মাইন বিস্ফোরণে দুই পাকিস্তানি সেনার ধর গিয়ে লটকায় খেঁজুর গাছের ডালে

সেই অপারেশনে কতলোক মারা গিইলো, তা গুনতি পারিনি। কিন্তু একটা খেজুরগাছের মাথায় দুই পাক সেনার মাথাবিহীন দুটো লাশ ক্রসচিহ্নের মতো ঝুলে ছিল।’- মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অনেক অপারেশনের একটি বর্ণনা দিতে গিয়ে কথাগুলো বলছিলেন বীর প্রতীক আবদুল জলিল। তিনি রকেট জলিল নামেই পরিচিত- গোটা যশোরের পরিচিত মুখ। মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাক বাহিনীর কাছে তিনি ছিলেন সাক্ষাত এক আতঙ্কের নাম! এই নাম দিয়েছিল পাক বাহিনীই। তিনি বিভিন্ন জায়গায় দ্রুত অপারেশন করে দ্রুত সটকে পারতেন। পাক সেনারা যেখানেই যায়, সেখানেই শোনে জলিলের নাম। জলিল শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয় পেয়ে তারা কেঁপে উঠত। আতঙ্কে এদিক-ওদিক তাকাত। পাক সেনারা বলে, ‘রকেট হ্যায় না কিয়া হ্যায়!’ এরপর থেকেই তার নাম হলো রকেট জলিল। মুক্তিযোদ্ধা রকেট জলিল বলেন, সেটা জুলাইয়ের প্রথম দিকের ঘটনা।

যশোরের ঝিকরগাছার দোসতিনা প্রাইমারি স্কুলের মাঠে ক্যাম্প করেছে পাকিস্তানীরা। পাশের ছুটিপুরে তাদের হেডকোয়ার্টার। তখন বর্ষাকাল। ক্যাম্পের সেনারা প্রতিদিন বদলি হয়। সকাল দশটা থেকে সাড়ে দশটা নাগাদ তারা ক্যাম্প বদল করে। আমরা ২০ জনের একটি টিম নিয়ে বড় একটি অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিই মধুখালীর শালবাগান এলাকায়।

জলিলের ভাষ্যমতে, রাত চারটার দিকে, আমি আবদুস সাত্তার, গোলাম মোরশেদ, রফিকুল ইসলাম, চাপাতলার সাত্তারসহ ২০ জন সেখানে এ্যাম্বুশ করি। এরই মধ্যে রাস্তায় বারোটি এ্যান্টি-পারসোনাল জাম্পিং মাইন পুঁতে রাখা হয়। খুবই দক্ষতার সঙ্গে কাজটি করেন তিনি। সকাল দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে সেনারা স্থান বদল করে। কিন্তু যথাসময়ে পাকিস্তানী সেনারা কেউ আসছে না। বেলা এগারোটার দিকে রকেট জলিল রেকি করতে বের হন। টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। মাথায় টোকা, হাতে নিড়ানী আর কাঁস্তে। হঠাৎই আবির্ভূত হয় পাকিস্তানীরা! জিজ্ঞেস করে, তুম মুক্তি?’ জবাব দেন, ‘নেহি।’ এর পর সেনারা তাকে আটক করে নিয়ে যেতে থাকে দোসতিনার মধ্য দিয়ে। বেশ বিচলিত হন রকেট জলিল, কলেমা পড়েন, ভাবেন, রাজাকাররা যদি দেখিয়ে দেয়, তবেই শেষ! মাথায় একটা গুলির বাক্স দিয়ে তাকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেনারা। কিছু দূর যাওয়ার পর কাদামাটিতে ইচ্ছা করেই পড়ে যান। ভাবেন, যদি অসুস্থ মনে করে তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু বিধি বাম! উল্টো লাথি মেরে তাকে জোর করে উঠিয়ে আবারও মাথায় বাক্সটি তুলে দেয়। এভাবে পৌঁছে যান দোসতিনার মোমিন মাস্টারের কাঁঠালবাগানে। সেখানে দুজন সেনার উপস্থিতিতে গাঁতি দিয়ে তাকে মরচে (বাঙ্কার) খুঁড়তে বলে। দু-এক কোপ দেয়ার পর জলিল দেখেন, পাকিস্তানী সেনা দুজন দুই দিকে মুখ ঘুরিয়ে গাছের শেকড়ের ওপর বসে বিশ্রাম নিচ্ছে। এই সুযোগ! আস্তে আস্তে চলে আসি তাদের কাছে। গাঁতি (খেজুর গাছ কাটার দা) দিয়ে মাথা বরাবর কোপ! দুই ভাগ হয়ে গেল নিমেষে। শব্দে অপরজন সামনে ফিরতেই সেটাকেও …। মাথার ঘিলু-রক্তের ছোপ ছিটকে মুখে লাগে। দুটি চায়নিজ রাইফেল নিয়ে দিই ভোঁ-দৌড়।

পরদিন সেই জায়গায় আবারও বারোটি মাইন স্থাপন করি। সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ সেনাসদস্যরা সেখানে হল্ট করায় বাহিনীকে। তিন শতাধিক সৈন্য কাদামাটিতে, অস্ত্র কাঁধে সতর্ক অবস্থায়। রকেট জলিল বলেন, আমরা ২০ জনের মতো এ্যাম্বুশে। একজনের দায়িত্ব ছিল মাইনের সঙ্গে যে শক্ত সুতো বাঁধা, সেটা টান দেয়ার। আর্মিদের উপস্থিতিতে ফিরে দেখি সে নেই, পালিয়েছে আরও পাঁচ-ছয়জন। আমি বাঙ্কারে, এসএলআর হাতে। এখান থেকে পালানো সম্ভব নয়। ইয়া আলী বলে সুতো ধরে দিই টান। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয় মাইনগুলো। এসএলআরটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ব্রাশফায়ার করি। অপর সঙ্গীরাও তখন ফায়ার করছে। ফায়ার করতে করতে আমরা পিছিয়ে আসছি। লাশ পড়ছে কাদার মধ্যে।’ কত লোক মারা (সৈন্য) গিইলো, গুনতি পারিনি। কিন্তু মাইন বিস্ফোরণের পর দেখতি পাই, একটি খেজুরগাছের ডালে মাথাবিহীন দুই সেনা ক্রসচিহ্নের মতো ঝুলে আছে।’ জলিল বলেন, ‘গরুর গাড়িতে করে লাশগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ঝিকরগাছা থানার মদ্যি (মধ্যে)। যারা নিয়ে গিইল, তারা লাশ গুনে কইলো ৩২। পরদিন কপোতাক্ষের পানিতে পাওয়া যায় আরও ছয় লাশ।’

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া ইউনিয়নের মনোরম একটি গ্রামের নাম পাল্লা। ১৯৬৩ সালে এই গ্রামের মহর আলী মোড়ল আর চেয়ারবানুর ঘরে জন্ম আব্দুল জলিলের। স্থানীয় স্কুলেই লেখাপড়া। ১৯৬৩ সালের দিকে যোগ দেন মুজাহিদ কোম্পানিতে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মুজাহিদ কোম্পানি থেকে কেউ সেনাবাহিনী, কেউ পুলিশ কিংবা ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-ইপিআরে যোগ দেন। আব্দুল জলিল ১৯৬৮ সালে ইপিআরে যোগ দেন সিপাহী পদে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে উজ্জীবিত এবং পরে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন ইপিআরের রাজশাহী অঞ্চলে কর্মরত এই জওয়ান। ২৮ মার্চ তিনিসহ চারজন চারটি রাইফেল নিয়ে রাজশাহী থেকে যশোরে এবং সেদিনই বেনাপোল ক্যাম্পে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়ার কথা জানান। রাতেই মার্চ করেন যশোরের চাঁচড়া ক্যাম্পে। ৮ নম্বর সেক্টরে মেজর আবুল মঞ্জুরের নেতৃত্বে অনেক যুদ্ধে অংশ নেন। রকেট জলিল ছিলেন টুআইসি ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার তত্ত্বাবধানে।

১৯৯৬ সালে তাকে ‘বীর প্রতীক’ পদক দেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মুক্তিযোদ্ধা ও বীর প্রতীক ভাতা এবং আড়াই বিঘা জমি থেকে পাওয়া ফসল থেকেই সংসার চলছে জলিলের। ২০১১ সালে হার্টে দুটো রিং পরানো হয়, আছে ডায়াবেটিস আর উচ্চ রক্তচাপ। স্ত্রী হালিমা খাতুন, তিন ছেলে আর চার মেয়ে বর্তমান। ছেলেরা সবাই দেশের বাইরে থাকে, মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *