রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচন যথাসময়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে। আমরা এটি নিশ্চিত করব। এটা নিয়ে অহেতুক পানি ঘোলা করার চেষ্টা আর সংবিধান লঙ্ঘন করে অন্য কিছু চিন্তা করার কোনো সময় ও সুযোগ নেই। জনগণের ভোটের অধিকার হচ্ছে সাংবিধানিক অধিকার। আমরা জনগণের এ অধিকার নিশ্চিত করেছি, অবশ্যই নিশ্চিত করব। ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সভাপতির সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিএনপি যখন অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে তখন হাসি পায়। নির্বাচনের সব নিয়মকানুন যারা ভেঙে ফেলেছিল, কোন মুখে তারা (বিএনপি) সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে? তাই নির্বাচন নিয়ে কথা বলার আগে বিএনপির উচিত আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখা। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একদিকে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিচ্ছি, অন্যদিকে মিয়ানমারকে তাদের ফিরিয়ে নিতে চাপও দিচ্ছি। একটি দেশের নাগরিক কেন শরণার্থী হয়ে আরেক দেশে এসে আশ্রয় নেবে? এটা ওই দেশের জন্য সম্মানজনক নয়। বিষয়টি মিয়ানমারকে উপলব্ধি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর রুদ্ধদ্বার বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আগামী নির্বাচন এবং দলের নতুন সদস্য অভিযান জোরদার নিয়ে আলোচনা শেষে বেশকিছু সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী আগামী নির্বাচনে নৌকার ভোট বাড়াতে তৃণমূলে কাজ করার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মানুষের মন জয় করে ভোট বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, আমি কাউকে খাওয়ায়ে দেব না, সমস্ত জরিপ হচ্ছে, সকলের খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। জনপ্রিয়তার বিচারে যে এগিয়ে থাকবেন তাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে। শেখ হাসিনা নতুন সদস্য সংগ্রহের সময় কোনোভাবেই যেন অনুপ্রবেশকারীরা প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যাপারে সবার সতর্ক থাকতে হবে। কারণ আদর্শ পরিপন্থী অনুপ্রবেশকারীরা স্বার্থ হাসিলসহ বিভিন্ন মতলব নিয়ে দলে প্রবেশ করে। স্বার্থ হাসিল শেষে তারা চলে যায়, দলের দুর্নাম করে। তাই অনুপ্রবেশকারীদের পাশাপাশি যারা অনুপ্রবেশ করাবে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না আওয়ামী লীগ। বৈঠকে সাত বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাত সাংগঠনিক সম্পাদকরা আগামী নির্বাচনে সারাদেশে দলের অবস্থান এবং সম্ভাব্য করণীয় বিষয়ে সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন। চারজন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও সম্ভাব্য করণীয় বিষয়ক বক্তব্য তুলে ধরেন।
এদিকে সূচনা বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এরা তাদের (মিয়ানমার) দেশের নাগরিক, তারা আজকে কেন অন্য দেশে উদ্বাস্তু হয়ে থাকবে? কোনো দেশের নাগরিক অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকলে সে দেশের জন্য এটা সম্মানজনক না। এটা মিয়ানমারকে উপলব্ধি করতে হবে। আজকে মিয়ানমারের যেসব নাগরিক আমাদের দেশে এসে আশ্রয় চাচ্ছে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া উচিত, ফিরিয়ে নেওয়া উচিত। তাদের জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করে দেওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইদানীং আরেকটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। মিয়ানমারে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা আরও রিফিউজি নিয়ে এসেছে। ১৯৭৮ সাল থেকে এ অঞ্চলে রিফিউজি ঢুকছে এবং আমাদের নিবন্ধিত রোহিঙ্গা যা আছে, অনিবন্ধিত তার চেয়ে বেশি। মিয়ানমারে একটা ঘটনা ঘটে আর আমাদের এখানে রিফিউজি আসে। তিনি বলেন, জাতিগত সহিংসতার জেরে নির্যাতনের মুখে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আর এসব রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রদান অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারে একটা ঘটনা ঘটল, উদ্বাস্তু হয়ে আমাদের দেশে অনেকে এলো। সবচেয়ে মানবেতর অবস্থা শিশু, নারী, বৃদ্ধদের। এটা সত্যি খুব কষ্টকর, এ দৃশ্য সহ্য করা যায় না। আমরাও দেখছি মানুষ আজ সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয়ের আশায় আসছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাদের সহযোগিতা করতে। পাশাপাশি আমরা মিয়ানমারকে চাপ দিচ্ছি যাতে তারা তাদের নাগরিকদের আমাদের দেশ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। সেটাই আমরা চাই।
দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, আমরা চাই দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে সেভাবে এগিয়ে যাক। আমরা চাই মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। এটাই ছিল জাতির জনকের স্বপ্ন। এ সময় তিনি ১৫ আগস্টের নৃশংস ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় নিহতদের কথা স্মরণ করেন। আইভি রহমানসহ সেদিন দলের জন্য প্রাণ দেওয়া ত্যাগী নেতাদের কথা উল্লেখ করেন।
আগামী নির্বাচন যথাসময়ে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ নিয়ে অহেতুক পানি ঘোলা করার সুযোগ নেই। বিএনপি যখন অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে তখন হাসি পায়। নির্বাচনের সব নিয়মকানুন যারা ভেঙে ফেলেছিল, কোন মুখে তারা সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলে? তিনি বলেন, এই দলটির (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বন্দুকের মুখে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। হ্যাঁ-না ভোটের নামে নির্বাচনের তামাশা করেছিলেন। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন এই জিয়াউর রহমান। আর বর্তমান বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালে জনগণের ভোট চুরি করে ক্ষমতায় এসে জনগণের আন্দোলনের মুখে দেড় মাসের মাথায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বিএনপি মাগুরায় এবং ঢাকায় মোসাদ্দেক আলী ফালু ও মিরপুরের উপনির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা এবং প্রহসনের নির্বাচন করেছিল। বিপরীতে আওয়ামী লীগ স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স এবং ছবিসহ ভোটার তালিকার ব্যবস্থাসহ নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিল।
তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেক নির্বাচনে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থী নির্বাচিত করেছে। এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিও তো কতগুলো জায়গায় জয়লাভ করল। সুষ্ঠু নির্বাচন যদি না হয় তবে বিএনপি জেতে কীভাবে? তিনি বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেবÑ এই স্লোগান আমরাই দিয়েছিলাম। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন নির্বাচন সংক্রান্ত সবই নির্বাচন কমিশনের হাতে থাকে। তারা যদি কাউকে বদলি করতে বলে তখন বদলি হয়। তাছাড়া হয় না। ২০১৪ সালে নির্বাচন হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন করেছে। আমাদের সরকারের আমলে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে সব স্বচ্ছভাবে হয়েছে। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে।
ভোটাধিকার জনগণের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার দল তাতে বিশ্বাস করে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে বলেই দেশের উন্নয়ন হয়েছে, মানুষ শান্তিতে আছে। বিএনপির রাজনীতিই হচ্ছে খুন, দুর্নীতি, ভোট চুরি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মানি লন্ডারিং আর লুটপাট করা। তিনি বলেন, বিএনপি জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। এই ভোট দেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেছে আওয়ামী লীগ। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সৃষ্ট দল বিএনপি যে ক্ষমতায় বসে, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে যে দলটি গঠন করা হয়েছিল সেটি হচ্ছে বিএনপি। তারা ক্ষমতায় থেকে মানুষকে যে অত্যাচার-নির্যাতন করেছে সেটা মানুষ ভুলে যায়নি। ক্ষমতায় থাকতে হত্যা, খুন, দুর্নীতি ও লুটপাটই ছিল তাদের রাজনীতি। আর বিরোধী দলে থাকতে আন্দোলনের নামে মানুষ হত্যা করেছে। জবরদখল করা, সিল মেরে বাক্স ভরা এটাই ছিল বিএনপি আমলের নির্বাচন। কিছু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কর্মকা-ের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের কিছু আঁতেল শ্রেণির সুশীলের কারণে এ দেশে জনগণের ভোটাধিকার এবং সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণœ হয়। এদের ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েস আছে কিন্তু ভোটে জেতার সামর্থ্য নেই। এদের ক্ষমতায় যাওয়ার খায়েস পূরণ করতেই অনেক সময় জনগণকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার, ভোটাধিকার হারাতে হয়। এদের কাজই হচ্ছে জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা। বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেবে না।
আগামী নির্বাচনে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ লক্ষ্যে দলের নেতা-কর্মীদের আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। বন্যা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বন্যা আমাদের দেশে আসবে; কিন্তু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে দেশের মানুষের যাতে জানমালের কোনো ক্ষতি না হয়। আওয়ামী লীগ এ ব্যাপারে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাতে পেরেছে। যখনই দুর্যোগ এসেছে আমাদের পার্টি মানুষের সেবায় এগিয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *