ভাষা আন্দোলনের কথা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রাক প্রস্তুতি

লেখক: জান্নাতুন নাঈমা তূর্ণা
তারিখ: ২৮ নভেম্বর ২০১৬

পাকিস্তানের গণপরিষদে বাঙলা ভাষার স্থান না হওয়ায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে প্রতিবাদ সভা, সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ঐদিন পুলিশ ছাত্রদের বাধা দেয় এবং বহু ছাত্রকে গ্রেফতার করে। কারাবরণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যান্য বন্দী নেতাদের মধ্যে ছিলেন শামসুল হক, অলি আহাদ, শওকত আলি, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ; কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের পরেও ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্র আন্দোলন চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ১৫ মার্চ প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ছাত্রদের সাথে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষর করেন। এর চারদিন পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা আসেন, ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক জনসভায় বক্তৃতা করেন এবং উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার স্পষ্ট ঘোষণা দেন।

২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ ভাষণ দেন। ওই বক্তৃতায় তিনি বলেন:
‘…রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের যোগাযোগের ভাষা হিসেবে একটি ভাষা থাকবে এবং সে ভাষা হবে উর্দু অন্য কোনো ভাষা নয়। কাজেই স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, যা এই উপমহাদেশের লক্ষ লক্ষ মুসলমানের দ্বারা পুষ্ট হয়েছে, যা পাকিস্তানের এক থেকে অন্য প্রান্ত সকলেই বোঝে এবং সর্বোপরি যার মধ্যে অন্য যে কোন প্রাদেশিক ভাষা থেকে অধিক ইসলামী সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য বাস্তব রূপ লাভ করেছে এবং যে ভাষা অন্যান্য ইসলামী দেশগুলিতে ব্যবহৃত ভাষার সর্বাপেক্ষা কাছাকাছি।’
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ছাত্রলীগের নেতৃত্বে রাষ্ট্রভাষা কর্ম পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল জিন্নাহ’র সাথে সাক্ষাৎ করে বাঙলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমেদ, আবুল কাশেম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দিন আহমদ, এবং শামসুল আলম।

১৯৪৮ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠে এক ছাত্রসভায় ভাষণ দেন। এই সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তরফ থেকে বাঙলা ভাষার দাবি পুনরায় উত্থাপন করা হয়। কিন্তু লিয়াকত আলি খান কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। ১৯৪৮-১৯৪৯-১৯৫০ ভাষার দাবিতে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঘটনাবহুল সময় পার করে পূর্ববাঙলা।

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে ঘোষণা করেন উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা; এই ঘোষণার পর ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে; প্রতিবাদস্বরূপ ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘সর্বদলীয় কর্মপরিষদ’ গঠিত হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয় এবং স্থির হয় ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবসরূপে পালিত হবে। ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধায় নুরুল আমিন সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। নবাবপুরে আওয়ামী লীগ অফিসে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে বদ্ধপরিকর ছিলো। সংগ্রাম পরিষদের সভায় ছাত্রলীগ নেতা ডা. গোলাম মওলার নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃস্থানীয় ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে ভোট দেন; ছাত্রলীগের সদস্যরা ১০ জন করে অসংখ্য দলে বিভক্ত হয়ে শৃঙ্খলার সাথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছাত্ররা ১১৪ ধারা ভাঙা শুরু করলে ছাত্রদের সাথে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়ে যায়। এদিকে বিকাল তিনটার দিকে আইন পরিষদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবার কথা ছিলো। ছাত্ররা ভাষার দাবিতে পরিষদ ভবনের দিকে যেতে শুরু করে, কিন্তু পুলিশ বাধা দেয় ও এক পর্যায়ে ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম দফা গুলিতে রফিকউদ্দিন ও জব্বার নিহত হয়। দ্বিতীয় দফা গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত আহত হয়, রাতে হাসপাতালে মারা যান তিনি। এদিকে কারাগারে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন শেখ মুজিবুর রহমান, সেই সাথে তিনি ছাত্রলীগ নেতাদের ভাষা আন্দোলনের দিকনির্দেশনা প্রদান করেন চিরকুট মারফত। ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং ছাত্ররা এক বিরাট শোক শোভাযাত্রা বের করে। হাইকোর্ট ও কার্জন হলের মাঝামাঝি রাস্তায় পুলিশ ছাত্রদের বাধা দেয় এবং গুলি চালায়। এসময় শফিউর রহমান ও রিকশাচালক আউয়াল নিহত হন। ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি সকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে শহীদ শফিউর রহমানে পিতা আর ২৬ ফেব্রুয়ারি আবুল কালাম শামসুদ্দিন আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনারের উদ্বোধন করেছিলেন। ইতিমধ্যে পুলিশ নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, আবদুল হামিদ খান ভাসানী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিতকুমার গুহ, পুলিন দে, অধ্যাপক পৃথ্বিশ চক্রবর্তী, অলি আহাদ প্রমুখকে গ্রেফতার করে। নুরুল আমিন সরকার ভাষা আন্দোলনকারীদের ‘ভারতের চর’, ‘হিন্দু’ ইত্যাদি আখ্যা দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *