মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী- আঁন্দ্রে মালরোঁ

খ্যাতিমান ফরাসী লেখক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, অভিযাত্রী আঁন্দ্রে মালরোঁ ছিলেন পশ্চিমা জগতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রামী কন্ঠস্বর ।
পাকিস্তানী সেনাবাহীনির বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে ছিল মালরোঁ’র। ১৫০জনের এক সেচ্ছাসেবীবাহিনী গড়েছিলেন তিনি তার পুরনো সহযোদ্ধাদের নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে।

সংক্ষিপ্ত জীবনীঃ- ১৯০১ সালে প্যারিসে জন্ম নেন মালরোঁ। ছোট বয়সে বাবাকে হারান। বইয়ের দোকানে কাজ নেন অল্প বয়সে। সেখানেই তার লেখালেখির হাতেখড়ি। ২১ বছর বয়সে যান ক্যাম্বোডিয়াতে। তখনকার ফরাসী উপনিবেশ ইন্দোচীনে এসে উপনিবেশবাদ প্রত্যক্ষ করেন, তার প্রতিবাদী মন কলম তুলে নেয় অপশাসনের বিরুদ্ধে। ফরাসী উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন মাঁলরো।

১৯২৬ সালে ফিরে যান ফ্রান্সে। ১৯৩০ এর দশকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সদা তৎপর। স্পেনের গৃহযুদ্ধে বিমানবাহিনী নিয়ে অংশ নেন । এরপর এল দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধের শুরুতেই ফরাসী সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বন্দী হন জার্মানদের হাতে। ভাগ্যক্রমে পালান সেখান থেকে। ততদিনে ফ্রান্স দখল করে নিয়েছে জার্মানরা। এবার যোগ দিলেন ফরাসী গেরিলা বাহীনিতে, কিন্তু আবারও বন্দী হন জার্মানদের পুলিসদল “গেস্টাপো”র হাতে। দ্বিতীয়বিশ্বযুদ্ধ শেষে জেনারেল চার্ল দ্য গল সরকারের অধীনে তথ্য মন্ত্রী হন(১৯৪৫-৪৬)। ১৯৫৮ তে হলেন স্বরাস্ট্র মন্ত্রী । তারপর ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৯ দীর্ঘ সময় থেকেছেন ফ্রান্সের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে। ১৯৭৬ সালের ২৬শে নভেম্বর মারা যান মালরোঁ। তার বিখ্যাত উপন্যাসগুলো হল The Temptation of the West , The Conquerors , The Royal Way , Man’s Fate ইত্যাদি।

মালরোঁ এবং বাংলাদেশ।
পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ২৫ মার্চের কালোরাত্রিতে যে নির্বিচারে গনহত্যা শুরু করেছিল তার বিরুদ্ধে তখন পশ্চিমা দুনিয়া ছিল অনেকটাই নির্বিকার। মুক্তিকামী মানুষের বিবেক আন্দ্রেঁ মালরোঁকে তা গভীরভাবে ব্যাথিত করে। বর্বর পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বিশ্ব বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সোচ্চার হন মালরোঁ। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের ৭ তারিখে তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ লিবারেশান কাউন্সিল অফ ইন্টেলিজেন্টসিয়া’র জেনারেল সেক্রেটারী জহির রায়হান কে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ইচ্ছে জানিয়ে চিঠি দেন। সেপ্টেম্বরের ৭ তারিখে “ আন্তর্জাতিক সেচ্ছাসেবক ব্রিগেড” গঠনের ঘোষনা দেন। আন্তর্জাতিক বুদ্ধজীবিদের সম্মেলন আহবান করেন বাংলাদেশের সমর্থনে এবং সেই সম্মেলনের সভাপতি হওয়ার ঘোষনা দেন। জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের সমর্থনে বক্তব্য উপস্থাপনের সিদ্ধান্তও ঘোষনা করেন মালরোঁ। মালরোঁ’র বয়স তখন ৭০ বছর। তিনি বাংলাদেশের মুক্তি যোদ্ধাদের পাশে থেকে যূদ্ধ করে মৃত্যুবরন কে গৌরবজনক মৃত্যু হিসেবে উল্ল্যেখ করে চিঠি দেন ভারতের রাস্ট্রদুত এবং ব্যাক্তিগত বন্ধু নারায়ননকে। তার লেখা উপন্যাস L’Espoir [Hope] এ বাংলাদেশকে উপস্থাপন করেন। যুদ্ধে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্য বাংলাদেশে আসার কথা ছিল ১৫ই ডিসেম্বর। ৩’রা ডিসেম্বরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে যখন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ফ্রান্স সফর করেন তিনি মালরোঁ’র সাথে দেখা করেন।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেন নি মালরোঁ কিন্তু তার সমর্থন বিশ্ব বিবেককে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল অনেক।
১৯৭৩ সালে বংবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আমন্ত্রনে বাংলাদেশ আসেন মালরোঁ। ২১ শে এপ্রিল ঢাকা পৌছে তিনি উচ্চারন করেন সেন্ট ফ্রান্সিসের সেই বিখ্যাত উক্তি “I kiss poverty on a single face. Since I cannot kiss everybody, I kiss Bangladesh on a single face.”

তার সংক্ষিপ্ত সফরে তিনি সোহরওয়ার্দি হাসপাতালে দেখতে যান যুদ্ধাহত মুক্তি যোদ্ধাদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না জানা শহীদদের সৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলেন “ Students of Dacca, I am speaking today, for the first time, in the only university in the world, which has more dead than living students […] All your dead ones had a rendezvous with destiny, but now, it is for you to build the nation.” – আজ আমি পৃথিবীর এমন এক মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি যার মৃত ছাত্রদের সংখ্যা জীবিতদের চেয়ে বেশী। মৃত্যবরনকারীরা আর আর নেই কিন্তু আজ যারা বেচে আছ তাদের কাজ হল এ দেশ কে গড়ে তোলা”।

এরপর যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসুচক ডক্টরেট ডিগ্রী গ্রহনের সময় বলেন “On all your graves, on the pits filled with the corpses of your intellectuals, write in huge letters: “You who pass by this stone later, go tell our people that those who have fallen here have died because, during the nine month-long age of suffering, they chose to fight with their bare hands!”
Salutations to you, O dead ones of the forests that surround us!
You have shown the world that an enemy can never assassinate enough to kill the soul of a people which does not surrender!
তোমাদের সমস্ত সমাধি ক্ষেত্র, সমস্ত বুদ্ধীজীবিদের কবরের স্মৃতিফলকে তোমরা লিখে রাখবে “ যারা এই স্মৃতিফলকের পাশ দিয়ে যাবে তারা স্মরন করো সেই মানুষদের যারা দীর্ঘ নয় মাস খালি হাতে যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছে। তোমাদের সশ্রদ্ধ সালাম” তোমরা পৃথিবীকে দেখিয়েছ যে যাতি আত্মসমর্পন করে না শত্রুর সাধ্য নেই য হাজারো হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে সে জাতিকে দাবিয়ে রাখতে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *