মুক্তিযুদ্ধে ভিনদেশী সাহিত্যিকদের অবদান

একাত্তরে লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের সংহতি আন্দোলনের সামনে ছিলেন লেখক, শিল্পী ও ধর্মীয় নেতারা। একাত্তরের ১১ জুন তাঁদের একটি প্রতিনিধিদল আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য সাহায্য পাঠানোর দাবি জানিয়েছিলেন। এই দাবিনামায় যাঁরা স্বাক্ষর করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রথমেই ছিলেন আশি-ঊর্ধ্ব ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর নাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন খ্যাতনামা সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস সহ আর্জেন্টিনার সেরা লেখক ও শিল্পীদের অনেকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিজয়া’—ভিক্টোরিয়ার নামের এই বাংলা প্রতিশব্দ করেছিলেন কবি নিজে—ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো বাংলাদেশের সমর্থনে রাজধানী বুয়েনস এইরেসের একটি মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন।
তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি আমার সমর্থন অত্যন্ত স্বাভাবিক। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের ভাষা বাংলা। বাংলা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও ভাষা। আর তিনি (রবীন্দ্রনাথ) বহু সময় কাটিয়েছেন বাংলার ওই অংশে। সে জন্য এই অঞ্চলের মানুষের সংগ্রামের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ আমার কর্তব্য বলে মনে করেছি।’

আঁদ্রে মালরো (ফ্রান্স)

বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ফ্রান্সের আঁদ্রে মালরো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সময় গর্জে উঠেছিলেন প্রবল বিক্রমে, বাংলাদেশের জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে যোগদানের প্রতীকী অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঘোর অমানিশার দিনে তাঁর দুঃসাহসী কণ্ঠস্বর বিপুল প্রেরণা জুগিয়েছিল।
মালরো লিখেছিলেন, ‘বিদ্রোহ যখন শুরু হলো, তখন থেকে ইসলামাবাদের সেনারা পূর্ব বাংলার কাছে আর স্বদেশবাদী বা স্বধর্মীয় থাকল না, তারা পরিণত হলো দখলদার বাহিনীতে।’

অ্যালেন গিন্সবার্গ (আমেরিকা)

বিট বংশের উদ্যোক্তা কবি অ্যালেন গিন্সবার্গকে বাংলাদেশের একাত্তরের ট্র্যাজেডি গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। বাংলাদেশের লাখো-কোটি মানুষের দুর্দশা স্বচক্ষে দেখতে তিনি ভারতে এসেছিলেন একাত্তরের সেপ্টেম্বরে। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরের নিদারুণ অভিজ্ঞতা তিনি বাণীবদ্ধ করেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ নামের দীর্ঘ কবিতায়। তার একটি অংশ এ রকম: ‘লক্ষ শিশু দেখছে আকাশ অন্ধকার/ উদর স্ফীত, বস্ফারিত চোখের ধার/ যশোর রোডে বিষণ্ন সব বাঁশের ঘর/ ধুঁকছে শুধু, কঠিন মাটি নিরুত্তর।’
কলকাতার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা থেকে জানা যায়, অ্যালেন গিন্সবার্গ তাঁর এই কবিতাটিতে সুর দিয়েছিলেন। হারমোনিয়াম বাজিয়ে নিজে গেয়েছেন বহুবার। এই কবিতা, এই গান গিন্সবার্গের খুব প্রিয় ছিল। এ কবিতার আলোকে মৌসুমী ভৌমিক গেয়েছিলেন যশোর রোড গানটি।
গিন্সবার্গের কন্ঠে গানটি শুনতে এখানে ক্লিকান

সুভাষ মুখোপাধ্যায় (ভারত)
একাত্তরে পঞ্চাশোর্ধ্ব কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়—যেন টগবগে তরুণ—বক্তৃতা করছেন, সীমান্তে যাচ্ছেন, মুক্তাঞ্চলে ঢুকে পড়ছেন, লিখছেন, আরও কত কী-ই না করছেন। সেসব দিনের অভিজ্ঞতায় পূর্ণ কবি সুভাষের রিপোর্টাজ গ্রন্থ ওদের ক্ষমা নেই এখন কোথাও পাওয়া যায় না। জীবদ্দশায় তিনি সব সময় সেসব দিনের কথা বলতেন। বারবার বলতেন একাত্তরের জহির রায়হানের কথা।

সূত্র: ৯ ডিসেম্বর ২০১০ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত মতিউর রহমানের কলাম এবং ওয়েবসাইট

মুক্তিযুদ্ধে ভিনদেশীদের অবদান নিয়ে আরো দু’টি পোস্ট
তাঁদের জন্য ভালোবাসা
মুক্তিযুদ্ধে ভিনদেশী বন্ধুদের তিনটি অজানা গল্প শুনুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *