং পরে মেরে ফেলেন। তিনি বলেন জিজ্ঞাসাবাদের সময় এই ঘাতক জানিয়েছিল, ‘সুজানগর অপারেশনের আগের দিন পাথরতলায় আব্দুস সোবহানের বাসায় মিটিং হয়েছিল এবং মিটিংয়ে সুজানগর অপারেশনের পরিকল্পনা নেয়া হয়।’ পাবনার যে কোন অপারেশনের আগে মাওলানা সোবহানের বাসায় পরিকল্পনা করা হতো বলে জহিরুল ইসলাম বিশু গণতদন্ত কমিশনকে জানান।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মাওলানা আব্দুস সোবহানের মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডের বিবরন এই এক লেখায় শেষ হবার নয়। এটা শুধু মনে করিয়ে দেয়া, এই মহান দেশপ্রেমিকগণ একাত্তরে এ দেশের মানুষের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং সর্ব শক্তি দিয়ে এ দেশের জন্ম সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট করতে চেয়েছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *