মুক্তিযুদ্ধের দলিলঃ ফরিদপুর জেলায় কী ঘটেছিলো ১৯৭১ এ? যারা বেঁচে আছেন, তাদের ভাষ্যে

ঘাতকঃ মেজর আনসারী, মেজর আকরাম কোরেশী, সেপাই রাশিদ খান (বেলুচ)।
অপরাধের ধরনঃ গণহত্যা, জাতিগত নিধন, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ

সাক্ষীঃ মোঃ মোসলেম শরীফ, মো মনু মিয়া, মঙ্গল চন্দ্র শীল, খন্দকার জাকির হোসেন নিলু, সুফিয়া বেগম, সোহরাব ফকির, সুফিয়া বেগম, হাফিজুর রহমান চানুমিয়া, মোঃ আবুল ফয়েজ, এ কে এম আবু ইউসুফ সিদ্দিক।
ঘটনাকালঃ সতেরোই এপ্রিল থেকে আট ডিসেম্বর পর্যন্ত।
ক্রাইম সাইটঃ ফরিদপুর

মঙ্গল চন্দ্র শীল বলেন, পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নির্মমভাবে নিহত আঠাশ জনের লাশ দেখার পর, আমি পাকি বাহিনীর ভয়ে স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে মোলাকান্দায় চলে যাই। সারা গ্রাম জুড়ে এমনভাবে লাশ পড়ে ছিল, যেটা বেশিক্ষণ দেখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রত্যক্ষদর্শী গ্রামবাসীদের কাছ থেকে জানা যায়, আঠারোই বৈশাখ অর্থাৎ ১৯৭১ সনের মে মাসের প্রথম সপ্তাহের কোন এক রাতের শেষ প্রহরে পাকি বাহিনী জান্দি আক্রমণ করে, তারা নির্বিচারে আক্রমণ করে প্রথম রাতেই আঠাশ জন গ্রামবাসীকে হত্যা করে। এর মধ্যে পঁচিশ জনের নাম জানা যায়।
এঁরা হলেন-
১. টনিক সেন
২. উপেন কম্পাউন্ডার (টনিক সেনের বাবা)
৩. অটা ঠাকুর,
৪. সুধীর সেন
৫. আশ্রমের মহারাজ
৬. শংকর কুমার সেন
৭. গোবিন্দ
৮. বিনয় কুমার সেন
৯. সুধীর কুমার সেন
১০. সিস্টা সেন
১১. মধুসূদন সেন
১২. সোমেশ্বর সেন
১৩. কালাচাঁদ সেন
১৪. গুরু দাস
১৫. নিত্য সেন
১৬. মদিল সেন
১৭. জীবন কৃষ্ণ সেন
১৮. ননী গোপাল সেন
১৯. পচা সেন
২০. পানড়বা সাধু
২১. ধীরেন বণিক
২২. পঞ্চানন্দ ধুপি
২৩. শ্রীমন্ত দত্ত
২৪. মাধব দত্ত
২৫. নইদা বৈরাগী

কোদালিয়া হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে শহীদ রহিমুনেড়বসার সন্তান মিলু জানান, পাকিস্তানি আর্মি প্রথমবার নগরকান্দা কলেজের পার্শ্ববর্তী বালিয়া গ্রামে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সেখান থেকে এগিয়ে গিয়ে ঈশ্বরদী গ্রামে বাড়িঘর জ্বালিয়ে ওরা চলে যায়। এরপর পয়লা জুন, বাংলা ষোলোই জ্যৈষ্ঠ মিলিটারিরা ঈশ্বরদী গ্রাম হয়ে কোদালিয়া আসে। নারী পুরুষসহ ত্রিশ জনকে সেদিন তারা হত্যা করে। ত্রিশ মে হত্যা করে সাদেক, পিপির উদ্দীন ও আফাজউদ্দীনসহ আরও কয়েকজনকে। নিলু জানান, পাড়ার সম্ভ্রান্ত পরিবার হিসেবে হয়তো আমাদের বাড়িতে কিছু
করবে না, এ রকম মিথ্যে ধারণা থাকলেও ফিরে যাওয়ার মুহূর্তে মিলিটারিরা আমাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় এবং অনেককেই হত্যা করে। আমার মা, খালা, নানীসহ, অনেকেই সেদিন পাকি আর্মির হাতে শহীদ হন।

কোদালিয়া গ্রামের সুফিয়া বেগম বলেন, চারদিকে পাকি বাহিনীর অত্যাচারের খবর শুনে বাড়িতে মন টিকছিল না।বারবার স্বামীকে অনুরোধ করছিলাম, অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু স্বামীর একই কথা, সামনে বিল রয়েছে, এই দুর্গম স্থানে পাকিস্তানি মিলিটারি আসবে না। অগত্যা আমি দু’বাচ্চা নিয়ে একাই বাবার বাড়ি ছাগলদি চলে যাই। এর পরদিনই কোদালিয়া গ্রামে আর্মি আসে। আগুনের লেলিহান শিখা জ্বলতে দেখে উত্তভ্রান্ত হয়ে ওঠে আমার মন। তাণ্ডব কমলে বাবার বাড়ি থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে গ্রামে ফিরে আসি। এসে দেখি আঠারো জন মহিলার লাশ পড়ে আছে। কারও মাথার অর্ধেক নেই, কারও চোখ নেই, কারও মুখ নেই। যাঁরা গুলি খেয়ে বেঁচে
ছিলেন তাঁদের গোঙানির শব্দে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। আহতরা সবাই পানি চাচ্ছিলেন। আমার চাচা শ্বশুরের মেয়েও আমাকে দেখে, “ভাবী, পানি দাও” বলে কাতরাচ্ছিলেন। বাড়িঘর সব পুড়ে শেষ হয়ে গেছে তখন। কোথাও পাত্র পাচ্ছিলাম না। শেষে হাঁসের পানি খাওয়ানোর বাটিতে করে কোনমতে পানি খাওয়াই তাঁদের। চারদিক তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। সেদিন বাড়ির পুরুষ যারা ছিল, সবাইকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি নরপশুরা

কোদালিয়া হত্যাকাণ্ডের আর এক প্রত্যক্ষদর্শী সোহরাব ফকির তখন গ্রামেই ছিলেন। তিনি বলেন, তিনি জানান, মিলিটারি গ্রামে ঢুকে আগুন দেওয়া শুরু করলে লুকিয়ে পড়ি আমি। মহিলারা প্রাণের ভয়ে সবাই এক জায়গায় গিয়ে লুকান। সেখান থেকে তাঁদেরকে ধরে নিয়ে যায়। এদের সাথে বিশ তিরিশটা বাচ্চা ছিল। তাদেরকে খেলার নাম করে সরিয়ে দেয় পাকি সেনারা। এরপর মহিলাদের সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে মেশিনগান দিয়ে গুলি করে। প্রথম বার হয়ত আহত হয়েছিলেন অনেকে। দ্বিতীয় বার গুলি করলে বেশি মারা পড়ে এবং লাশগুলোও বিকৃত হয়ে যায়। মিলিটারি চলে যাওয়ার পর আমি বেরিয়ে আসি। কয়েকজনে মিলে কোনমতে গর্ত করে লাশগুলো মাটিচাপা
দেই। আঠারো জন মহিলা ছাড়া সেদিন পাঁচ জন পুরুষও মারা গিয়েছিলেন।

কোদালিয়ার হাফিজুর রহমান চানুমিয়া বলেন, সকাল ন’টা দশটার সময় মিলিটারি গ্রামে ঢোকে। এর ক’দিন আগে মজিদ নামে একজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা। সে ছাড়া পেয়ে ছুটতে ছুটতে এসে খবর দেয় মিলিটারি আসছে। এ সময় চাচা-চাচি, চাচাতো ভাইবোন সবাই মিলে আমরা জঙ্গলে গিয়ে লুকিয়ে পড়ি। আমার চাচা হানড়বান মিয়া “তোমরা বসো, আমি দেখে আসি” বলে জঙ্গল থেকে বেরিয়েই পাকি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে যান। এরপর আমরা জঙ্গলের আরও গভীরে চলে যাই। সেখানেও মহিলাদের দেখতে পাই আমরা। কিন্তু চারপাশ ঘিরে মহিলাদের ধরে ফেলে পাকি সেনারা। শিশুদেরকে মহিলাদের কাছ থেকে সরিয়ে দেয় তারা। বেশি বয়স্কদেরকেও
আলাদা করে দেয়। দশ-বারো জন পুরুষকে ধরে লুটপাটের মাল বয়ে নেওয়ার কাজে নগরকান্দা পাঠায়। এদের মধ্যে আমার বাবা এবং চাচাও ছিলেন। এরপর আমাকেসহ দশ-এগারো বছরের বাচ্চাদের আলাদা করে বিলের পাশে বসায়। আমাদের দেখা শোনা ও বোঝানোর জন্য পাকিরা হানড়বান চাচাকে পাঠিয়ে দেয়। তিন চার জন মিলিটারি শিশুদেরকে বিলের ওপারে নিয়ে যায়। বিশ মিনিট পর আমি দেখি যে, সব বাড়িঘর জ্বলছে। শিশুরা তখন মায়েদের জন্য কাঁদছে। আমিও সঙ্গের ছোট তিন ভাইবোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকি। এর মধ্যে মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারের শব্দ হয়। অজানা আতঙ্কে বুক কেঁপে উঠে আমার। এরপর ছেড়ে দেওয়া হয় বাচ্চাদের। অনেক কষ্টে বিল সাঁতরে এপারে চলে আসতে সক্ষম হই আমরা।

পাকিদের হাতে বন্দী হওয়া এ কে এম আবু ইউসুফ সিদ্দিক বলেন, পাকিস্তানি আর্মি ও তাদের দোসরদের তাণ্ডবলীলা থেকে বাঁচার জন্য আমরা টুপি পরে বাইরে বের হতাম। এ রকম অবস্থার মধ্যে আমার বড় ভাই বেলায়েত হোসেন একদিন বললেন, ‘ফরিদপুর শহরে যেভাবে লুটপাট চলছে, না জানি আমাদের গ্রামের বাড়ির কী হাল হয়েছে। চল বাড়িটা একবার দেখে আসি।’ পরের দিন সকালে রাস্তায় বের হয়ে দেখি, পরিস্থিতি আমাদের ধারণার চেয়েও ভয়াবহ। ভাঙ্গা রোডের মোড় পেরিয়ে কিছুদূর এগুনোর পর দেখি, রাস্তার ওপর হারকান্দির যাত্রাভিনেতা মতি পাগলার লাশ পড়ে আছে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি, পাকি আর্মি মজিবর রহমান সিদ্দিকীর বাড়ি লুট করছে।

স্টেডিয়ামের যে কক্ষগুলোকে পাকি আর্মি নির্যাতন কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহার করত, তার সামনেই ছিল চারুমজুমদারের বাড়ি। তাঁর বাড়ির অংশবিশেষ দখল করে মেজরের জন্য অফিস বানানো হয়েছিল। মজুমদার বাবুও বলতে পারতেন না, আর্মি কখন কাকে মারছে। প্রতি সন্ধ্যায় মেজর বন্দীশালার ভেতরে এসে বলত, ‘ছে আদমিকো আপনা আপনা ঘরমে ভেজ দো। আর দো আদমিকো সাবাসাবাকে নাস্তা বানাও।’ অর্থাৎ ছ’জনকে মেরে ফেল, আর দু’জনকে ছেড়ে দাও। নানারকম সাংকেতিক ভাষায় ওরা কথা বলত। কিন্তু এইসব কথাবার্তা আমরা এত বেশি শুনেছি যে, সব মুখস্ত হয়ে গিয়েছিল। যদি ছয় জনের অর্ডার হত, তবে ওরা বের করে নিত বিশ জনকে। স্টেডিয়ামের ভেতরে বেশিরভাগ বন্দীকে জবাই করে হত্যা করা হত। বর্ষার সময় ওই জায়গাটা পানিতে ভরে যেত। তখন ভাঙ্গা ব্রিজ, কামারখালীর ডক প্রভৃতি জায়গাতে নিয়ে তাদেরকে হত্যা করা হত।

ফরিদপুরে স্টেডিয়ামে অন্তত এক শ’ পঁচিশ জন মহিলা বন্দী ছিলেন। আমাদের পাশের রুমেই তাদেরকে গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। আমরা রুমের ভেতর থেকেই তাঁদেরকে দেখতে পেতাম। তাদের ওপরেও সীমাহীন অত্যাচার চালানো হয়েছিল।

আর্মির তো বিবেক বলে কিছু ছিল না। ধর্ষণের পর বেয়নেট দিয়ে অনেকের স্তন কেটে ফেলত, যৌনাঙ্গে রাইফেলের নল ঢুকিয়ে গুলি করত। অত্যাচারে অত্যাচারে ছিন্নভিন্ন করে ফেলত
তাঁদের দেহ। এসব আমরা চোখের সামনেই ঘটতে দেখেছি। সব ঘটনা তো ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। প্রকৃত ঘটনার অতি সামান্যই বলতে পারলাম।

নির্যাতিতদের মধ্যে যাদের কথা বলার শক্তি অবশিষ্ট থাকত, তাঁদের কেউ কেউ আমাদের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলতেন, ‘ভাই, আমরা তো মরে যাব, আপনাদের কেউ যদি এই মৃত্যুপুরী
থেকে বেঁচে যান, তাহলে আমার মৃত্যুর সংবাদটা আমার বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। এই মহিলাদের অনেককেই আমি চিনতাম। ফরিদপুরসহ আশেপাশের বিভিনড়ব এলাকা থেকে তাদেরকে ধরে আনা
হয়েছিল। নগরকান্দা, বোয়ালমারী প্রভৃতি এলাকার মেয়েদেরকেও আমি সেখানে দেখেছি। তবে শহরের মেয়ে ছিল খুব কম। বেশিরভাকেই বাইরে থেকে ধরে আনা হয়েছিল। এ কারণে সবাইকে চিনতাম না। কারও নাম পরিচয় জিজ্ঞেস করারও কোন উপায় ছিল না। সবাইকে উলঙ্গ করে রাখা হত।

কী যে বীভৎস দৃশ্য! সেইসব দৃশ্য যারা দেখেনি, যেভাবেই বর্ণনা করা হোক না কেন, প্রকৃত অবস্থা তাদেরকে কিছুতেই বোঝানো যাবে না। বন্দী অসহায় সেইসব মেয়ের শরীরের ওপর জানোয়ার পাকিস্তানি আর্মির সেই বীভৎস অত্যাচারের দৃশ্যগুলো আমি কখনও ভুলতে পারব না। এসব বর্ণনা করতে গেলে আমার হাত-পা কাঁপতে থাকে, শরীরের পশম শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আমার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। মনে হয় কেউ যেন আমার গলা চেপে ধরেছে। সে সময় আর্মির অত্যাচারের দৃশ্য দেখে দেখে আমি ভেবেছি ‘মানুষ কি সত্যিই সৃষ্টির সেরা জীব’?

পাকি সেনারা বাঙালি মেয়েদেরকে মুরগি বলে ঠাট্টা করত। শহর থেকে ধরে আনা মেয়েদেরকে রুমের ভেতরে ঢোকাতে ঢোকাতে বলত, ‘বাঙালি আওরাত, তুম আগে যাও। তুমহারা বাঙালি ভাইকো হাম রুপিয়া দিতা হ্যায়। ওহ মেরা পাস মুরগি দিয়া যাতা হ্যায়।

আর্মি সাধারণত সন্ধ্যা সাতটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত মেয়েদের ওপরনির্যাতন চালাত। যে রুমটাতে নির্যাতন করা হত, সেখানে নীল বাতি জ্বলত। বড় অফিসার, ছোট অফিসার,
সেপাই কেউই বাদ যেত না। সবাই ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়ে ফেলতে চেষ্টা করত মেয়েগুলোকে। তবে সুবেদার, মেজর শ্রেণীর আর্মিই অত্যাচার করত বেশি। খুব বড় অফিসাররা আবার প্রতি রাতে দু’চার জনকে বাংলোয় নিয়ে নির্যাতন করত।

( চলবে )

[আমার কথাঃ ইদানিং বাংলাদশে একটি তরুন মহল তৈরী হয়েছে যারা প্রশ্ন করনে ১৯৭১ এ কী আদৌ ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছিলো? আসলেই কি ২ লক্ষ মা-বোন নির্যাতিত হয়েছিলো? তাদরেকে উত্তর দবোর ভাষা আমার নাই]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *