মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি : মার্চ ১৯৭১

১৯৭১ সালের ১ মার্চ তারিখে সচিবালয়ে কাজ সেরে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ (তৎকালীন জিন্নাহ অ্যাভিনিউ)-এ আমার যাওয়ার কথা। দুপুর ১২-১টার দিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রেডিওতে ভাষণ দেন। ভাষণের পরপরই দ্রুত পাল্টে যায় রাজধানীর পরিস্থিতি। জাতীয় সংসদের অধিবেশন বাতিলের ঘোষণা যে ‘জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং পাঞ্জাবি শাসকদের ষড়যন্ত্র’ তা পূর্ববাংলার জনগণ সহজেই বুঝতে পারলেন। পূর্ববাংলার সর্বত্র প্রতিবাদের ঝড় উঠল। ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত হোটেল পূর্বাণীর সামনে সমবেত জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংক্ষিপ্ত ভাষণে ইয়াহিয়ার কঠোর সমালোচনা করেন এবং ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্ক অবস্থান গ্রহণের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যত শিগগিরই সম্ভব রাঙামাটি ফিরে যাব।
২ মার্চের পর ঘটনাবলি অত্যন্ত দ্রুত এগিয়ে চলে, প্রেক্ষাপটও পরিবর্তিত হয় সেইসাথে। ৩ মার্চ চট্টগ্রামে যে ঘটনা ঘটে পরবর্তীকালের ঘটনার মধ্যে তা হয়তো অনেকটা চাপা পড়ে গেছে। হয় তো অনেকেই বিস্মৃত হয়েছেন। কিন্তু আমার মনে গাঁথা আছে।
৩ মার্চ দুপুরের দিকে খবর পেলাম চট্টগ্রামে প্রচ- গোলযোগ হচ্ছে। ২ মার্চ বিকেলে জনসভার পর অনেক মিছিল বের হয়। এসব মিছিলের ওপর বিহারিরা সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় হামলা চালায়। শের শাহ কলোনি, ফিরোজ শাহ কলোনি, পাহাড়তলি প্রভৃতি স্থানে হামলা চলে। লালদীঘি ময়দানে আগমনরত এবং প্রত্যাবর্তনের পর মিছিলের ওপরে সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালানো হয়। এতে একটা জিনিস সুস্পষ্ট হয় যে, সেনাবাহিনী এবং অবাঙালিরা আগে থেকেই তৈরি ছিল এবং বাঙালিদের প্রতিরোধ করার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি তারা নিয়েছিল।
চট্টগ্রাম থেকে খবর পাওয়া যায় যে, অবাঙালি ঘাঁটিগুলোতে সেনাবাহিনীর স্পেশাল গ্রুপ (কমান্ডো) এবং গুপ্তচররা আগে থেকেই অবস্থান নিয়েছিল এবং এসব জায়গা থেকে নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানো হয়। শুধু তাই নয়, অনেক স্থানে মারাত্মক অস্ত্র নিয়ে সরাসরি আক্রমণও পরিচালনা করা হয়। এমনকি এদের মেয়েরা বাড়ির ছাদ থেকে গরম পানি ঢেলে দেয় জনতার ওপর।
রাঙামাটিতে আমাদের খবর আদান-প্রদানের দুটি ভালো অবস্থা ছিল : একটি পুলিশের এবং আরেকটি ইপিআর (আজকের বিজিবি) বেতার-সেট। জেলার সব থানা এবং ইপিআর এবং বিওপি (বর্ডার আউট পোস্ট) উইংসমূহ রাঙামাটির সাথে সংযুক্ত ছিল ওয়্যারলেসের মাধ্যমে। ইপিআরের ওয়ারলেস ছিল কোর্টের পাশে। পুলিশেরটা ছিল তাদের লাইনে। নিজে সরাসরি কথা বলতে হলে আমাকে এ দুটি জায়গায় যাতায়াত করতে হতো।
আমি রাঙামাটিতে ফিরে আমার অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ডেকে নিলাম। আমার সহকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল সৈয়দ আবদুস সামাদের। তিনি ছিলেন অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনার এবং পুনর্বাসন অফিসার। ওই সময় টগবগে তরুণ। প্রখর বাঙালি জাতীয়তাবাদী এবং স্পষ্টভাষী। দ্বিতীয় জন ছিলেন এমই শরিফ, ম্যাজিস্ট্রেট এবং সহকারী পুনর্বাসন অফিসার। তিনিও ছিলেন খুব স্বাধীনচেতা এবং উদার মনের মানুষ।
রাঙামাটি সদরের এসডিও আবদুল আলি ছিলেন আরেক মহৎপ্রাণ, বাংলাদেশের জন্য নিবেদিত। আবদুল আলি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। এপ্রিলে পাকিস্তানি সেনারা রাঙামাটি দখলের সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করে। সে সময় তিনি রামগড়ের পথে যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পাকিস্তানি সেনারা অমানুষিক অত্যাচার করে আলির ওপর, আমার গতিবিধি এবং কার্যকলাপ জানার জন্য। শহীদ আবদুল আলি নিজে প্রাণ দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা রক্ষা করেছেন। তিনি শত অত্যাচারেও মুখ খোলেন নি কিংবা আমাদের গতিবিধি ও কাজ সম্বন্ধে শত্রুদের কাছে কিছু ফাঁস করেন নি।
এমই শরিফ সাহেবকে বিজয়ের সাথে সাথে রাঙামাটিতে পাঠানো হয় ডেপুটি কমিশনার করে। পরে অনেকদিন চাকরিতে ছিলেন। বেশ কয়েক বছর আগে তিনি ইন্তেকাল করেছেন।
এসএ সামাদ এবং এমই শরিফ রাঙামাটিতে আমাদের সাথে আলোচনার সাথে সাথে বের হয়ে পড়েন সমগ্র পার্বত্য এলাকায় ইপিআর ও পুলিশ বাহিনীকে মানসিক প্রস্তুতি ও সংগঠিত করতে। তাদের দায়িত্ব ছিল জেলার বিভিন্ন থানা, বড় বড় হাট-বাজার ও পুলিশ ক্যাম্পে জওয়ানদের সাথে কথা বলা ও তাদের আসন্ন স্বাধীনতাযুদ্ধের জন্য অনুপ্রাণিত করা। আরও কঠিন গুরুদায়িত্ব ছিল সীমান্ত এলাকার সকল ইপিআর বর্ডার আউট পোস্ট (বিওপি) গিয়ে বাঙালি অফিসারদের সাথে কথা বলা ও গোপন ইঙ্গিত দিয়ে আসা। এসব বিওপি’তে কমিশনড অফিসার ছিলেন নাÑ ছিলেন জেসিও এবং এনসিও (যেমনÑ সুবেদার, হাবিলদার, নায়েক এরা)।  কয়েকজন সুবেদার, মেজর, নায়েক সুবেদার ছিলেন। এদের বলা হলো যে, তারা যেন কোনো অবস্থাতেই পশ্চিমাদের কথামতো হাতিয়ার সমর্পণ না করেন। সময় হলে সিগনাল দেওয়া হবে। তারা সাথে সাথে পশ্চিমাদের বন্দি করবে ও যুদ্ধের জন্য রাঙামাটিতে এসে জমায়েত হবে।
পাকিস্তানি মার্শাল ল’ তখনও পুরোপুরি বহাল। কী সাংঘাতিক ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ ছিল সামাদ আর শরিফের। তারপর ওই রকম দুর্গম এলাকা-বন-জঙ্গল, পাহাড় আর বন্যপশু চারদিকে। সামাদ আর শরিফের চমৎকার সচলতা এবং যোজনার (mobilization) ফল আমরা ২৫/২৬ মার্চে হাতে হাতে পাই। কঠোর পরিশ্রম আর উদ্যমের সাথে তরুণ সামাদ আর প্রৌঢ় শরিফ সমগ্র পার্বত্যাঞ্চল চষে বেড়িয়েছেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তরুণ সামাদকেই নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। প্রথমে কাপ্তাই, চন্দ্রঘোনা তারপর একে একে মারিশ্যা, জালিয়ানপাড়া, মহালছড়ি, মানিকছড়ি, মাসালং, দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি, বরকল ইত্যাদি জায়গা থেকে সিগন্যাল এলো সামাদের : আমরা সফল, সকলে প্রস্তুত। এখন চূড়ান্ত আহ্বানের অপেক্ষা। ২৫ মার্চ রাতে ক্যাপ্টেন হারুনের সাফল্য ও তারপর একে একে যেভাবে সবগুলো বিওপি থেকে ইপিআর জওয়ানরা রাঙামাটিতে সমবেত হলেন তা পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া কিছুতেই সম্ভব ছিল না।
এসডিও আবদুল আলি নিজে লঞ্চ নিয়ে বরকল ও আশপাশের জওয়ানদের রাঙামাটিতে নিয়ে এলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ডাকলাম। সবাই পরামর্শ হলো। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আমাদের ভাবিয়ে তুলল। ঠিক হলো, আমরা অবাঙালি আর পাঞ্জাবিদের অন্যায় আঘাত প্রতিহত করব। আমার কর্মস্থলের সীমান্ত এলাকা দীর্ঘ হওয়ায় বর্ডার আউট পোস্টের সংখ্যাও ছিল অনেকগুলো। এগুলোতে বাঙালি জেসিও, জমাদার, সুবেদার ছিল প্রচুর সংখ্যায়; কিন্তু কমিশনড কর্মকর্তা ছিল প্রায় সবাই পাঞ্জাবি এবং অবাঙালি।
যা হোক, বাঙালি জুনিয়র অফিসার, সুবেদার, জমাদারদের আমাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেওয়া হলো। এদের সঙ্গে ওয়্যারলেসে-সরঞ্জাম ছিল। এগুলোর নেটওয়ার্ক ভালো কাজ করছিল। ঢাকার সব খবরই আমরা পাচ্ছিলাম। আমাদের এই অঞ্চলের লোকের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা লক্ষ্য করছিলাম। এ সময় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণই যেন আমাদের সকল শক্তি ও সাহসের উৎস হিসেবে কাজ করছিল। বঙ্গবন্ধু দেশকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন যে বাজি রেখেছেন তা আমরা সবাই অনুধাবন করছিলাম।
এর মধ্যে ৭ মার্চের পর বিভিন্ন সময় ঢাকা থেকে আমাদের কাছে বুলেটিন আসতে শুরু করল। জাতীয় পতাকার নমুনা (পতাকায় বাংলাদেশের মানচিত্র সোনালি রঙে), জাতীয় সংগীত (‘আমার সোনার বাংলা’ পুরোটাই), স্বাধীনতা ঘোষণা ইত্যাদি সম্বন্ধে আমরা অবহিত হতে থাকলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের খবর একেবারে রাঙামাটির মতো জায়গাতেও বুলেটিনের আকারে এসে পৌঁছে। কাজেই দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ অনানুষ্ঠানিকভাবে সেদিনই ঘোষিত হয়ে গেছে।
৭ মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার পর রাঙামাটিতে সবকিছু বুঝে গোছাতে আমাদের কয়েকদিন সময় লেগেছিল। ১০-১১ তারিখের দিকে ছাত্রমহল থেকে সঠিক সংবাদ পাওয়া শুরু করলাম। ঢাকার সাথে ছাত্রদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল, সে সুবিধা আমাদের ছিল না। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন আরম্ভ হওয়ার পর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার একেবারে অচল হয়ে যায়। তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশ দেওয়া হচ্ছিল তাই দেশবাসী পালন করছিল। পুলিশ বলতে গেলে একরকম নিষ্ক্রিয়। আইনশৃঙ্খলার কোনো সমস্যাও ছিল না। ১০ থেকে ১৭ মার্চ মোটামুটি এভাবে কাটল। এর মধ্যে এমন কিছু খবর এলো যা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
একটি ঘটনা আমার স্পষ্ট মনে আছে। সন্ধ্যার সময় এসপি বজলুর রহমান কয়েকজন ছাত্রনেতা এবং ইপিআর ওয়্যারলেস স্টেশনের অপারেটরকে আমার কাছে নিয়ে এলেন। সবাই বেশ উত্তেজিত। চট্টগ্রাম ইপিআর সদর দফতর (সেক্টর অথবা উইং) থেকে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে সকল বর্ডার আউট পোস্টে (বিওপি) যে, তাদের কাছে যেসব ভারী অস্ত্রশস্ত্র (হেভি মেশিনগান এবং মর্টার) আছে সেগুলো নিয়ে যেন চট্টগ্রামে জমা করেন। বিওপিগুলো থেকে সাফ জবাব : অস্ত্রসমর্পণ কোনোভাবেই নয়। কথাটা বলা সহজ; কিন্তু করা নয়। তখন মার্শল ল’ চলছে, মিলিটারি রাজত্ব। নির্দেশ অমান্য করা মানে অবধারিত কোর্ট মার্শাল। আর মানতে গেলে প্রাণ যাবে। পাঞ্জাবিদের উদ্দেশ্য পরিষ্কার। অস্ত্র কেড়ে নিয়ে হামলা চালাবে।
আমার কাছে ইপিআরের প্রতিনিধি পরামর্শ চাইলেন। আমি উপায় বের করলাম একটা। চট্টগ্রাম নিতে হলে রাঙামাটিতে সব অস্ত্র আনতেই হবে। এখানে আনার পর সড়কপথে ট্রাকযোগে চট্টগ্রাম পাঠানো হবে। বিওপি থেকে উইংয়ে খবর যাবে এই মর্মে : ‘অস্ত্র পাঠানো হলো’। রাঙামাটি থেকে চট্টগ্রাম মেসেজ পাঠানো হবে : ‘ট্রাক রওনা হয়ে গেছে’। এরপর পথিমধ্যে ছাত্ররা ট্রাক আটকে ফেললে ওরা কী করতে পারে। এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলা করা সহজ নয়। চট্টগ্রাম বসে অসহায় পাঞ্জাবি অফিসার কী করবে। তার জন্য সড়কপথে পরিদর্শন করা বিপজ্জনক ও ঝুঁকিপূর্ণ।
১৬ মার্চ রাতে চট্টগ্রাম থেকে সহকর্মী ডেপুটি কমিশনার মুস্তাফিজুর রহমান টেলিফোনে জানালেন, পরদিন (১৭ মার্চ) সকালে যেন তার বাংলোয় উপস্থিত হই। জরুরি বার্তা আছে, টেলিফোনে বলা যাবে না।
১৭ মার্চ সকালে হাজির হলাম ডিসি, মুস্তাফিজুর রহমানের বাংলোয়। সেখানে বসে আছে সহকর্মী মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ঢাকা থেকে তাকে ব্যক্তিগত বার্তা দিয়ে পাঠিয়েছেন তৎকালীন সিএসপি সমিতি (CSP-Civil Service of Pakistan) পূর্ব পাকিস্তান শাখা। সমিতির নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হলেন চিফ সেক্রেটারি নিজে। আর শফিউল আজম হলেন সেই ব্যক্তি। আমাদের বার্তার সাথে তার কোনো সং¯্রব নেই। সেটার দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের সচিব এবং সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুজিবুল হক সাহেবের। বিষয়বস্তু হলো এই যে, আমাদের সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা অসহযোগ আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করছি এবং আওয়ামী লীগের সকল নির্দেশাবলি মেনে চলব।
পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক থাকার কারণে আমাকে প্রায়শই সেনা ছাউনিতে যেতে হতো। ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সাজেক মালভূমি এবং মাসালং এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছে মিজো-বিদ্রোহীদের পিছু ধাওয়া করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক ভিতরে এসে তারা মিজো-ক্যাম্প ধ্বংস করেছে। এসবই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা পরিচালনা করত। রসদ যেত রাঙামাটি হয়ে। (এখানে বলে রাখি : একসময় সাবেক মেজর নূরুল ইসলাম শিশু, পরে জেনারেল ও মন্ত্রী, এই মিজো-মিশনে ১৯৬৯-৭০ সালে নিয়োজিত ছিলেন)। চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট, এমনকি ঢাকা সেনা হেডকোয়ার্টারেও (Eastern Command) আমার ডাক পড়ত পরিস্থিতি জানানোর জন্য। সকল সময়ই আমার বক্তব্য ছিল, ‘মিজোদের আশ্রয় ও সাহায্য করার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছারখার হয়ে যাচ্ছে। বনজঙ্গল শেষ, পশুহত্যা নির্বিবাদে চলছে। তার চেয়েও বড় কথা, বৃহত্তর জনগোষ্ঠী চাকমা উপজাতি বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে, মিজোদের ধ্বংস এবং ভারতীয় অনুপ্রবেশের কারণে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চাকমা এবং টিপরাসহ অন্যান্য উপজাতি।’
১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমন্ডো ইউনিট, যার অধিনায়ক লে. কর্নেল শামস (শামসুল হক)। দুর্ধর্ষ, নিষ্ঠুর ও নির্দয় প্রকৃতির ছিল বলে তার ব্যাপক কুখ্যাতি। বেলুচ রেজিমেন্টও ছিল চট্টগ্রামে, যার কমান্ডিং অফিসার ছিল লে. কর্নেল ফাতমি। এ লোকটি ছিল ডেপুটি সাব-মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। যথাক্রমে মিজো অপরেশন এবং মর্শাল ল’ ডিউটির কারণে এ দুই কর্নেল এবং তাদের সহকারীদের রাঙামাটিতে ঘন ঘন যাতায়াত ছিল। আমাকেও মাঝে মাঝে যেতে হতো ক্যান্টনমেন্টের নিষিদ্ধ এলাকায়। চোখ-কান খোলা থাকলে যেÑ কেউ বুঝতে পারত ওদের রণপ্রস্তুতি।
এর কয়েকদিন পর (১৭ মার্চে) আরও নাটকীয় ঘটনা শুরু হলো। দ্রুত পটপরিবর্তন। এত দ্রুত যে তার সাথে তাল মেলানো কঠিন ছিল। ঢাকাতে আলোচনা বৈঠক; কিন্তু সারা পূর্ববাংলায়, বিশেষ করে চট্টগ্রামে সৈন্যসমাবেশ ও শক্তিবৃদ্ধি, ঢাকায় পাকিস্তান এয়ারফোর্স ওপিআই’র বিমান অবতরণ বহুগুণ বৃদ্ধি, সন্দেহজনক লোকজনের বিপুল সংখ্যায় অবতরণ, সেনানিবাসে অতিরিক্ত সতর্কতা ও বেসামরিক লোকজনের ওপর নিষেধাজ্ঞাÑ এসবই স্পষ্টত অন্য কোনো কিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রামে সদা-সচেতন ছাত্রসমাজ আমাদের নানাবিধ তথ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছিল। চট্টগ্রামে ‘সোয়াত’ জাহাজের আগমন, ডক-কর্মীদের ধর্মঘট, সোয়াত খালাসে অস্বীকৃতি, যুদ্ধজাহাজ ‘বাবরের’ বহির্নোঙরে অবস্থান, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ঘন ঘন হেলিকপ্টার ওঠানামা, বাঙালি সৈন্যদের পোর্টে পাঠানোর চেষ্টা, নিরস্ত্র জনগণের ওপর বন্দর-এলাকায়-বালুচ সৈন্যদের নির্বিচার গুলিবর্ষণ, বহু হতাহত ইত্যাদি খবর ত্বরিত গতিতে আমাদের কাছে আসছিল।
আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল অর্থাৎ, আমরা ‘পয়েন্ট অব নো-রিটার্নে’ চলে গেলাম প্রায়। এ অবস্থায় যুদ্ধ প্রস্তুতি ছাড়া আমাদের কিছুই করার ছিল না। এই প্রস্তুতি যত-না সামরিক, তার চেয়ে ঢের বেশি মানসিক। সেই সাথে সাংগঠনিক। স্থানীয় কর্মকর্তাদের একত্র করা, নানাবিধ দায়িত্ব বণ্টন করার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি বিশেষ সংগঠনের যার সিদ্ধান্ত হবে দ্রুত, থাকবে সবরকম ক্ষমতা এবং সকলের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হবে। সেটি সম্ভব ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সমর্থনে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মোতাবেক সর্বদলীয় একটি সংগঠন গড়ে তোলার জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও চট্টগ্রামের বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ যেমনÑ প্রয়াত এমএ হান্নান, জহুর আহমেদ চৌধুরী, প্রফেসর খালেদ, আবদুল মান্নান এবং ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন (বর্তমানে মন্ত্রী)-দের সাথে যোগাযোগ করি। তাদের পরামর্শ মোতাবেক কাপ্তাই চন্দ্রঘোনার শিল্প এলাকায় বিরাট সংখ্যক শ্রমিকদের সংগঠিত করতে শুরু করি। শ্রমিকদের সবাই বাঙালি এবং অত্যন্ত রাজনীতি-সচেতন; শক্ত ট্রেড ইউনিয়ন কাপ্তাই পানি-বিদ্যুৎ প্রকল্পে, চন্দ্রঘোনা কাগজ-কলে ও বনশিল্প প্রতিষ্ঠানে; চট্টগ্রাম এবং নোয়াখালীর স্বাধীনচেতা মানুষ সবাই; অতএব এটা হলো আমাদের শক্ত ঘাঁটি। এখানে সৈয়দ আবদুস সামাদ বিরাট সহায়তা পেলেন।
আমাদের আরেক শক্ত ঘাঁটি রামগড়। নোয়াখালীর অধিকাংশ অধিবাসী এবং সচেতন কর্র্মী। মাঝখানে খাগড়াছড়ি। সবে মহকুমা সদর দফতর সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে, আমিই দায়িত্ব নিয়ে এই কাজ করেছিলাম। সরকারি নতুন শহর, কেবল গড়ে উঠছে। চতুর্দিকে পার্বত্য উপজাতির বসবাস। সেখানে সংগঠন করার কিছুই ছিল না। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।
আমরা সকলে যারা সদর রাঙামাটিতে কর্মরত, তাদেরই এগিয়ে যেতে হবে, নিতে হবে অগ্রগণ্য ভূমিকাÑ এ উপলব্ধি থেকে আমরা একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত নিলাম। সরকারি কর্মকর্তা, করপোরেশন কর্মকর্তা, শিক্ষক, ছাত্রনেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতৃবৃন্দÑ এদের সবার সমন্বয়ে ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হলো। সংগ্রাম পরিষদে ব্যবসায়ীদের মধ্যে দুজনের কথা আমার বিশেষ মনে পড়ে, একজন ইউসুফ আলি, আরেকজন মোহসিন। দুই ভাই; এদের অনেক লঞ্চ ছিল। এগুলো চলাচল করত কাপ্তাই লেকের বিভিন্ন রুটে (যেমনÑ মহালছড়ি, বিলাইছড়ি, মাইনিমুখম মারিশ্যা, বরকল, কাপ্তাই ইত্যাদি); পরবর্তীতে এই লঞ্চগুলোই ইপিআর জওয়ান ও জেসিও-দের বহন করে নিয়ে আসে রাঙামাটিতে। পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৬ মার্চ দিনের মধ্যেই প্রায় সবাই চলে আসেন। নবগঠিত সংগ্রাম পরিষদের উল্লেখযোগ্য দায়িত্ব ছিল নি¤œরূপÑ
ষ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল (ইপিআর) বাহিনীর জওয়ান
ভাইদের স্বাগত সংবর্ধনা জানিয়ে রণক্ষেত্রের দিকে পাঠিয়ে
দেওয়া ও তাদের খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থা করা।
ষ যানবাহন ঠিক রাখা ও উপযুক্ত সময়ে যথাস্থানে তা সরবরাহ
করা।
ষ সামরিক রসদপত্র সরবরাহ করা।
ষ সরবরাহ লাইন (Supply line) অক্ষুণœ রাখা।
ষ জনসাধারণের মনে উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করা।
ষ রাঙামাটি স্টেশন ক্লাবে যুবকদের সংক্ষিপ্ত রাইফেল চালনা শিক্ষা।
ষ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ পরিচালনা করা।
বিশিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের নি¤œলিখিতভাবে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়Ñ
ষ রাঙামাটিতে নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র : এসপি বজলুর রহমান;
ষ উপ-নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র : আবদুল আলী, এসডিও, সদর। চট্টগ্রাম এবং অগ্রবর্তী ঘাঁটির সাথে যোগাযোগ;
ষ ড. আলতাফ আলী : খাদ্য সংগ্রহ, বণ্টন, সম্মুখে প্রেরণ, ছাত্রদের ট্রেনিং;
ষ আবদুল আলী/রুহুল আমিন/এমই শরিফ : গোলাগুলি ফ্রন্টে পাঠানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত;
ষ গণসংযোগ : মারিশ্যায় ম্যাজিস্ট্রেট : খান আমির আলী;
ষ যোগাযোগ ও পরিবহন : জেলা পরিষদের প্রকৌশলী তাজুল ইসলাম এবং সড়ক ও যোগাযোগ বিভাগের বাবু জ্যোতি বিকাশ চাকমা।
মানসিকভাবে সবাই তৈরি। কিছু-একটা ঘটতে যাচ্ছে। ২৫ মার্চ রাত্রে প্রথম খবর এলো। আমরা তো তখন সবসময় ওয়ারলেস শুনছি। আমাদের দুটো নেটওয়ার্ক ছিল। আমি পুলিশ লাইনে আরইপিআরের কাছে বসতাম, খবর নিতাম। আমার সাথে এসপি বজলুর রহমান থাকতেন, ২৫ মার্চ রাত ১০টার পরে উনি আমাকে টেলিফোন করলেন খুব উত্তেজিতভাবে। কী হয়েছে? ছুটে গেলাম ওয়ারলেস সেটের কাছে। একেবারে পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছি, ওরা রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে, আগুন দিচ্ছে, রাইফেলের এবং গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। পাকিস্তান বাহিনীর সদস্যরা অকথ্য ভাষায় গালি দিচ্ছিল।
ওই রাত্রে কিছুক্ষণ পরেই কাপ্তাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। পাওয়ার স্টেশনের ম্যানেজার শামসুদ্দিন এবং আমার ভাই ফারুক আজিজ খান বললেন, এখানে প্রচ- গোলাগুলি শুরু হয়ে গেছে। ইপিআরের পাঞ্জাবি সামরিক অফিসার বাধা দিচ্ছে, হারুন (ক্যাপ্টেন হারুন, ইপিআর) এগিয়ে গেছে, ওদের আক্রমণ করে বন্দি করবে, ওদের কাছ থেকে চাবি নেবে অস্ত্রাগারের। আমি তখনই তাড়াতাড়ি সব জায়গায় খবর পাঠালাম; ‘তোমরা এখুনি অস্ত্রশস্ত্র দখলে নিয়ে তোমাদের পাঞ্জাবি অফিসারদের বন্দি করে রাঙামাটিতে চলে এসো।’ মধ্যরাতের দিকে কাপ্তাই থেকে ক্যাপ্টেন হারুন টেলিফোন করে বলেন, ‘আমরা ওদের আটকে ফেলেছি এবং অস্ত্রাগার আমাদের হাতে এসে গেছে। অস্ত্রশস্ত্র এখন আমাদের হাতে। আমরা এখনি চট্টগ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, কালুরঘাটে গিয়ে আমি ক্যাপ্টেন রফিকের সঙ্গে যোগ দেব।’
২৬ মার্চ সকালের মধ্যে আমাদের বার্তা পেয়ে রাঙামাটি থেকে পাঠানো লঞ্চে করে দলে দলে ইপিআর ও পুলিশের বাঙালি জওয়ানরা তাদের জেসিও-দের নেতৃত্বে সুদূর বরকল, দীঘিনালা, মারিশ্যা, মহালছড়িÑ এসব জায়গা থেকে জমায়েত হলেন কোর্ট প্রাঙ্গণে। সেখানে তাদের অভ্যর্থনা, খাওয়া আর ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা। বাংলাদেশ এগিয়ে চলল চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পথে।

[সংকলিত : বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ : মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং আমার ডায়েরি]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *