বীরাঙ্গনা গুরুদাসী

লাখো ধর্ষিতার কাতারের একজন। ১৯৭১-এর রাজাকার, আলবদর ও পাক হানাদার বাহিনীর দোসরদের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রেহাই পায়নি গুরুদাসী। খুলনা জেলার বটিয়াঘাটার বারোয়াড়িয়াতে স্বামী ও সন্তানদেরকে নিয়ে সুখের সংসার করছিলেন তিনি। কিন্তু নরপশুরা গুরুদাসীর স্বামী-সন্তানদেরকে তার চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে সে সুখের সংসার তছনছ করে দেয়। নির্বাক নিঃসঙ্গ গুরুদাসীকে তারা পালাক্রমে প্রতি রাতে বারোয়াড়িয়া রাজাকার ক্যাম্পে ধর্ষণ করত। গুরুদাসীকে পরিনত করেছিল যৌনদাসীতে। এখানেই শেষ নয়- তাকে দিয়ে রান্না করানো, কাপড় কাচানো, ঘর মোছা, থালাবাসন পরিস্কার করানোসহ ঝিয়ের মত ব্যবহার করত।

খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মা বলে সম্বোধন করতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর খুলনার বিভন্ন রাস্তায় তাকে দেখা যেত বাঁশের চিকন একটি কঞ্চি নিয়ে ঘুরে বেড়াতে। হাত পেতে খাবারের জন্য টাকা চাইত। মুক্তিযোদ্ধাদের বড় কোন অনুষ্ঠান হলে তাকে সেখানে দেখা যেত। মায়ের অধিকার নিয়েই প্রশ্ন করত, “তোরা আজও ওদের বিচার করতে পারলি নে- যারা আমার স্বামী-সন্তানদের হত্যা করেছে।” আমরা সবাই বীরাঙ্গনা গুরুদাসীর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি। আজ সে নেই, তাই তাকে দেখতে পারছি না, আর কোন দিন দেখতে পারব না। গত ৭ ডিসেম্বর’০৮কপিলমুনিতে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), খুলনা এর প্রকাশিত সাময়িকী “অংশু” (জানুয়ারী-অক্টোবর’০৮) সংখ্যায় ড. তরুণ কান্তি শিকদার (উপ-সচিব) এর নিবন্ধটি বীরাঙ্গনা গুরুদাসী সম্পর্কে (গুরুদাসী এক বীরাঙ্গনা নারী) শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধটি পাঠকদের উদ্দেশ্যে পুনঃপ্রচার করা হলো। স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশে নিজ অফিসে বসে কাজ করছি। সামনে সাংবাদিক বন্ধু জনাব মোঃ সাহেব আলী সাবেক সাধারণ সম্পাদক, খুলনা প্রেস ক্লাব ও বিশিষ্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোশ গল্প চলছে। তারিখ ১৮, আগস্ট ২০০৮ সময় দ্বি-প্রহর। এমন সময় রুমে আগমন ঘটলো বীরাঙ্গনা গুরুদাসী মণ্ডলের। স্বভাবসুলভ ভাবে হাতে একটি চিকন বাঁশের কঞ্চি। স্থুলকায় জীর্ণবসন গুরুদাসী ঘর্মাক্ত কলেবরে ঘরে ঢুকেই লাঠিটা দিয়ে মাথায় ও পিঠে একটা বাড়ি দিয়ে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত চাওয়া ‘দে দশটা টায়া দে তোরা না দিলি পাব কনে ক’। না করলে শুনতে চায় না কোন বাধা মানতে চায় না, দিতে তাঁকে হবেই। তাঁর এ চাওয়ার মাঝে কোথায় যেন একটি প্রবল জোর আছে। তাঁর ধারণা তাঁর চাওয়াটা খুবই সামান্য এবং তাঁর এ চাওয়ার পিছনে একটা জন্মগত অধিকার কাজ করছে। কিন্তু কেন কি জন্য এই তীব্র অধিকার তা কখনো ভেবে দেখিনি বা ভাবার সময় হয়নি। কিন্তু ১৮ আগস্ট দ্বি-প্রহরে গুরুদাসী মণ্ডলের আগমন আমার সমস্ত অপারগতা ও ব্যর্থতাকে মনে করিয়ে দিল। লজ্জায় মাথা নত হলো নিজের অপারগতার কাছে। সে দিন থেকে ঘটনাটি লিখবো লিখবো করে সময়ভাবে হয়ে উঠছিল না।

গুরুদাসী মণ্ডলের সাথে আমার প্রথম দেখা ২রা আগস্ট ২০০৭ রাড়–লীতে। বিজ্ঞানী স্যার পি.সি রায়-এর গ্রামের বাড়ীতে তাঁর জন্ম জয়ন্তি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সভামঞ্চে অন্যান্যদের সাথে উপস্থিত ছিলাম। চলছে বক্তৃতার পালা। এমন সময় পাগলিনী গুরুদাসী পুলিশকে ধাক্কা দিয়ে সবাইকে সরিয়ে সভামঞ্চে উঠে এসে সেই চিকন কঞ্চি দিয়ে আলতো বাড়ি মেরে কেমন আছিস বাবা? ভাল আছিস তো? ‘দে কয়ডা টায়া দে’। তখন চার দিকের পুলিশ ও পাইক পেয়াদারা জোরকরে তাঁকে সভামঞ্চ থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়। এভাবে আরো দু’এক বার আমরা সামনা সামনি হলেও একইভাবে কেউ তাকে কাছে ঘেষতে দেয়নি। ফলে লোকমুখে যতটুকু শুনেছি একজন মুক্তিযোদ্ধার মা এখন পাগল হয়ে গিয়েছে। এর বেশী শোনার সুযোগ হয়নি।

কে এই গুরুদাসী? কি তার পরিচয়? আজ কেন সে পাগলিনী? একথা নতুন করে একবার জানানোর জন্যই আজকের এ লেখা। দক্ষিণ বাংলার খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের অতি সাধারণ পরিবারের সুন্দরী গৃহবধু ছিলেন গুরুদাসী মণ্ডল। স্বামী ও ৪ সন্তান নিয়ে সুখেই কাটাতো দিন। জীবনে খুব বেশী উচ্চাশা করেননি। গ্রামের বধূ হিসেবে দুমুঠো ভাত, মোটা কাপড় আর স্বামীর সোহাগ এর থেকে বেশী প্রাপ্তির আশা আমাদের দেশে সাধারণ বধূদের কখনোই হয় না। তেমনি এক চরিত্রের সাধারণ নারী ছিলেন গুরুদাসী। কিন্তু ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ তাঁর সমস্ত স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছিল। যুদ্ধ শুরু হলে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার বাহিনীর অত্যাচার বৃদ্ধি পেলে এতদাঞ্চলের হিন্দু স¤প্রদায়ের প্রচুর লোক ভারতে চলে যায়। বিশ্ববাসীর কাছে ভারতের শরণার্থী ইস্যুকে মোকাবেলা করতে পাকিস্তান সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে সবাইকে দেশে ফেরার আহবান জানায়। তখন যারা দেশে ফিরে আসেন গুরুদাসী ছিলেন তাদেরই একজন। শঠ, প্রবঞ্চকদের মিথ্যা আশ্বাসে ভর করে দেশে ফিরে আসা গুরুদাসী আজ সর্বস্ব হারিয়ে পাগলিনী। গুরুদাসীকে উৎসর্গ করে ড. শেখ গাউস মিয়ার “বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ খুলনা জেলা” বইটিতে গুরুদাসী মণ্ডলকে যেভাবে চিত্রিত করা হয়েছে তা পাঠকের সামনে তুলে ধরা হলো।

“পাক সামরিক বাহিনীর ঘোষণায় বিশ্বাস ফিরে আসার পরিণতি কি করুণ হতে পারে তার এক বড় দৃষ্টান্ত খুলনার গুরুদাসী। সে এক হতভাগিনী নারী – সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় ফিরে এসে স্বামী পুত্র কন্যাদের হারিয়ে আজ সে উন্মাদিনী। যশোর খুলনার বিভিন্ন স্থানে তাঁকে দেখতে পাওয়া যাবে। তাঁর বাড়ি ছিল পাইকগাছা থানার দেলুটি ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামে। গুরুদাসীর স্বামীর নাম ছিল গুরুপদ। পাইকগাছার বারোআড়িয়া বাজারে গুরুপদ-র দোকান ছিল, পেশায় ছিল দর্জি। গুরুপদ ছিল একজন সৎ কর্মঠ মানুষ। স্ত্রী গুরুদাসী, বড় পুত্র অংশুপতি, মেয়ে অঞ্জলি, খোকন ও পারুলকে নিয়ে ছিল তাঁদের সুখের সংসার। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁদের সুখের সংসারে দুর্যোগের মেঘ ঘনিয়ে আসে। এপ্রিলের শেষের দিকে গুরুপদ সপরিবারে ভারতে চলে যায়। তবে সেখানে তারা থাকতে পারেনি, মাতৃভূমির আকর্ষণ আবার তাদের দেশে ফিরিয়ে আনে। সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা শুনে তারা সীমান্ত পার হয়ে পাইকগাছা ফিরে আসে। আবার বারোআড়িয়ায় নতুন করে তার দোকান চালু করার উদ্যোগ নেয়। ইতোমধ্যে বারোআড়িয়ায় রাজাকার ক্যাম্প বসে গেছে। এখানে তারা সৃষ্টি করেছে এক ত্রাসের রাজত্ব। হত্যা, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ তাদের কাছে ছিল এক প্রাত্যহিক ঘটনা। সাধারণ ক্ষমার ঘোষণায় বিশ্বাস করে গুরুপদ ফিরে আসায় তার প্রতি রাজাকারদের চোখ পড়ে যায়। বিশেষ করে তার ঘরে রয়েছে সুন্দরী যুবতী স্ত্রী। পূর্বেই বলেছি যতই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হোক ঐ সময় রাজাকারদের নিয়ন্ত্রণ করা কারুর পক্ষেই সম্ভব ছিল না। তাই বারোআড়িয়ার রাজাকারেরা মুক্তিযোদ্ধা বলে ঘোষণা দিয়ে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায় গুরুপদকে। অকথ্য নির্যাতনের পর পরদিন সকলের চোখের সামনে নদীতে নামিয়ে গুলি করে হত্যা করে গুরুপদকে। শুধু তাঁকে নয়- তাঁর সঙ্গে হত্যা করা হয় বড় ছেলে অংশুপতি, ছোট ছেলে খোকন ও বড় মেয়ে অঞ্জলিকে। কোলের শিশু কন্যা পারুলকে কাঁদায় পুতে গুলি করে হত্যা করার পর গুরুদাসী জ্ঞান হারায়। এরপর রাজাকারেরা গুরুদাসীকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। তারপর যা হওয়ার তাই হয়। গুরুদাসী তখন উন্মাদিনী। তাঁকে বেশ কিছুদিন ঐ ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। এই ক্যাম্প দখলের যুদ্ধ করতে গিয়েই শহীদ হন খুলনার গর্ব, দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা জ্যোতিষ ও আজিজ। এ প্রসঙ্গে আলোকপাত করে খুলনার বীর মুক্তিযোদ্ধা, বৃহত্তর খুলনার মুজিব বাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু লিখেছেন-

যুদ্ধ প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। যেদিন রওনা দেয়ার কথা ঠিক সেদিন ইণ্ডিয়া থেকে খবর আসে আমাকে যাবার জন্য। দায়িত্ব দেয়া হলো জ্যোতিষ আর আজিজকে। ওরা বাজারটি ঘিরে যখন যুদ্ধ করছে তখন একটা ঘরের মধ্যে ওদের পজিশন ছিল। যুদ্ধ ও গোলাগুলি চলাকালীন ঐ মেয়েটি সামনের ঘর থেকে আর্ত চিৎকার করতে থাকে। ওকে এই রাজাকার দলের কমান্ডার ধরে এনেছিল। হত্যা করেছিল ওর স্বামী ও চার বাচ্চাকে। ওরা যৌন লালসা তৃপ্ত করার জন্য ওকে ঘরে তালা দিয়ে আটকে রেখেছিল। জ্যোতিষ এ চিৎকার শুনে তার পজিশন থেকে উঠে দাঁড়ায়ে যেই এক পা দিয়েছে অমনি গুলিবিদ্ধ হয়। পাশে আজিজ ছিল সে জ্যোতিষকে ধরতে উঠে দাঁড়ালে সাথে সাথেই গুলিবিদ্ধ হয় এবং একই জায়গায় ২ জনেই মারা যায়। ওদের মৃত্যুতে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলাম। ….. ডিসেম্বরের প্রথম দিকে বারোআাড়িয়া বাজারে আমাদের লঞ্চ এসে থামলে গুরুদাসী আমাদের লঞ্চে এসে ওঠে। সেখান থেকেই গুরুদাসী আমাদের সাথে ক্যাম্পে ছিল। পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, গুরুদাসীও বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছে। গুরুদাসী এখন উন্মাদিনী। চোখের সামনে রাজাকার বাহিনীর হাতে স্বামী দুই পুত্র মেয়ে ও শিশুকন্যার নির্মম হত্যাযজ্ঞ তাঁকে তাড়িয়ে ফিরছে। যশোর খুলনার বিভিন্ন স্থানে তাঁকে দেখা যায়। শোক দুঃখের প্রতীক হয়ে সে লাঠি হাতে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়, যাকে কাছে পায় তাকে সন্তান মনে করে আদর করতে চায়।” বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতনের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে আছে গুরুদাসী মন্ডল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী খুলনার বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আব্দুল কাইয়ূম বলেন ক্যাম্প দখলের পর আমরা যখন সবাই লঞ্চে উঠছি তখন গুরুদাসী কাঁদতে কাঁদতে আমাদের নৌকায় এসে উঠে। তখন তাঁর দুরবস্থার কথা ভেবে আমরা তাঁকে গ্রহণ করি। গুরুদাসী দেখতে খুব সুন্দর ছিল এবং পূর্ণযৌবনা হওয়ায় আমরা তাঁকে মা বলে সম্বোধন করি। যেন কারো কুনজর তাঁর উপর না পড়ে। সেই থেকে গুরুদাসীকে সকলেই মায়ের মত শ্রদ্ধা করে। আর সন্তানহারা গুরুদাসী সকলকে সন্তানের মত মনে করে।

গুরুদাসী মণ্ডলের জীবনের এ অংশটুকু আমার অজানা হলেও খুলনার বুদ্ধিজীবী মহলের অনেকের জানা। কিন্তু কতটুকু করতে পেরেছি আমরা তাঁর জন্য। ক্যাম্প দখলের যে যুদ্ধে গুরুদাসীকে উদ্ধার করা হয়েছিল সে যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন দু’জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেদিনের অনেক সহযোদ্ধাই আজ সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু গুরুদাসীর জন্য মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারী কোন ভাতা বরাদ্দ নেই। কারণ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নাম নেই। যে স্বামী চার সন্তান ও নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ যৌবন বিসর্জন দিয়ে স্বাধীনতার পতাকা উড়াতে সাহায্য করলো তার আজ কোন মূল্যায়ন নেই। তার দু’মুঠো অন্নের সংস্থান নেই। প্রতিদিন দোরে দোরে ভিক্ষা করে তার ক্ষুধার জ্বালা নিবৃত্ত করতে হয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার করুণ ক্রন্দন, “বাংলাদেশ স্বাধীন করে কী পেইলাম। পেইয়েছি একখানা লাঠি যা দিয়ে তোদের পিঠে একটা বাড়ি দিয়ে বলি দশটা টায়া দে। তোরা না দিলি খাব কি ক’ দিবিনে তো একাত্তরে মা বললি ক্যান (একথা বলে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল)। ৭১-ই ছেলেমেয়ে সব হারাইছি। এত গুলি খরচ করলি আর একটা গুলি মারিলি না ক্যান।

আমারে যে রাজাকার ধরে নিছিল সে এখনো বে্যঁইচে আছে। আমার কোলের বাচ্চাডারে মাটির মধ্যি পুঁতে গুলি করে মারিল। কত পায়ে ধরলাম ও আমার বুকের দুধ খায় ওরে মাইরো না। শুনলো না। সরকার থেকে কোন ভাতা পাইনে। একটা ঘর দিছিল সেখানেই থাকি।” এই কথাগুলো বলতে বলতে গুরুদাসী রুমের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তাড়াতাড়ি মাথায় জল দিয়ে তাকে সুস্থ করে সামান্য কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করি।

কিন্তু তার প্রতিটি কথা বুকের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দেয়। সত্যিতো কী দোষ তার। আর একটি গুলি দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া যেতো তার সকল দুঃখ কষ্ট। কিন্তু হায়েনাদের লোলুপ দৃষ্টি তাঁকে মরতে দেয়নি। তাঁর নিষ্পাপ রূপ সেদিন মৃত্যুর পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে দিন আর একটি গুলি খরচ হলে আজ জাতিকে এ লজ্জা বহন করতে হতো না যে একজন বীরাঙ্গনা মাতার ভরণপোষণ তার সুযোগ্য সন্তানেরা করতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা যাচাই বাছাই করতে যেয়ে অনেক সময় বিড়ম্বনার শিকার হয়েছি। একটি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল যিনি জীবনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তাঁর আবদার এবার সুযোগ এসেছে তাঁর নামটি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। যেভাবেই হোক। কারণ ভবিষ্যতে সরকার অনেক সুযোগ দিতে পারে। আবার একজন কলম সৈনিক দাবী করেন ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে তিনি অনেক লিখেছেন অতএব তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় আনতে হবে। এভাবে প্রভাবশালী মহলের হাজারো চাপ সহ্য করে নিরপেক্ষভাবে তালিকা যাচাই বাছাই করতে চেষ্টা করেছি। একটি উপজেলায় গুরুদাসীর মত এক বিধবা স্ত্রীর দাবী পূরণ করতে পারিনি। তাঁর স্বামী ঐ উপজেলায় রাজাকারদের হাতে নিহত হন। তিনিই ঐ উপজেলায় নিহতদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি। বিধবা মহিলার দাবী যেহেতু, তাঁর স্বামী মুক্তিযুদ্ধে বিপক্ষ বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন সেহেতু, তাকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হোক। কিন্তু যুদ্ধ করতে যেয়ে নিহত হননি এ জন্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় তাঁর নাম নেই। নাম নেই মুক্তিবার্তায় বা অন্য কোন সরকারি গেজেটে। ফলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে তাঁর দাবী অগ্রাহ্য হয়। একইভাবে গুরুদাসী মণ্ডল কি দাবী করবে ? এই যুদ্ধের জন্য সে সব হারিয়েছে। কিন্তু তাঁর স্বামী তো যুদ্ধ করেন নি। তাহলে কীভাবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী দাবী করতে পারেন? তাঁর পুত্র কন্যারা সবাই নিহত হয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধ করে নয়। তাই তিনি মুক্তিযোদ্ধার মাও হতে পারেনি। নরপশুদের হাতে নিজের যৌবন দিয়েছেন। সে জন্য বীরাঙ্গনা মর্যাদা পেলেও ভাতা তাঁর প্রাপ্য নয়। কিন্তু ঐ পদবীতে তো পেট ভরবে না। পেটের জন্য চাই অন্ন তা জোগাতে তাই এই সত্তরোর্ধ বয়সে সবার কাছে হাত পেতে চাইতে হয় ‘দে দশটা টায়া দে বাবা’। প্রথমে ভিক্ষা চাওয়ার যে জোরের কথা বলেছিলাম সে জোরটি এইখানে নিহিত। কারণ এই গুরুদাসী, আজিজ, জ্যোতিষসহ লক্ষ লক্ষ বাংলার দামাল সন্তানের ত্যাগের বিনিময়ে আজকের স্বাধীন স্বদেশ। যাঁদের অস্তিত্ব আমার ও আমাদের প্রতিটি রক্ত কণিকায় অনুভবযোগ্য। লাল সবুজ পতাকার মধ্যে যাঁরা চির জাগ্রত হয়ে রয়েছে। তাঁদের জন্যই আমরা আজ বাংলাদেশের সুউচ্চ পদে আসীন। স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর আজ আমরা যারা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে ঘুরছি ১৯৭১ সনে তাদের অনেকের জন্মই হয়নি। কিন্তু তাই বলে আমার ইতিহাস ঐতিহ্যকে সম্মান না করলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আমাদের অস্তিত্বও একদিন ফুরিয়ে যাবে। স্বাধীনতার অনেক দিন পর একজন গবেষকের লেখনির মধ্য দিয়ে আমরা খুঁজে পেয়েছিলাম বীর প্রতীক তারামন বিবিকে। তাঁকে সম্মান করতে পেরে আমরা ধন্য হয়েছি। সরকার সুশীল সমাজ সকলের চেষ্টায় তারামন বিবি আজ আত্মসম্মান নিয়ে সমাজে বসবাস করছেন। আমার সৌভাগ্য হয়েছে তারামন বিবির জন্মস্থান রাজীবপুর উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে কাজ করার। আশা করবো এ লেখনির মাধ্যমে সরকারের উর্ধ্বতন নীতি নির্ধারকগণ তারামন বিবির মত গুরুদাসীকেও রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত করতে না পারলেও এই শেষ বয়সে তাঁর দু’মুঠো অন্নের নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে পারবেন। কারণ রাষ্ট্র মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে। আর একজন গুরুদাসী কোন ক্রমেই রাষ্ট্রের কাছে ভার হতে পারে না। আমরা কালের গর্ভে সময়ের উত্তরসূরী। আমাদের ব্যর্থতাই আজ মাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামিয়েছে। আমাদের বিবেকের কাছে এ লজ্জা ক্ষমাহীন। ড: তরুন কান্তি শিকদারের নিবন্ধটি আমি চেয়েছিলাম টিআইবি, সনাকের ত্রৈমাসিক বুলেটিন “অংশু”-তে প্রকাশের জন্য। আমি তখন “অংশ”-এর সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম।

বিজয়ের মাসে গুরুদাসীর চির বিদায়ের এ তারিখটি খুলনার মুক্তিাযোদ্ধোদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকলো। স্মরণীয় এজন্য যে, তাকে শেষ বিদায় জানাতে বৃহত্তর খুলনার মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ সালাম জানানোর ক্ষণটিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা স. ম. বাবর আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম মোড়ল, কপিলমুনি হাই স্কুল মাঠে উপস্থিত মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন থাকা সত্ত্বেও রাস্ট্রীয় মর্যাদায় গুরুদাসীকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন না করা হলেও বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে গুরুদাসীকে সালাম জানিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হবে। কপিলমুনি শহীদ মিনারের পাদদেশে শেখ আব্দুল কাইয়ুমের নেতৃত্বে উপস্থিত বীর মুক্তিযোদ্ধারা গুরুদাসীর দেহ সামনে রেখে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শেষ সালাম জানানো আহ্বান জানান। উপস্থিত সকল মুক্তিযোদ্ধা তাঁকে হাত উচিয়ে সালাম জানায় এবং নীরবতা পালন করে শেষ শ্রদ্ধা জানায়। সালাম জানানোর পূর্বে তাঁর মরদেহ জাতীয় পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত করেন শেখ আব্দুল কাইয়ুম, স. ম. বাবর আলী ও মোড়ল আব্দুস সালাম। পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রদ্ধানিবেদন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন।

পাইকগাছা থানার নির্বাহী অফিসার, পাইকগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা সরদার ফারুখ আহমেদ, ক্ষিতীশ চন্দ্র মন্ডল, সরদার আব্দুল লতিফ, শেখ জামাল হোসেন, রুহুল আমিন গাজী, চম্পক কুমার পাল, বুলবুল আহমেদ, হরেকৃষ্ণ দাশ, তরুণ কান্তি দাস, রহিমা আক্তার সম্পা, রেজাউল করিম, সিদ্দিক আহমেদ বাচ্চু, যুগোল কিশোর দে, সহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। উল্লেখ থাকে যে, খুলনা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুর রউফ খান, উন্নয়ন কর্মী স্বপন গুহ শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কপিলমুনি এসেছিলেন। এরপর গুরুদাসীর মরদেহ কপিলমুনি শ্মশানঘাটে দাহ করার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমত উল্লাহ দাদু-এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

গুরুদাসী মন্ডল বৃহত্তর খুলনার মুক্তিযোদ্ধাদের নয় খুলনাবাসীর অতি পরিচিত। কপিলমুনিবাসী তাঁকে মাসী বলে ডাকতেন, খুলনার মুক্তিযোদ্ধারা ডাকতেন ‘মা’ বলে।

স্বাধীনতা-উত্তর খুলনায় বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন, ঘাতক দালালদের বিচারের দাবীতে অনুষ্ঠিত মানবন্ধন ও সমাবেশ অনুষ্ঠানে প্রায়ই তাকে দেখা যেত। হাতে বাঁশের ছোট কুঞ্চি নিয়ে ঘোরাঘুরি করতেন। উপস্থিত পরিচিত অপরিচিতদের আলতোভাবে আঘাত করে আনন্দ পেতেন গুরুদাসী। তাঁকে কেউ উত্যক্ত করলে বাঁশের কুঞ্চি উচিয়ে মারার ভয় দেখাতেন। সুযোগ বুঝে হাত পেতে টাকা চাইতেন। প্রায়ই খুলনা শহরে কামরুজ্জামান টুকুর বাসায় আসতেন এবং খাওয়ার সময় হলে না খেয়ে যেতেন না। শহরে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধের বাসায় তাঁর আনাগোনা ছিল।

সর্বশেষ ২০০৮ সালের ঈদুল ফিতরের ২ দিন আগে আমার বাসায় এসেছিলেন গুরুদাসী। একজন জাপানী চিত্রগ্রাহক ও একজন ব্রিটিশ চিত্রগ্রাহক খুলনায় এসেছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি তুলতে। ঢাকাস্থ মুক্তিযোদ্ধা যাদুঘর এর পক্ষ থেকে আমাদের অনুরোধ করা হয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও গুরুদাসীকে উপস্থিত করানোর জন্য। সে দিন মুক্তিযোদ্ধা তপন কুমার বিশ্বাস ও মুক্তিযোদ্ধা মির্জা আফজাল হোসেন ও গুরুদাসী আমার বাসায় বিদেশী চিত্রগ্রাহকদের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন, দুপুরের আহার সেরে ছিলেন আমার এখানে। ঐ আমার সাথে শেষ দেখা।

বিদেশী চিত্রগ্রাহকদেরকে সামনে পেয়ে আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলছিলেন ‘তোরা রাজাকার আলবদরদের বিচার করতে পারবি নে’। যারা আমার স্বামী সন্তানদের হত্যা করেছে এ জীবনে তাদের বিচার দেখে যাবার বড় ইচ্ছা ছিল। কবে তাদের বিচার হবে? সত্যি গুরুদাসী তার স্বামী সন্তানদের হত্যার বিচার দেখে যেতে পারলেন না।

গুরুদাসীর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ ও বেদনার কথা ছিল অবুঝ ছেলেমেয়েরা তাকে রাজাকারের বউ বলে গালি দিত। তাঁকে পাগলী বলত। পাগলী বলাতে তার দুঃখ ছিল না। রাজাকারের বউ বলাতে সে অত্যন্ত কষ্ট পেত এবং বলত মুক্তিযুদ্ধে আমি স্বামী সন্তান হারিয়েছি অথচ আমাকে রাজাকারের বউ বলে গালি দেয়। বিষয়টি নিয়ে অনেকবার আমাদের কাছে নালিশ করেছে গুরুদাসী। বিষয়টি তার জন্য সত্যি বেদনাদায়ক। কেই তাকে এব্যাপারে বুঝিয়ে বলার অবকাশ পায়নি। গুরুদাসীকে আমরা উদ্ধার করেছিলাম বটিয়াঘাটার বারআড়িয়ার রাজাকার ক্যাম্প দখল করার পর। এই ক্যাম্পের রাজাকাররা গুরুদাসীর স্বামী সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে গুরুদাসীকে তাদের ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়।

বটিয়াঘাটা বারআড়িয়া রাজাকার ক্যাম্প দখলের যুদ্ধে শহীদ হন জ্যোতিষ মন্ডল এবং আজীজ। তাঁদের স্মরণে বটিয়াঘাটায় ২টি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু গুরুদাসীর নামে কোন কিছুই আমরা করতে পারিনি। স্বাধীনতার পর গুরুদাসীর এক বুক বেদনা আক্ষেপ নিয়ে চিরবিদায় নিয়ে চলে গেলেন বিজয়ের মাসে। বিজয়ের এই মাসে গুরুদাসীর মৃত্যু কাকতালীয়ভাবে কপিলমুনি যুদ্ধের তারিখের সাথে মিলে যায়। ১৯৭১ সালে ৭, ৮, ও ৯ ডিসেম্বর কপিলমুনি রাজাকার ঘাটি আক্রমণ করে পতন ঘটানো হয়েছিল। কপিলমুনি রাজাকার ঘাটি এই খুলনা বিভাগের সবচেয়ে বড় রাজাকার ক্যাম্প বলে পরিচিত ছিল। কপিলমুনির জমিদার রায়বাহাদুর বিনোদ বিহারী সাধুর বিশাল অট্টালিকায় স্থাপিত ছিল এই রাজাকার ক্যাম্প। এই অঞ্চলের রাজাকারদের ট্রেনিং দেওয়া এবং ট্রেনিংপ্রাপ্ত রাজাকারদের সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল এ ক্যাম্প।

১৯৭১ সালে ৯ ডিসেম্বর সকালে এই ক্যাম্পের দখল নেয় মুক্তিবাহিনী। পরাজিত রাজাকার আল বদরদের কোমরে দড়ি বেধে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয় কপিলমুনি হাই স্কুল ময়দানে। ঐদিন হাজার হাজার উৎসুক জনতার চোখে ছিল ক্রোধের আগুন। তাদের অনেকেই রাজাকার-আলবদরদের দিকে অংগুলি নির্দেশ করে বলছিল এরা আমার বাবাকে হত্যা করেছে, এরা আমার ভাইকে হত্যা করেছে, আমার বোনদের ইজ্জত লুন্ঠন করেছে, এরা আমার বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করেছে, লুটতরাজ করেছে, ওরা সমস্বরে চিৎকার করে বলছিল ওদের বিচার চাই, বিচার করতে হবে। আমরা তখনও পরাজিত রাজাকার আলবদরদেরকে কি করা হবে এব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। জনতার চাপে বাধ্য হয়েই আমরা সেখানে গণআদালত গঠন করি এবং গণ আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রায় শতাধিক যুদ্ধাপরাধীকে কপিলমুনি হাইস্কুল ময়দানে গুলি করে হত্যা করে গণআদালতের রায় কার্যকর করা হয়।

সেদিন থেকে গুরুদাসী ছিল অত্যান্ত ভাগ্যবতী। একই মাঠে তাঁর সবদেহ সামনে রেখে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানালেন। শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সময় কপিলমুনিতে অবস্থিত গুরুদাসীর বাসগৃহে তাঁর চিতাভস্ম সংগ্রহ করে মিউজিয়াম ও লাইব্রেরিতে রূপান্তরিত করার দাবি জানানো হয়েছে। আর এটা করা হলে গুরুদাসীর প্রতি সঠিক শ্রদ্ধা জানানো হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গুরুদাসী সম্পর্কে জানতে পারবে। গুরুদাসীকে তার স্মৃতিকে ধরে রাখতে দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের। এব্যাপারে সম্মিলিতভাবে সকলের উদ্যোগ নিতে হবে।

ইয়াসমিন কবীর গুরুদাসীকে নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরী করেছিলেন প্রায় ৫ বছর আগে। এটি এখন একটি প্রামান্য দলিল। ইয়াসমিন কবীরের নির্মিত ডকুমেন্টারি আমেরিকায় পুরস্কৃত হয়েছে। গত ২০ ডিসেম্বর ২০০৮ গুরুদাসীর শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ স্বাধীনতা নামের প্রামান্য চিত্রটি উপভোগ করেছে কপিলমুনি হাইস্কুল মাঠে। এখানে উপস্থিত ছিলেন এ প্রামান্য চলচিত্রের পরিচালক ইয়াসমিন কবীর ও খুলনার মুক্তিযোদ্ধাবৃন্দ। এ ছবিতে গুরুদাসী ইচ্ছা পোষণ করে গেছেন তার মৃত্যুর পর তাকে স্মরণে রাখতে যেন একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়। আমরা সকলে উদ্যোগ নিলে গুরুদাসীর স্মৃতিকে ধরে রাখতে পারবো এটা আমার বিশ্বাস।

এছাড়া শাহরিয়ার কবীর তার মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রামান্য দলিল ডকুমেন্টারীতে গুরুদাসীকে ধরে রেখেছেন। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় তার জীবদ্দশার কিছু ধারন করা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য এ.টি.এন. বাংলার বিশেষ প্রতিনিধি মুন্নী সাহার ধারনকৃত চিত্র। যেগুলি বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসে প্রচারিত হয়ে থাকে। গুরুদাসীর মৃত্যুর পর শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সমূহের ধারনকৃত চিত্র মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে পাঠানো হয়েছে, জানিনা সেগুলো কতটুকু প্রদর্শন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *