মুক্তিযুদ্ধে বাবা হারানো এক মেয়ের কথা……………….

যার কথা লিখছি…..।
একসময় খুব কাছের বন্ধু ছিলেন উনি। এখনো মনের কাছেই থাকেন তবে যোগাযোগ হীনতায় সম্পর্কটা ঠিক বাড়ন্ত নয়। ঝিমিয়ে থাকা লতার মত। তবু বন্ধু তো বন্ধুই।
উনাকে খুব পছন্দ করি উনার স্বভাবের কিছু কারনে।
মানুষের স্বভাবের অদ্ভুত সব দিক থাকে ।ভালো এবং মন্দের।
উনার ভালোত্বের একটা দিক হলো উনি স্বল্পভাষী।
আমাদের প্রবল আড্ডার সময়ে আমরা যখন গল্প করতাম…কখনো বই,কখনো গান,কখনো মানুষ….।
আমাদের গল্প কথার বিষয়গুলো যখন এখান থেকে ওখানে দৌড়াতো।
ছেলেবেলা ঠেকে শুরু করে কৈশোর তারুণ্যের গল্প।
আমরা কথা বলছি।
আর উনি শুনছেন ।
উনি ও বলেছেন ।ঠেলে ঠুলে বলানো আর কি!
উনার ছেলেবেলা থেকে শুরু করে বিয়ের আগে পর্যন্ত নানীর কাছে ছিলেন।
কড়া শাসনে বড় হয়েছেন। উনার বন্ধুদের কারো কথাই তেমন শুনিনি কখনো। খুব অবাক লেগেছে।
কিন্তু খুব একা হয়ে উনার কথা যখন ভেবেছি।
উনার মত হয়ে উনার জীবনটাকে ভেবেছি।
চমকে গেছি।
বুকটা কেঁপে উঠেছে।
তবু তো উনি কথা বলেন……..এমন ও তো হতে পারতো উনি কখনো কথা বলছেন না!
উনার জীবনের গল্পটা কি কষ্টের।
কি বেদনার।
চাইলেই কি সেই বেদনা ছুঁতে পারি কেউ? নাকি সম্ভব?
মুক্তিযুদ্ধের সময় উনি খুব ছোট ছিলেন।
উনার মা তখন আবার সন্তান সম্ভবা।
যুদ্ধের সময় উনারা গ্রামে চলে যান।

এক রাতে গ্রামে পাকিস্তানী সৈন্যরা আসে……..বাড়ী ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাড়খার করে। উনাদের বাড়ীতে এসে বৃদ্ধ দাদা দাদী আর মহিলা শিশুদের একটা ঘরে আটকে রেখে বাড়ীর উঠানে গুলো করে মারেন উনার বাবা আর চাচাদের(৪ ভাইকে একসাথে)। সারা গ্রামে কোন মানুষ ছিলো না যে উনাদের কে ঘর থেকে বাইরে আনবেন।
পরদিন সকালে ঘর থেকে বের হয়ে উঠান ভর্তি লাশ দেখেন সবাই।
এক চাচা নাকি পানি পানি করে আর্তনাদ করে চলে গেছেন…….কেউ দিতে পারে নাই পানি।পাশের বাড়ীর আরো কিছু মানুষের লাশ ও ছিলো সেখানে।

এমন একটা দৃশ্য দেখে একটা ছোট্ট মেয়ে যে কথা বলা ভুলে যাবে এটাই তো স্বাভাবিক।
এতো শুধু মৃত্যু ছিলো না………..এ ছিলো বিভীষীকা!

যুদ্ধের পর সংগত কারনেই উনার মায়ের বিয়ে দেয়া হয়।
১৭/১৮ বছরের একটা মেয়ে ২ টা অবোধ শিশু নিয়ে কি করে জীবন পাড়ি দেবে?
উনার নানীর কাছে বড় হন দুইটা বোন।
বাবাহীন এবং মা হীন হয়ে।
ভাবলেই তো হিম হয়ে আসে মন।
নানীর ভালোবাসার গল্প করেছেন………
তবে কোন সে অভিমান যে ছিলো মায়ের জন্য……
কখনো বলেন নি। ভাগ্যিস উনি কম কথা বলেন!

আমাদের ছোটবেলার গল্প জুড়ে বাবা মা…….
আমরা গল্প করলে উনি চুপ করে শুনেছেন। আমরা উনার দিকে দিকে তাকিয়ে অন্য গল্পে চলে গেছি পলকেই।
উনি কার কথা বলবেন?

যে চোখে বাবাকে দেখার কথা মনে রাখেনি।
যে হাতে বাবার হাত ধরে বেড়াতে যাবার উষ্ণতা নেই।
যার সাথে সমুদ্র দেখার বাসনা হয়নি কখনো। তার কথা কি বলবেন?

বাবা শব্দটা উনার জন্য শুধু শব্দ। কোন সজীব অনুভূতি বা কোন উষ্ণতা নয়।
বাবা মানে উনার কাছে ফ্রেমে বাঁধানো সাদা কালো এক ছবি।
বাবার ছবিটা উনার ঘরে আটকানো।

ছবিটার দিকে তাকিয়ে উনার কি বলতে ইচ্ছা করে না….
বাবা ৩৭ টা বছর চলে গেলো। যেই দেশের জন্য তোমরা প্রান দিলে । সেই দেশ এখনো তেমনই অশুভ শক্তির কাছে পরাজিত থেকে গেলো।
বাংলাদেশের সব মানুষের দূর্বলতাকে পূজি করে সেই সব শক্তি দিনে দিনে শক্তিশালী হয়েছে।
এত রক্ত।
এত জীবন দান।
একটা দেশ তো হয়েছেই।
একটা পতাকা সবুজের বুকে লাল।
কিন্তু শুধু একটা পতাকা বা একটা মানচিত্রই কি চাওয়া ছিলো?

আমাদের দেশের মানুষ রাজনীতির বাইরে থেকেও কত কিছু করছে……
প্রাইভেট সেক্টরে কত ভালো ভালো কিছু হচ্ছে……।কত মানুষের রুটি রোজগার।
সব খানেই তো দেশের মানুষ সার্বিক সাফল্য দেখাচ্ছে।
শুধু রাজনীতির খেলায় আমরা এমন ভুল করছি কেনো?
সার্থক কোন নেতৃত্ব কেনো নেই?

১৬ই ডিসেম্বরের এই দিনে আমরা সবাই কেনো বলি না …….
“আমাদের গর্ব করবার মত সব আছে
যুদ্ধ আছে।
প্রান উৎসর্গ আছে।
বীরাঙ্গণা মা ,বোন আছে।
বাবা মা হীন সন্তান আছে।
যুদ্ধ শিশু আছে।”
আমরা যদি না পারি…..আর কে পারবে?
আমাদের যদি জাগতে দেরী হয় তাহলে তো এভাবেই পরাধীণতায় চলে যাবে আরো ৩৭ কেনো শত শত বছর! “

আমার সেই স্বল্পভাষী বন্ধু যদি একদিন সবার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে……
কি হলো দেশবাসী
আমার বাবা ,চাচাদের রক্ত দিয়ে কি পেলাম!
আমার মাকে অন্যের ঘরে দিয়ে একা একা বড় হয়ে কি পেলাম?
কি জবাব দেবো আমরা?
বলতে পারেন কেউ?

আজ বিজয় দিবসে সবাই শপথ নেই …..
স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম নেয়া সব শিশুরা যারা যু্দ্ধ দেখেনি।
যাদের কাছে যুদ্ধ শুধু ইতিহাস……
তারাই পারে দেশটাকে যোগ্য নেতৃত্বের হাতে উঠিয়ে দিতে।

সেদিন আর যে যাই করুক আমার বন্ধুটি ওর বাবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলবে …..বাবা আমরাই পারি।
সেদিন হয়তো মাকে ফোন করে সব অভিমান ভুলে বলবে,” মা তুমি সুখে থাকো। আমাদের ত্যাগ সার্থক হয়েছে।”
আমরা সবাই সেই সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় রইলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *