মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শহীদ তিন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতিদাস, তালেব ও গিয়াস

মহান মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের গৌরবোজ্জোল ভূমিকা ছিল। বিশেষ করে এই কলেজের ছাত্র, মুক্তিযুদ্ধে লাল পতাকার ‘‘দাসপার্টি’’র কমান্ডার ইতিহাসের বিস্মৃতপ্রায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসের অবদান ছিল ঈর্ষনীয়। লালপতাকার এই কমরেডের পাশাপাশি এই কলেজেরই টগবগে যৌবনের আরো দুই শহীদ ছাত্র তালেব আহমদ ও গিয়াস উদ্দিনরও ছিলেন সময়ের নায়ক।
এই তিন কমরেড যৌবন উৎসর্গ করে বীর বিক্রমে যুদ্ধ করেছিলেন মাতৃভূমির জন্য। তাদের উপর পাকবাহিনীর নির্মম অত্যাচারের কথা শোনলে এখনো গা শিউরে ওঠে। এই তিন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার গৌরবগাঁথা সহযোদ্ধাদের মুখে মুখে ফিরলেও তাদের নিজ প্রতিষ্ঠানে তারা এখনো উপেক্ষিত। অথচ ইতিহাসে কিংবদিন্ত হওয়ার কথা ছিল তাদের। কলেজ কর্তৃপক্ষ তিন যোদ্ধার স্মরণে দায়সারা গোছের একটি ফলক নির্মাণ করলেও তাদের কথা জানেনা নতুন প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীরা। এমনকি অনেক শিক্ষকও তাদের সম্পর্কে জানেন না কিছুই। ছাত্রছাত্রীদের টাকায় মাঝেমধ্যে কলেজ স্মরণিকা বের হলেও এতে তাদের গৌরবগাঁথা না থেকে মানহীন আজেবাজে লেখা ছাপা হয়।
শহীদ জগৎজ্যোতি দাস: লাল পতাকার মৃত্যুঞ্জয়ী ’দাস’ কমান্ডার
শহীদ জগৎজ্যোতি দাসের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে। জীতেন্দ্র দাস হরিমতি দাসের ছোট ছেলে জগৎজ্যোতি দাস ছিলেন অন্তর্মুখি স্বভাবের। তোতলামো স্বভাবের এই নির্জনতাপ্রিয় অথচ অসম্ভব সাহসী ছেলেটিকে বাবা মা আদর করে ‘শ্যাম’ ডাকতেন।
জগৎজ্যোতি দাস ১৯৬৮ সনে এসএসসি পাশ করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৭১ সাল সুনামগঞ্জ কলেজের এইচএসসি শেষবর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে বিশেষ দায়িত্ব পালনে ভারতের গৌহাটির নওপং কলেজে ভর্তি হন। সেখানে অবস্থানকালে অনেকগুলো অঞ্চলের ভাষা আয়ত্ব করেন এবং ধীরে ধীরে নকশাল পন্থীদের সঙ্গে জড়িত হন। এখানে অস্ত্র গোলাবারুদ সম্পর্কে স্বচ্চ ধারনা নিয়ে আবার দেশে ফিরে আসেন।
বিপ্লবী রাশেদ খান মেননের ভাবশিষ্য এই ফ্রিডম ফ্রাইটার মহান মুক্তিযুদ্ধে ভাটিবাংলার উড়নচন্ডি অকুতোভয় যুবকদের নিয়ে গঠিত দাস পার্টির কমান্ডার ছিলেন। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার এই যুদ্ধে তার প্রত্যুতপন্নমতিত্ব, প্রাকৃতিকভাবে যোগাযোগ বিচ্ছন্ন দায়িত্বরত এলাকায় নতুন নতুন রণকৌশল ও দুঃসাহসী সফল অপারেশনের কারণে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে একাধিকবার তার বীরত্বগাঁথা প্রচার হচ্ছিল সম্মানের সঙ্গে। আর একারণে তার প্রতি চরম ক্ষুদ্ধ ছিল পাক হায়েনারা। তার অনিষ্ট সাধনে এলার্ট থাকতো তারা। সহযোদ্ধারা জানান, এই সাহসী কিশোর মক্তিযোদ্ধাকে বীরশ্রেষ্ট উপাধি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ জানান, শহীদ জগৎজ্যোতিকে বীরশ্রেষ্ট খেতাব দেওয়ার ঘোষনা দেওয়া হয়েছিল একাধিকবার এবং তার বীরত্বগাথা প্রচার হচ্ছিল সম্মানের সঙ্গে। তার বীরত্বগাথার কথা শোনে তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা উদ্বুদ্ধ হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ঘোষিত খেতাবসহ কোনো খেতাব তার ভাগ্যে জোটেনি। কেউ নেয়নি তার নিকটজনদের খবর।
জগৎজ্যোতি বানিয়াচং থানা আক্রমণ করতে বেড়ামোহনা নদীর দিকে এগুলে স্থানীয় রাজাকাররা তার নৌকা আটকে দেয়। এর দুইশ গজ অদূরেই ছিল পাক বাহিনীর ক্যাম্প। এসময় স্থানীয় রাজাকার-পাকরা যৌথ আক্রমণ চালালে দাস পার্টির সদস্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং এই পার্টির নেতা জগৎজ্যোতিদাস নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। তখন যুদ্ধের ময়দানে একজন অসম্ভভ কিশোর তখন একমাত্র সঙ্গী এলএমজির ট্রিগারে ধরে একাই ক্যাম্পর দিকে দিকে এগুতে থাকেন। ফায়ার করতে করতে অকুতোভয় যোদ্ধা এগিয়ে যেতে গিয়ে চোখে গুলিবিদ্ধ হন। কাহিল হয়ে পড়লে পাক আর্মিরা তাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে আজমিরিগঞ্জে একটি খুটির সঙ্গে প্যারেক দিয়ে বেধে অমানুসিক নির্যাতন চালায়। এই অবস্থায় তার প্যারেকমারা ছবি পত্রিকায় প্রকাশ করে তাকে দু®িকৃতিকারী হিসেবে প্রচারণা চালায়। ১৬ নভেম্বর তিনি শহীদ হন।
শহীদ হওয়ার আগে ২৯ জুলাই বৃহস্পতিবার জামালগঞ্জ থানা ও নৌবন্দর সাচনাবাজার শত্র“মুক্ত করে লাইম লাইটে চলে আসেন। শহীদ জগৎজ্যোতি দাস দিরাই, জামালগঞ্জ, তাহিরপুরে সফল অপারেশন শেষে সীমান্তের টেকেরঘাটে রিপোর্ট করেন। তার নেতৃত্বে সিলেট সুনামগঞ্জ সড়কের বদলপুর ব্রীজ বিধ্বস্থ করা হয়। তার কৃতিত্বের কারণে ভারতীয় কমান্ড বাহিনীর মেজর জি,এস,ভাট প্রশংসা লাভ করেন। তার নেতৃত্বে সাহসী ও সময়োপযোগী দায়িত্ব পালনের উদ্দেশ্যে সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত তরুণ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে দাস পার্টি গঠন করেছিলেন জ্যোতি।
তার স্মৃতি প্রসঙ্গে গণমানুষের নেতা কমরেড বরুন রায় বলেন, আমি তখন আন্ডার গ্রাউন্ডে। সে যেদিন বানিয়াচং অপারেশনে যায় আমার পা ছুয়ে আশির্বাদ নিয়ে যায়। যাবার সময় বলে যায় দাদা আবার দেখা হবে। যদি নাই বাচি তাহলে আশির্বাদ করবেন যাতে বীরপুরুষের মতো মরি। বরুণ রায় ভারাক্রান্ত গলায় বলেন, যাবার আগে আবার পিছিয়ে এসে কাদোকাদো গলায় বলে দাদা এদেশটা যেন আপনাদের হাতে দিয়ে যেতে পারি। পরের দিনই তাকে ধরার খবর পেয়ে বিমর্ষ হয়ে পড়ি। তারপরতো সে এক মহানায়কের ইতিহাস।
শহীদ গিয়াস উদ্দিন: মতিয়ার চৌধুরীর লেলিন
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শহীদ তিন ছাত্র মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সবার বয়োজ্যষ্ঠ শহীদ গিয়াস উদ্দিন। বন্ধুজনরা তাকে ‘‘লেলিন’’ বলে ডাকতো। জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীধরপাশা গ্রামের মোঃ রফিক উদ্দিনের পুত্র গিয়াস উদ্দিন ১৯৬৭ সনে এসএসসি পাশ করে ভর্তি হন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি কলেজে বিএ ১ম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। জুনের শেষ দিকে তিনি যুদ্ধে অংশ নেন। মতিয়া গ্র“পের একজন মেধাবী ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ও প্রজ্ঞাবান সংগঠক ছিলেন। শহীদ গিয়াস উদ্দিনের সহযোদ্ধা ও সহপাঠি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, শহীদ গিয়াস ছিল অসম্ভব মেধাবী। কলেজ ক্যম্পাসের বাইরে সে মার্কস-লেলিনের বিপ্লবের বই বগলদাবা করে ঘোরতো। লাল মলাটের বিপ্লবের গোপন চটি বই থাকতো তার পকেটে। এজন্য আমরা তাকে লেলিন বলে ডাকতাম। অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর অসম্ভব ভক্ত আমাদের এই লেলিন মহান মুক্তযুদ্ধে বীরোচিত ভূমিকা রেখেছে। তার সাংগঠনিক প্রজ্ঞা ছিল ঈর্ষণীয়। মার্কস-এঙ্গেলস এর রক্তে আগুন ধরানো বৈপ্লবিক উক্তি ছিল তার মুখস্ত।
শহীদ গিয়াস উদ্দিন ৫নং বালাট সাব সেক্টরের আবু হেনা চৌধুরীর প্লাটুনে যুদ্ধ করেছেন। দিরাইর নলুয়া-গোাজাবিলে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে একশনে নামে পাক আর্মিদের গুলিবৃষ্টির মুখে গিয়াসের সহযোদ্ধারা পিছু হঠলেও একাই তিনি ফায়ার করতে করতে সামনে এগুতে থাকেন। ওখানে গ্রেনেড চার্জ করতে গিয়ে তিনি ২৯ সেপ্টেম্বর শবে বরাতের রাতে শহীদ হন। এই দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধার লাশ আরে খোজে পাওয়া যায়নি।
শহীদ তালেব আহমদ: যুদ্ধের ময়দানে যার চোখে ছিল শত্র“ হননের আগুন
শহীদ তালেব আহমদ ১৯৬৯ সনে এসএসসি পাশ করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হন। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে তিনি সাংগঠনিক কাজ করতেন। অক্টোবরে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। সুনামগঞ্জ মহুকমা ছাত্রলীগের সম্পাদক তালেব আহমদের বাড়ি দিরাই উপজেলার হাতিয়া গ্রামে।
একাত্তরের ২৭ নভেম্বর তালেব সুনামগঞ্জ শহরতলীর সীমান্ত এলাকা মঙ্গলকাটা এলাকায় যুদ্ধ করছিলেন। এখানে তিনি সম্মুখযুদ্ধে অবর্তীর্ণ হন। পাক বাহিনীর এলোপাথাড়ি আক্রমণে তালেবের সহাযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে তালেব চলতিনদী পাড়ি দিতে গিয়ে বালুচরে আটকে যান। এই সুযোগে পাক আর্মিরা তাকে ধরে নিয়ে শহরে প্রদর্শন করে প্রকাশ্য ভয়ঙ্কর নির্যাতন করে। স্থানীয় রাজাকাররাও তার প্রতি পাক আর্মিদের আরো ক্ষেপিয়ে তোলে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে।
সেই উত্তাল সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী কিশোর, সাংবাদিক রওনক আহমদ বখত বলেন, পাক বাহিনীর অত্যাচারে মানুষ তখন শহর ছাড়া। সেই ভুতুরে শহরে লুকিয়ে লুকিয়ে বিভিন্ন এলাকা ঘুরতাম। আমার ষ্পষ্ট মনে আছে জুবিলি স্কুলে অনুষ্ঠিত সভায় পাকবাহিনী ও রাজাকাররা তালেব ভাইকে ভংঙ্কর নির্যাতন করে। তখন তালেব ভাই সভার লোকদের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছিলেন। সভায় শহরের অনেক নামিদামি পকিস্তানপন্থি লোকজন ছিলেন। আমার এই স্মৃতি এখনো জীবন্ত মনে হয়। ইচ্ছে করলেই সেই সভায় উপস্থিত শহরের পাকিস্তানপন্থী লোকজন তাকে রক্ষা করতে পারতো।
২৯ নভেম্বর পাক আর্মিরা শহর ছাড়ার পর আহত অবস্থায় তালেবকে সঙ্গে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় আহসানমারা ব্রীজের সামনে অমানুষিক নির্যাতন শেষে খুন করে ফেলে যায়। পরে এলাকাবাসীর সহায়তায় তার লাশ শনাক্ত করে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা আলফাত উদ্দিন মোক্তার সাহেবের প্রচেষ্ঠায় তার দাফনকাফন সম্পন্ন করা হয়। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শহীদ তিন ছাত্রনেতার মধ্যে একমাত্র তার লাশের খোজই মিলছিল।
সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের বাংলাবিভাগের প্রধান নীলিমা চন্দ বলেন, যুদ্ধদিনে উক্ত তিন ছাত্রনেতার উপর পাকবাহিনীর নির্মম অত্যাচার চালায়। তারা কিংবদন্তি তুল্য। তবে তাদের বীরত্বগাথা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌছে দেওয়া উচিত।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ কলেজ তিন যোদ্ধার স্মরণে দায়সারা গোছের একটি ফলক নির্মাণ করেই ক্ষান্ত। ছাত্রছাত্রীরা জানান, আজ পর্যন্ত জ্তীয় দিবসে তাদের নিয়ে আলোচনা হয়না। ছাত্রছাত্রীদের টাকায় মাঝেমধ্যে কলেজ স্মরণিকা বের হলেও এতে তাদের গৌরবগাঁথা না থেকে মানহীন আজেবাজে লেখা ছাপা হয়।

(২০০৫ সনে প্রকাশিতব্য কলেজ স্মরণিকায় এই প্রতিবেদকের অনুরোধে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরী করা হয়। কিন্তু ৫ বছর পর সকল কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরও এখনো আলোর মুখ দেখেনি। প্রকাশিতব্য এই স্মরণিকার নির্ধারিত বাজেট সাবেক এক প্রিন্সিপাল আতœসাত করেছেন বলে খোজ নিয়ে জানা গেছে। )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *