মেজর খালেদ মোশাররফ

১৯৭১ সালের মার্চ মাস৷ উত্তাল বাংলাদেশ৷ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ হয়ে গেছে৷ পরিষ্কার হয়ে গেছে, পাকিস্তান টিকবে না৷ বছরের পর বছর ধরে বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর পাকিস্তানি সরকার যে শোষণ চালিয়েছে, তাতে ক্ষোভ দানা বেঁধে উঠেছিল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে৷ সে সময়ই জন্ম নেয় কয়েকটি শ্লোগান, যেগুলো আগুন জ্বালিয়ে দিত বাঙালির মনে, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’- ছিল সে রকমই একটি শ্লোগান৷ ইয়াহিয়া সরকার গোলটেবিল বৈঠকের নামে করছিল সময়ক্ষেপণ৷ ওদিকে পশ্চিম পকিস্তান থেকে নিয়ে আসছিল সেনাদের৷ নিয়ে আসছিল অস্ত্রশস্ত্র৷ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকদের নিয়ে অস্বস্তি ছিল তাঁদের৷ তাই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠি বাঙালি সেনাদের নিয়ে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বুনে যাচ্ছিল৷ গোপনে চূড়ান্ত হয়েছে বাঙালিদের আক্রমণ করার পরিকল্পনা৷ বাঙালি সৈন্যরা যেন জনগণের পাশে না দাঁড়াতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন কুট-কৌশল করে তারা৷

পাকিস্তান সেনা বাহিনীর তত্‍কালীন মেজর খালেদ মোশাররফকে নিয়েও পাকিস্তান বাহিনী বিভিন্ন কুট-কৌশলের আশ্রয় নেয়৷ কারণ তিনি ছিলেন বাঙালি৷ সেইসময় খালেদ মোশাররফ ছিলেন ঢাকা সেনানিবাসে৷ সেখান থেকে তাঁকে ১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের হেড অফিস কুমিল্লাতে উপপ্রধান হিসেবে বদলি করা হয়৷ তিনি ২২ মার্চ তাঁর পরিবারকে ঢাকায় ধানমন্ডিতে রেখে চলে যান৷ ইউনিটে পৌঁছার সাথে সাথেই তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর সৈন্যরা বেশ উদ্বিগ্ন৷ পাঞ্জাবিদের কমান্ডো এবং গোলন্দাজ বাহিনী বেঙ্গল রেজিমেন্টের চারপাশে পরিখা খনন করে মেশিনগান লাগিয়ে অবস্থান নিয়েছে৷ নির্দেশ পেলেই সবাইকে হত্যা করবে৷ সেনানিবাস রক্ষার অজুহাতে এসব পরিকল্পনা নিয়েছে তাঁরা৷ ফলে স্বাভাবিকভাবেই ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের মনে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠেছিল৷ তিনি পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা জানতে চাইলেন এখন তাঁদের কী কর্তব্য? তিনি তাঁদের সতর্ক থাকতে বললেন ৷

২৪ মার্চ সকালে খালেদ মোশাররফ উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার সময় লে. কর্নেল খিজির হায়াত খান তাঁকে ডেকে পাঠালেন৷ অফিসের ভিতর ঢুকে দেখলেন, তিনি বেশ উদ্বিগ্ন৷ তাঁকে জানালেন, সিলেটের শমসের নগরে নকশালপন্থিরা বেশ তত্‍পর হয়েছে এবং ভারত থেকে অনুপ্রবেশ ঘটছে৷ এসব কারণে ৪র্থ বেঙ্গলের একটি কোম্পানী নিয়ে আজই খালেদকে কুমিল্লা ছেড়ে যেতে হবে তাদের দমন করতে ৷ জবাবে তিনি বললেন একটা কোম্পানী যখন যাবে তখন কোনো জুনিয়র মেজরকে সেখানে পাঠানো যেতে পারে৷ সাধারণত কোনো উপপ্রধান একটি কোম্পানী নিয়ে যায় না৷ তাঁর কথায় তিনি অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, আপনি এখন যান ৷ কিছুক্ষণ পরে তিনি তাঁকে ব্রিগেড কমান্ডারের কাছে নিয়ে যান ৷ ব্রিগেড কমান্ডার তাঁকে বললেন, এটি একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কাজ তাই তোমাকে নির্বাচিত করেছি৷ আশা করি নিরাশ করবে না৷ তিনি বুঝলেন তাঁকে যেতেই হবে৷ শমসের নগরে যাওয়ার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছাত্র জনতা তাঁকে বাঁধা দেয়৷ তাঁরা তাঁকে জানায় যে, পূর্ব বাংলায় পাক সেনারা গুলি চালিয়েছে৷ তাঁরা ইচ্ছা করেই বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের কুমিল্লা থেকে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে৷ তিনি তাদের বুঝিয়ে শান্ত করে আবার রওনা দিলেন শমসের নগরের পথে৷

২৫ মার্চে শমসের নগরে পৌঁছার পর তিনি দেখলেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক৷ স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে আরও জানতে পারলেন সেখানে কোনো অঘটন ঘটেনি৷ কোথাও নকশালপন্থিদের কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলেন না তিনি৷ বুঝতে পারলেন তাঁকে কৌশল করে এখানে পাঠানো হয়েছে এবং যা কিছু তারা বলেছিল তার সবটাই মিথ্যা৷ কারণ বাঙালি সৈন্যদের নিয়ে গঠিত ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যদের দেশের নানা অংশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য৷ যাতে আক্রমণ করলে বাঙালি সেনারা ঐক্যবদ্ধভাবে পাক সেনাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে না পারে৷

খালেদ মোশাররফ ওয়ারলেসের মাধ্যমে হেডকোয়ার্টারে শাফায়াত জামিল এবং ক্যাপ্টেন হায়দারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেন৷ অনেক কষ্টে পরের দিন যোগাযোগ হয় তাঁদের৷ তাঁরা জানান, ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় সান্ধ্য আইন জারি হয়েছে এবং ৪র্থ বেঙ্গলকে তা কার্যকর করতে বলা হয়েছে৷ লোকজন সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে মিছিল করছে৷ এ অবস্থায় কী করণীয়?

প্রায় ১শ মাইল দূরে অবস্থান করে তাঁর পক্ষে এ প্রশ্নের জবাব দেয়া কঠিন ছিল৷ একদিকে সামরিক শৃঙ্খলা আর কর্তব্য বোধ আর অন্যদিকে বিবেকের দংশন তাঁকে পীড়িত করছিল৷ এই উভয় সংকটে পড়ে তিনি চিন্তাশক্তি হারিয়ে ফেললেন৷ মেজর শাফায়াত জামিলকে তিনি বললেন, আমাকে কিছুটা সময় দাও৷

অবশেষে তাঁর বিবেক তাঁকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করল ৷ যদিও কোনো রাজনৈতিক নির্দেশ সেই মুহূর্তে ছিল না৷ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঘোষণার কথা তাঁর মনে পড়ে গেল৷ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবার ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল৷ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’৷ তিনি লে. মাহবুবকে বললেন, ‘এই মুহূর্তে আমি স্বাধীন বাংলার আনুগত্য স্বীকার করলাম৷ স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দাও৷ আর সব সৈনিকদের বলে দাও আজ থেকে আমরা আর কেউ পাকিস্তানের অনুগত নই৷’ লে. মাহবুব যেন এই নির্দেশের অপেক্ষাতেই ছিলেন৷ তিনি দৌড়ে গিয়ে বাকি সৈনিকদের জানিয়ে দিলেন৷ কিছুক্ষণ পরেই খালেদ মোশাররফ শুনতে পেলেন বাঙালি সৈনিকদের শ্লোগান ‘জয় বাংলা’৷

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *