মুক্তিযুদ্ধ এবং আমাদের পরিবার

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমরা তখন পশ্চিম পাকিস্তানে বাবার সেনাবাহিনীতে উচ্চপদস্থ চাকরির সুবাদে। কিন্তু ২৫শে মার্চের গণহত্যা এবং পরের দিনগুলোতে পাক হায়েনার অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন এবং বাঙালি নিধন বিষয়ে পশ্চিম পাকিস্থানে বসবাসরত বাঙালি চাকরিজীবীরা তেমন কিছু শুনতে পায়নি প্রাথমিক পর্যায়ে। আমাদের পরিবারও তার ব্যতিক্রম নয়।

তখন আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের শিয়ালকোট সেনানিবাসে পোস্টে ছিলাম আর পশ্চিম পাকিস্তানি সেনারা বাঙ্গালি অফিসার/সেনাদের উপর কড়া নজরদারি রেখেছিল এমতাবস্থায় আমি ছোট ছিলাম বলে এতকিছুতে আমার খেয়াল ছিল না। স্বাভাবিকভাবে খেলাধুলাতে মগ্ন ছিলাম। হঠাৎ একদিন কিছু অফিসার আমাদের বাসায় এলো সন্ধ্যাবেলা (পরে তাদের নাম জানতে পেরেছিলাম দেশ স্বাধীনের পর আরেকটু যখন বড় হলাম, অফিসারদের মধ্যে ছিল কর্নেল তাহের, মেজর জিয়াউদ্দিন, ক্যাপ্টেন পাটোয়ারি) সন্ধ্যার পর, আপ্যায়নের পর জানা গেল তারা দেশে পালিয়ে যাবে আর স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিবে, তাদের কাছে বিশদ বিবরণ জানা গেল বিগত কয় মাসের গণহত্যা, অত্যাচার আর এখানে বসবাসরত বাঙ্গালি অফিসার/ চাকরিজীবীদের মনোভাবের কথা।

সবশেষে সিদ্ধান্ত নেয়া হল বাপ্পি আমাদেরসহ পালিয়ে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেবেন আর শিয়ালকোটসহ তার আশে-পাশে ভারতের সীমান্ত বিষয়ে পুরোপুরি অনেক ভালো ধারনা ছিল বাপ্পির। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতের দিকে আমরা সবাই (আমাদের ঘরের কাজের লোকসহ) অফিসাররা যে গাড়ি নিয়ে এসেছিল সেটাতে করে রাতে রওনা দিয়েছিলাম দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে একসময় গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করলাম ধানি জমি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে (আমি ও আমার ছোট ভাইকে) তাহের/ জিয়াউদ্দিন আঙ্কেল কোলেপিঠে করে সীমানা অতিক্রম করিয়েছিলেন, বাপ্পি, মাম্মি এবং অন্যরা সেই এক এডভেঞ্চার পরে বিস্তারিত শুনেছিলাম এবং আপনারা শুনেছেন কর্নেল তাহেরকে নিয়ে বিভিন্ন পুস্তক পুস্তিকাতে।

শেষে দেবীগড় সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সীমানায় প্রবেশের পর বিএসএফ ও বিভিন্ন মাধ্যমে সবশেষে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিল বাপ্পি যা সবার জানা আছে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে আমার বাপ্পি একমাত্র সেক্টর কমান্ডার যিনি সেক্টর ৮ যশোর ও ৯ খুলনা একসাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আর বাংলাদেশের প্রথম মুক্তাঞ্চল ছিল যশোর যা ৬ ডিসেম্বর শত্রু মুক্ত হয়েছিল। তারপর ৮নং সেক্টর এর মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বিত আক্রমণে ১৭ই ডিসেম্বর মুক্ত হয়েছিল সেটা ছিল এক বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস যার নাম ছিল ব্যাটল ট্যাংক অব শিরোমনি যা বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনীতে পাঠদান দেয়া হয়।

শুধু এইখানে শেষ নয় স্বাধীনতার পরে বাপ্পির বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করেছিল, তারপর দেশ ও সামরিক বাহিনী পুনঃগঠনে ভূমিকা পালন করেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকভাবে কয়েকটি জায়গাতে অস্ত্র জমা দেয়া হয়েছিল তারমধ্য বাপ্পির সেক্টর অন্যতম।

নিয়তির নির্মম পরিহাস যে দেশের জন্যে এতকিছু করেছিল সেই দেশেই স্বাধীনতা বিরোধীরা ১৯৮১ সালের ঘটনায় জিয়া হত্যাকাণ্ডে উনার নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিল, অপপ্রচার, মিথ্যাচার কিছুই বাদ যায়নি শুধুমাত্র হিংসা পরায়ণ হয়ে আর নির্মমভাবে তড়িঘড়ি করে খুন করে লাশ আমাদের কাছে হস্তান্তর না করে গোপনে দাফন করেছিল এমনকি কবরের চিহ্ন পর্যন্ত রাখেনি। অথচ চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট এর সবাই জানে কে এবং কারা সম্মিলিতভাবে আমার বাপ্পিকে হত্যা করেছিল আর আমাদের করেছিল এতিম।

বাপ্পির এই দেশকে ভিন্নদেশীয় শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন, এই দেশকে ভালোবেসেছিলেন, দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। তাই দেশস্বাধীনের ১০ বছরের মাঝে এই পুরষ্কার পেতে হল, যেখানে একজন বীর উত্তম খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধার সমাধিচিহ্ন নেই, ৩৬বছর পরে এসে সংরক্ষণ করা হয়নি, সম্মানিত করা হয়নি, বিচার হয়নি ভাবতে অবাক লাগে সেই দেশের জন্যে আমার বাপ্পি যুদ্ধ করেছিল?

পাকিস্তান থেকে ছোট দুটি বাচ্চা আর স্ত্রী নিয়ে পালিয়ে এসে দেশ স্বাধীন করেছিলেন, জীবনের মায়া ত্যাগ করে, পরিবার ও বাচ্চাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, কিন্তু এত দেশপ্রেমের পরিণতি দেশের মানুষ দিয়েছে সমাধি চিহ্নহীন এক মুক্তিযোদ্ধার পুরষ্কার।

স্বাধীনতা দিবসে কত আনন্দ করবে দেশবাসী কিন্তু কারা এনে দিয়েছিল সেই পতাকা এবং দেশ এটা নিয়ে কেউ কি ভাবে? কত বেদনার অশ্রু এই স্বাধীনতার পেছনে আছে নিভৃতে সেটা কেউ কি ভাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *