মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা

সামুতে কয়েক বছর আগে রাজাকার বরাহছানাদের খুব উৎপাত ছিল। সেসময় তারা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং এর সাথে জড়িত মানুষদের নিয়ে কুৎসা রটনা করে নানা পোষ্ট দিত। এর মধ্যে একটা প্রসঙ্গ ছিল মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা। আজকেও এক শিবির নিক আবার সেই ফাজলোমো তে নেমেছে। তাই এ প্রসঙ্গে ব্লগার এস্কিমোর একটু পোষ্ট নিচে তুলে দিলাম-

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা

প্রাসঙ্গিক আরো দুটি পোষ্ট:

১. ত্রিশ লক্ষ শহীদ : মিথ নাকি বাস্তবতা ? – লাইটহাউস

২. Is 3 million martyrs a myth? : The Mathematics of a Genocide – Abul Kasem
==========================================
==========================================

(নোট – সবগুলো পর্ব আলাদা আলাদা না দিয়ে একসাথে দেবার যুক্তিটা পেয়েছি পিয়ালের কাছ থেকে। দয়া করে সময় নিয়ে পড়ার জন্যে পাঠকের কাছে অনুরোধ রইল)

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা – পর্বঃ১

১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের নিরস্ত্র জনতার উপর ঝাপিয়ে পড়ে একটা সুসজ্জিত ও পেশাধারী পাকিস্থানী সেনাবাহিনী। ২৫শে মার্চের গভীর রাত থেকে শুরু হয়ে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে বর্তমানের বাংলাদেশ নামক ভুখন্ডের সাধারন মানুষের উপর হত্যা-ধর্ষনসহ একটা পরিকল্পিত গনহত্যা এবং বুদ্ধিজীবি নিধনযজ্ঞ অভিযান। এটা পরিচালিত হয় পাকিস্থানী সেনাবাহিনী এবং বাঙালীর মধ্যে একদল দালাল – রাজাকার, আলবদর, আল শামস এবং শান্তি কমিটি নামক সহযোগী বাহিনী তৈরীর মাধ্যমে। সেই গনহত্যা আর নির্যাতনে চিহ্ন পাওয়া যাবে না এমন কোন স্থান বাংলাদেশে অবশিষ্ট নেই। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এবং পরবর্তীতে দেশ – বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা এবং মিডিয়া তাদের নিজস্ব হিসাবে মতে এই গনহত্যার নিহতদের সংখ্যার সর্বোচ্চ তিন মিলিয়ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই বিবেচনায় ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে ৩ মিলিয়ন বা ত্রিশ লক্ষ শহীদের কথাটা প্রচলিত হয়ে আসছে। কিন্তু দীর্ঘ এই নয় মাসের গনহত্যায় কত মানুষ জীবন দিয়েছিলেন এবং পাকিস্থানী সেনাবাহিনী আর রাজাকারদের হাতে সম্ভ্রম হারিয়ে ছিলেন কত নারী সেটা গননা করা হয়নি এবং যথাযথ ভাবে পরিসংখ্যানের আলোকে লিপিবদ্ধ করা হয়নি বলে অনেক মহল থেকে এই বিষয়ে বিতর্ক তোলা হয়।

যারা এই বিষয়ে বিতর্ক সুষ্টির প্রয়াস নেয় তাদেরকে দুই শ্রেনীতে বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রথম শ্রেনীতে আছে – ৭১এর পরাজিত রাজাকার-আলবদর এবং দ্বিতীয় শ্রেনীতে আছে দালালরা – যারা বাংলাদেশ নামক স্বাধীন দেশে জন্মের বিরোধীতা করেছিলো এবং আজও তার বিরুদ্ধে কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৫ সালের মুক্তিযুদ্ধের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর পরিকল্পিত ভাবে প্রপাগান্ডার মাধ্যমে। এরই অংশ হিসাবে বাংলাদেশের একমাত্র ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিটিভিকে চতুরতার সাথে ব্যবহার করা হয়। ১৯৭৫ সালের পর বিটিভি এবং বাংলাদেশ রেডিওতে “পাকিস্থানী সেনাবাহিনী” এর পরিবর্তে “হানাদার বাহিনী” শব্দগুচ্ছ ব্যবহারসহ রাজাকার এবং দালালদের দৃশ্যের আড়ালে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী নেতৃবৃন্দ যেমন শেখ মুজিব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপটেন মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহম্মদকে দৃশ্যপট থেকে আড়ালে সড়িয়ে রাখা হয়। সাথে সাথে মুক্তিযুদ্ধের শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তা যেমন জেনারেল ওসমানী, আব্দুর রব, কে এম শফিউল্লাহ, এ কে খন্দকার, খালেদ মোশাররফের মতো নেতাদের পর্দার অন্তরালে পাঠিয়ে একজন সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানকে শীর্ষস্থানে উপস্থানের প্রয়াসে ইতিহাসের একটা শর্টকার্ট তৈরী করা হয়। এগুলো ছিল মুক্তিযুদ্ধের পরাজিতদের “প্রপাগান্ডা ওয়ারের” অংশ বিশেষ। বিশেষ বিশেষ দিবসে দেখানো হতো এক অদ্ভুদ ধরনের নাটক। সেখানে দেখানো হতো হয়তো ১৯৭১ সালের একটা দৃশ্য যেখানে কিছু মুক্তিযোদ্ধা চরিত্রে অভিনয়কারী মানুষ বর্তমানে প্রচলিত “সবুজ জমিনে লাল সূর্য” পতাকাটি নিয়ে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” শ্লোগান দিচ্ছে। যেখানে প্রকৃত ঘটনা ছিল ১৯৭১ সালের পতাকা ছিল সবুজ জমিনের ভিতরে লাল সূর্য্য এবং তার ভিতরে হলুদ রংগের বাংলাদেশের মানচিত্রচ্ এবং শ্লোগান ছিল “জয় বাংলা”। এখন হয়তো আমাদের অনেকের “জয় বাংলা” শ্লোগান দিতে দ্বিধা হয় – এটাকে একটা দলীয় শ্লোগান হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। যদি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কোন ঘটনা দেখানো হয় এবং সেখানে জয় বাংলা শ্লোগানটা না থাকে তবে সেটা হবে সত্যের অপলাপ এবং সুস্পস্ট ইতিহাস বিকৃতি। অন্যদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতে গর্ববোধ করি – তারা “জয় বাংলা” শ্লোগানটার বিষয়ে একটু ভেবে দেখতে পারেন। ৭১ এর হাজার হাজার মুক্তিসেনা “জয় বাংলা” উচ্চারন করেই উদ্দীপ্ত হয়েছে এবং জীবন দিয়ে দেশকে স্বাধীন করেছে। সুতরাং সেই আত্নদানকারী বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যেই আমাদের এই শ্লোগানটাকে উচ্চারন করা উচিৎ।

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা – পর্বঃ ২

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা এবং মানুষকে – বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে এই দালালরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই প্রশ্নের উত্তর দেবার মতো যথাযথ উপাত্ত না থাকায় সহজেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তাকে মিথ্যাবাদী হিসাবে চিহ্নিত করা যায়।

দ্বিতীয় যে দলটি মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং নির্যাতিত নারীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তারা হলো প্রথম দলের প্রপাগান্ডার ফলে সৃষ্ট একটা বিভ্রান্ত প্রজস্ম – যাদের জন্ম যুদ্ধের পর। ফলে তারা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা এবং নির্মমতা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পায়নি। এদের জন্ম একটা স্বাধীন দেশে – সুতরাং তাদের জন্যে যুদ্ধটা হলো একটা ইতিহাস। আর ১৯৭৫ এরপর এই প্রজন্মকে প্রকৃত ইতিহাস থেকে দূরে রাখার কারনেই এদের পক্ষে পাকিস্থানী সেনাবাহিনী এবং দোসর রাজাকার, আলবদর- আলশামস এবং শান্তিকমিটির নির্মম হত্যাকান্ড, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এবং নারী ধর্ষনের ব্যপকতা উপলদ্ধি করা সম্ভব নয়। আর পরাজিত শক্তির সহজ টার্গেট হিসাবে এরা যা জেনেছে তা হলো – মুক্তিযোদ্ধা মানেই হলো একজন ব্যর্থ মানুষ – যাকে মানুষ সন্মান করবে কিংন্তু প্রকৃত সামাজিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে না। আবারো টিভি প্রসংগে আসা যাক। ৭৫ থেকে ৯০ পর্যন্ত বিটিভিতে যত নাটক স্বাধীনতা দিবস এবং বিজয় দিবসে প্রচারিত হয়েছে তার অধিকাংশতেই দেখা যাবে একজন পংগু এবং রাগী মানুষ মুক্তিযোদ্ধার ভুমিকায় অভিনয় করছে। এতে এমন অবস্থা হয়েছে যে, পংগু এবং মুক্তিযোদ্ধা সমার্থক শব্দ হয়ে “পংগু মুক্তিযুদ্ধা” হিসাবে পরিচিত হয়েছে। অন্যদিকে দেখানো হচ্ছে রাজাকাররা বেশ ভাল অবস্থানে গিয়ে পৌছেছে। আর নাটকের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃতিতো ছিল একটা স্বাভাবিক ঘটনা। ফলে এই নতুন প্রজন্মের কাছে আদমশুমারী এরং যুদ্ধের নিহত আর নির্যাতিতাদের গননা প্রায় একই রকমের সহজ কাজ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। দেখছি কেহ কেহ স্বাধীনতার পরবর্তী সরকারকে এই বলে দায়ী করছে যে, তারা যুদ্ধে শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারন করতে ব্যর্থ হয়েছে – এটা তাদের করা উচিত ছিল। অনেকে এটা শেখ মুজিবুর রহমানের আবেগী সংখ্যা হিসাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছ। অনেকে প্রকৃত শহীদ এবং মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা নির্ধারন করার জন্যে দাবী জানাচ্ছে।

একটা যুদ্ধ – যা শুধু কথামালা নয় – যা শুধু গল্প নয় – যা শুধু ইতিহাস সংগ্রহ নয়। প্রকৃত যুদ্ধ হলো মানুষের জীবন মরনের খেলা – যুদ্ধ হলো ত্রাস – যুদ্ধ হলো পরের দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকাংখা – যুদ্ধ হলো একটা স্বাধীন সময়ে মুক্ত শ্বাস প্রশ্বাসের জন্যে আকুলতা – সেই যুদ্ধের সময়ে নিহত বা আহত বা নির্যাতিতার সংখ্যা গননা করা আর আদমশুমারী করা এই পর্যায়ে কর্মকান্ড কিনা যৌক্তিকতা আর বাস্তবতার আলোকে একটি ভেবে দেখা যাক –

১) বাংলাদেশে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্থানী সেনাবাহিনী, তার দোসর রাজাকার আলবদর এবং আলশামস কতৃক নিহত এবং নির্যাতিত নারীর প্রকৃত সংখ্যাটা কি?

২) একটা যুদ্ধে নিহত এবং আহত মানুষের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারন সম্ভব কি না?

৩) একটা যুদ্ধে নির্যাতিতা নারীদের নির্ভূল সংখ্যা নির্নয় সম্ভব কি না?

প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে যদি পৃথিবীর কুখ্যাত কিছু যুদ্ধের দিকে তাকাই তাহলে আমাদের উত্তর পাওয়াটা সহজ হবে বলে মনে করছি। প্রথমত সাম্প্রতিক কালের চলমান ইরাক যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। ইরাকে কতজন সাধারন মানুষ মারা গেছে গত চার বছরের? বিশ্বের বিভিন্ন নামীদামী গবেষনা সংস্থার মতে এই সংখ্যা ৬ – ৭ লাখ। অন্যদিকে মিডিয়া রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে ইরাক বডি কাউন্ট নামক একটা প্রতিষ্ঠান তাদের ওয়েব পেজে সংখ্যাটা দিয়েছে ৯৫ – ১০৫ হাজার। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিও বুশের মতে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ত্রিশ হাজার হবে। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে – বর্তমানে ইলেকট্রনিক যোগাযোগের যুগেও কম্পিউটার প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করেও একটা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না। এর পিছনে কারন কি? উত্তরটা সহজ – যুদ্ধের সময় যারা মানুষ মারে তারা তো আর গুনে গুনে মানুষ মারে না। এ ছাড়া যুদ্ধের একটা বড় দিক হলো এর ভয়াবহতা। সেখানে মানুষ জীবন আর মৃত্যুর মাঝামাঝি একটা সুক্ষ সীমানার কাছাকাছি থাকে – সেখানে মৃত মানুষের চেয়ে জীবিত মানুষ আনেক বেশী গুরুত্বপূর্ন। তাই মানুষ নিহতদের দ্রুত তাদের দৃষ্টিসীমা থেকে সরিয়ে নিজের বাঁচার প্রক্রিয়াকে বেশী গুরুত্ব দেয়। আর যুদ্ধবিদ্ধস্থ দেশে মৃত মানুষের সংখ্যা নির্ধারনের চেয়ে জীবিত মানুষদের জীবনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়াটাই বেশী যৌক্তিক নয় কি?

এটাতো গেল সিভিলিয়ান বা বেসামরিক মানুষ সম্পর্কে – যুদ্ধের সময় তাদের মৃত্যুকে সাধারন ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হয় এবং এটাকে কোলেটারাল ডেমেজ হিসাবে বিবেচনা করে মিডিয়াও মৃতের সংখ্যার থেকে ঘটনার ভয়াবহতা বা বিজয়ের হিসাবেই বেশী প্রচার করে। তাই দেখি ২০০৬ সালে ইসরায়েলী আক্রমনে একটা লেবানিজ গ্রাম যখন মাটিতে মিশে যায় – তখন পশ্চিমা মিডিয়া নিহতদের সংখ্যা ১০ থেকে ৭৫ পর্যন্ত দেখিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধে নিহত সামরিক ব্যক্তিদের হিসাবতো সহজ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয় ভিয়েতনাম যুদ্ধে কতজন মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে? একটা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যাবে না। সেখানে আমেরিকান বাহিনী তাদের ইনভেন্টরী ব্যলেন্স করার জন্যে একটা বিশেষ কলাম ব্যবহার করে। সেটাকে বলা হয় – এমআইএ (মিসিং ইন একশন) বা হারিয়ে যাওয়া সৈন্য। একটা যুদ্ধের তিনযুগ পরও কি একজন সৈন্য হারিয়ে থাকতে পারে। এখনতো আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ভিয়েতনাম যাচ্ছেন বা ভিয়েতনাম অন্য অর্থে আমেরিকার বন্ধুরাষ্ট্র। এখন তো এরা হিসাব করে বের করতে পারে এই এমআইএ ৫০ হাজার সৈন্য কোথায়। কিন্তু বাস্তব অবস্থা কঠিন। একটা শরীর পঁচতে লাগে মাত্র এক সপ্তাহ আর পচাঁ-গলা মানবদেহ থেকে কোনটা আমেরিকান আর কোনটা ভিয়েতনামী হিসাবে চিহ্নিত করা কঠিন। এখানে খরচের প্রশ্নটাও জড়িত বটে। একেতো খুঁজে বের করতে খরচ – তার উপরে আবার নিহত সৈন্যদের ক্ষতিপুরনের ব্যয় একটা বিশাল ব্যাপরই বটে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে – সামরিক পোশাকী মানুষেরও যুদ্ধে মারা যাওয়া পর সংখ্যা নির্ধারন করা কঠিন কাজ হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা পর্বঃ ৩

যুদ্ধে নিহতদের নিয়ে সবচেয়ে অবাক হবার মতো সংখ্যা পাওয়া যাবে আশির দশকে ঘটে যাওয়া ৯ বছর ব্যাপী ইরান- ইরাক যুদ্ধে। সেখানে ইরান এবং ইরাকের প্রদত্ত্ব সংখ্যা যোগ দিলে দেখা যাবে যে, ইরাকের হিসাব মতে ইরানে মোট জনগোষ্ঠিকে কয়েকবার হত্যা করেছে ইরাক। ঠিক একই ভাবে ইরানও তাদের হিসাবে মতে কয়েকবার ইরাকের মোট জনগোষ্ঠীকে হত্যা করতে সমর্থ হয়েছিল।

এবার দেখা যাক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহতদের সংখ্যা গননায় কি হয়েছিল। একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে – ঐ যুদ্ধে বিবদমান সকল দেশের হতাহতের নিজস্ব হিসাব আছে। এখানে বিজয়ী দল যা বলেছে পরাজিতরা সেটাই মেনে নিয়েছে। যেমন বলা হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬০ লক্ষ ইহুদী নিহত হয়েছে। এটা এখন পশ্চিমা বিশ্বের জন্য আইন হিসাবে চালু হয়েছে। এটাকে এন্টি সেমেটিক আইনের আওতায় বিবেচনায় যদি কেহ ৬০ লক্ষ ইহুদী নিধন নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলে বা গবেষনা করার চেষ্টা করে তবে তাকে জেলে যেতে হবে। এই অপরাধে জেনডাল নামে এত জার্মান দেশ থেকে পালিয়ে ক্যানাডা এবং পরে আমেরিকা গিয়ে বাঁচতে পারেনি – ফেরত নিয়ে গিয়ে তার বিচার চলছে জার্মানের এক আদালতে। গত বছর অস্ট্রিয় এক আদালতে ডেভিড আরভিং নামে এক ইতিহাসবিদকে “হলোকাস্ট” অস্বীকার করার অপরাধে জেলে পাঠায়। এই তালিকা অনেক লম্বা করা সম্ভব। মুল কথা হলো ২য় বিশ্বযুদ্ধে নিহত ইহুদীদের সংখ্যা ৬০ লক্ষ এবং সেটা নিয়ে কেহ প্রশ্ন করতে পারবেন না। কেহ জানতে চাইতে পারবেন না কিভাবে এই সংখ্যাটা পাওয়া গেল।

এবার আসা যাক ২য় প্রশ্নে – একটা যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো নারী নির্যাতন। কিন্তু তার প্রকৃত সংখ্যা কি নির্ধারন সম্ভব। উত্তর নেতিবাচকই হবে। আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক কালে ভয়াবহ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বসনিয়ায়। যদি পৃথিবীর সকল বিশেষজ্ঞকে এক করে প্রশ্ন করা হয় বসনিয়ায় নির্যাতিত নারীর প্রকৃত সংখ্যা কত – নিশ্চিত ভাবে এরা কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা দিতে ব্যর্থ হবেন। এখানে বিষয়টা অত্যান্ত বাস্তব যে, একজন নির্যাতিত নারী রেডক্রসের রিলিফের জন্য “নির্যাতিত নারী” হিসাবে নাম লিখাতে যাবে না বা এরা বলে বেড়াবে না যে এরা নির্যাতিত হয়েছিলেন। এটা বাংলাদেশের মতো রক্ষনশীল দেশের জন্যে আরো বেশি সত্য। তবে এটাও সত্য যে – যদি কোন দিন সুযোগ আসে (আসবে ইনশাআল্লাহ) তখন নিশ্চয় অনেক সাহসী নারী এগিয়ে আসবেন তাদের অপমানের কথা বলতে।

সুতরাং একটা যুদ্ধে নিহত এবং নির্যাতিতাদের সংখ্যা নির্নয়ের ক্ষেত্রে আদমশুমারীর মতো শান্তিকালীন প্রক্রিয়ার প্রয়োগের চিন্তা করা একটা কল্পনা মাত্র। তার পরও একটা প্রাক্কলিত সংখ্যাকে বাস্তবতার নিরিখে গ্রহন করার প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়েছে। নীচে একটা তালিকাটায় দেখা যায় মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন মিডিয়াতে যে হিসাব দিয়েছিল – তার থেকেই বাংলাদেশের তৎকালীন নেতারা সর্বোচ্চ সংখ্যাটা গ্রহন করেছেন।

(সূত্র – ভার্চুয়াল বাংলাদেশ ডট কম)

আরো তথ্যের জন্যে দেখুন – জেন্সারসাইট ওয়াচ ডট অর্গ

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা – শেষ পর্ব

এখন প্রশ্ন আসে ত্রিশ লক্ষ কি আসলে শহীদ হয়েছিলেন?

এই প্রশ্ন অনেকেই উত্থাপন করে বেশ আনন্দ পান আবার কেহ স্বার্থ সিদ্ধির জন্যও এই প্রশ্নটি করেন। প্রশ্নের উত্তর হলো একটাই – হ্যাঁ, অবশ্য সংখ্যাটা বেশীও হতে পারে। যারা নদীর ধারে বাস করতেন – যারা পিতার লাশ সনাক্ত করার জন্যে নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়া অগনিত লাশের মিছিল দেখেছে – তাদের কাছে ৩০ লক্ষ সংখ্যাটা অনেক কম মনে হতে পারে।

আরো একটা প্রশ্ন আসে – কেন আমাদের জানতে হবে একটা নিদিষ্ট সংখ্যা। কেন কিছু মানুষ প্রকৃত সংখ্যা জানার জন্য অধীর। যদি আমরা বিস্তর শুমারী বা পরিসংখ্যানের পর জানতে পারি যে – প্রকৃত শহীদের সংখ্যা ৩০ লক্ষের থেকে ১ লক্ষ কম বা এক লক্ষ বেশী তাতে কি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ভিন্ন ভাবে লিখা হবে? শহীদের সংখ্যা কমলে কি দালাল-রাজাকারদের অপকর্মের দায় কমে যাবে, নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের গুরুত্ব কমে যাবে? আসলে শুরুতে যা বলেছিলাম – যে দুই দল এই বিতর্কটা সৃষ্টির চেষ্টা করে তাদের মধ্যে অগ্রগামী হলো – ১৯৭১ সালের পরাজিত দালাল শ্রেনী এবং তাদের অনুসারীরা । তারা একটা পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই এটা করে। এরা ইদানিং এতোটা সাহসী হয়ে প্রকাশ্য বলার সাহস পায় এই বলে যে, আমাদের পুরোনো কথা ভুলে যেতে হবে। কেন ভুলে যেতে হবে – একদল লুটেরা দালালকে খুশী করার জন্য? প্রকৃত অবস্থা হলো এরা বিভিন্ন ভাবে বিতর্ক তুলে মানুষকে প্রকৃত ঘটনার থেকে আড়ালে নিযে যেতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ যত বেশী স্বাধীনতার ঘোষক, শহীদের সংখ্যা, দালালদের ক্ষমা করে দেওয়ার বিষয়ে বিতর্ক করে বিভক্তিতে পড়বে – দালাল-রাজাকারদের তত সুবিধা হবে – ততই তারা নিরাপদ অবস্থানে থেকে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করার সুযোগ পাবে।

যেখানে স্বাধীনতার ৩৫ বছর পর কিছু মহল বিভিন্ন বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে আত্নত্যাগকারীদের অবদানতে হেয় করার প্রয়াস সেখানে পাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির জন্যে কিছু অবশ্য করনীয় আছে। যেমন –

১) যারা বিতর্ক সৃষ্টি করে তাদের চিহ্নিত করা। যদি তারা রাজাকারদের মতাদর্শের হয় – ওদের চিহ্নিত সুষ্পষ্ঠ ভাবে করা এবং নিজ নিজ অবস্থান থেকে ওদের সাথে যুদ্ধ শুরু করা। ওদের সাথে কুটতর্কে না জড়িয়ে ওদের পরিচয় মানুষের কাছে পরিষ্কার ভাবে উপস্থাপন করা এবং এদের সামাজিক ভাবে কোনঠাসা করা। আর যদি বিতর্ক সৃষ্টিকারী কোন নতুন প্রজন্মের কোন একজন হয় – তবে ওদের কথা মনযোগ সহকারে শুনতে হবে। চিহ্নিত করতে হবে ওদের বিভ্রান্তির কারন। যুক্তি এবং প্রমানসহ আন্তরিকভাবে ওদের সাথে বিতর্ক এবং আলোচনা করে তাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা বুঝতে সাহায্য করা।

২) মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে এবং এর বিকৃতির বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার হতে হবে।

৩) আমাদের মনে রাখতে হবে আত্নত্যাগকারী মুক্তিযোদ্ধারা তাদের জীবন দিয়ে যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে আমাদের জন্যে স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। সেই মহামূল্যবান সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। তাই মুক্তিযুদ্ধ আর বাংলাদেশ নিয়ে যতরকমের বিভ্রান্তিকর প্রচারনা তার বিরুদ্ধে আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়ানো কর্তব্য।

আসুন, স্বাধীনতা দিবসে আমাদের শপথ হোক, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের মর্যাদা রক্ষায় সকল বিভ্রান্তিকর প্রচারনার বিরুদ্ধে আমাদের সকল মেধা আর শক্তি দিয়ে সংগ্রামই হবে আমাদের প্রধান কাজ।

(শেষ/ধন্যবাদ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *