শহিদ জায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরীর বয়ানে একাত্তর, স্বজন হারানোর বেদনা

(ছয় বছরের সংসার। যেটুকু সময় কাছে পেয়েছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর সেই স্মৃতিগুলো শ্যামলী নাসরীন চৌধুরীর মনে অক্ষয় হয়ে আছে। এই শহিদ জায়ার জীবনকাব্য শুনেছেন ওমর শাহেদ। ছবি তুলেছেন কাকলী প্রধান।)

আলীম চৌধুরীর সঙ্গে কিভাবে দেখা?

বাবার অসুখের জন্য আমাকে মীর্জাপুরের ভারতেশ্বরী হোমসে চাকরি নিতে হয়েছিল। চাকরি করতে করতে ডা. আলীমের সঙ্গে দেখা। তিনি কুমুদিনী হাসপাতালের চিকিৎসক। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হলো। আমাকে দেখে তাঁর পছন্দ হলো। নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে সরাসরি প্রস্তাব করলেন, ‘আপনাকে আমার পছন্দ হয়েছে, বিয়ে করতে চাই। ’ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া তো মুশকিল। সময় নিয়ে আমাকে ভাবতে হয়েছে। তিনি এত ভালো মানুষ ছিলেন যে তাঁকে হোমস, হাসপাতালের সবাই পছন্দ করত। ব্যবহার খুব সুন্দর, মানুষের জন্য কাজ করতেন, সবার সঙ্গে মিশতেন। এমন একজন ভালো মানুষ এমন একটি প্রস্তাব দিলেন! সরাসরি ‘না’ বলে দিতে পারিনি। তার পরও চেষ্টা করেছি, বলেছি—এ আমার পক্ষে সম্ভব নয়, এত সাহস আমার নেই। আমার মা-বাবা অ্যালাউ করবেন না, তাঁদের বলতেও পারব না। তখন তিনি বুঝিয়েছেন, আমাকে চিঠি লিখেছেন, ‘আমি সব ম্যানেজ করব। আপনার মা-বাবা, সবাইকে ম্যানেজ করব। ’ তিনি চিঠিতে আরো লিখেছেন, ‘এখন যদি আমি বিয়ে করতে না পারি, এখানে যদি আমার বিয়ে না হয়, তাহলে আর কোথাও বিয়ে করব না। আমাকে লন্ডনে ফিরে যেতে হবে। ’ তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৪। আমি তো তাঁর অনেক ছোট ছিলাম, আমাদের বয়সের পার্থক্য ১৩ বছর। তারপর তিনি নিজেই বললেন, ‘এখন কাউকে বলবেন না। মা-বাবাকে বললে তো আপনাকে ভারতে পাঠিয়ে দেবেন। ’ তিনি বিয়ের আগ পর্যন্ত আমাকে ‘আপনি’ করে বলতেন। তাঁর ব্যবহার খুব শালীন ছিল। তিনি বললেন, ‘আমি সবাইকে মানিয়ে নিতে পারব, সে বিশ্বাস আছে। ’ তিনি জানতেন, তাঁকে দেখলে সবাই খুশি হবে। তার পরও অনেক চিন্তাভাবনা করলাম, সময় নিলাম। দেখলাম, তাঁকে ‘না’ করা যাচ্ছে না, ‘না’ করতে পারবও না। আরেকভাবে বললে তিনি এককথার মানুষ ছিলেন, তাঁর সাংঘাতিক ব্যক্তিত্ব ছিল। তাঁর দ্বারা এতই প্রভাবিত হয়ে পড়েছিলাম যে তাঁর সামনে নিজের মতামতই প্রকাশ করতে পারতাম না। ফলে আর ‘না’ করতে পারিনি। ১৯৬৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ঢাকার মগবাজারে ডাক্তার সাহেবের একমাত্র বড় বোনের বাসায় আমাদের বিয়ে হলো। তাঁর পরিবারের সবাই জানত। তবে আমার পরিবারের কেউ জানত না। আমার শ্বশুর-শাশুড়িসহ তাঁদের সবাই ছিলেন, অনেক আত্মীয়ও ছিল। আমার নাম ছিল ‘শ্যামলী দেব’, শাশুড়িই তখন আমার নাম পাল্টে রাখলেন ‘শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী’।

আলীম চৌধুরী মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন?

আমার বাবা তো অসুস্থ ছিলেন। ফলে পরিবারটিরই ভেঙে পড়ার দশা। সবাই মনমরা, টাকা-পয়সারও খুব অসুবিধা হচ্ছে। তখন আলীম আমার শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শ্বশুর তো অসুস্থ। ওর ভাইবোন সবাই তো ছোট, মা, কী করি?’ শাশুড়িমা বলেছেন, ‘বাবা, অনেক আশা করে তাঁরা তাঁদের মেয়েকে এমএ পাস করিয়েছেন। সেই মেয়েটিকেই তুমি নিয়ে এসেছ। তাঁদের দেখা এখন তোমার কর্তব্য। ’ কতটুকু উদার মা হলে এমন কথা বলতে পারেন! সেই মায়ের ছেলেমেয়েরা ভালো হবে না? তাঁদের উদারতার অনেক কাহিনী ও গল্প আছে। শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। আলীম মায়ের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে আমাকে নিয়ে ময়মনসিংহ গেলেন। সেই যে আমার মা-বাবা, ছোট ভাইবোনদের এই বাড়িতে আনলেন, তারপর এক দিনও কোথাও যেতে দেননি। বড় বোন তো পাস করে চাকরি করতেন। ছোট ভাইদের পড়ালেখা করিয়েছেন, বোনদের বিয়ে দিয়েছেন। মা-বাবা আমার এখানে ছিলেন। বাবা ছিলেন মৃত্যু পর্যন্ত। ভাই যখন বিয়ে করল, আলাদা বাসা নিয়ে চলে গেল। এই যে তিনি আমার পরিবারকে প্রতিপালন করেছেন—এই ঋণ তো শোধ হওয়ার নয়।

ডা. আলীম চৌধুরীর চেম্বার কোথায় ছিল?

তাঁর প্রথম চেম্বার ছিল ৬২/২ পুরানা পল্টনে। বিয়ের পর কিছুদিন আপার বাড়িতে ছিলাম। পরে আমরা এখানে উঠেছি। এই বাসায় তাঁর রান্নার লোক থেকে শুরু করে সব ছিল। কাজেই ভরা সংসারে এসে আমি বসেছি, কিছুই আমাকে করতে হয়নি। আমরা নিচতলায় থাকতাম। মোটে তো তিনটি রুম। তাঁর চেম্বার-বাসা একসঙ্গে ছিল। একটি বড় রুম, দুটি বেডরুম। বড়রুম পার্টিশন দিয়ে চেম্বার করেছিলেন। এক রুমে রোগীদের চোখের অপারেশন হতো, আরেক রুমে আমরা থাকতাম। তখন তিনি ঢাকায় এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁর প্রথম চাকরিটি ছিল পিজি হাসপাতালে, এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। তখন এটি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট হাসপাতাল। তারপর তিনি ঢাকা মেডিক্যালে গেলেন। এরপর আমরা ৬১/ডি আজিমপুরে সরকারি কোয়ার্টার পেলাম। তবে তাঁর চেম্বার পল্টনেই থাকল।

ব্যক্তি আলীম চৌধুরী কেমন ছিলেন?

তিনি খুব উদার ছিলেন। আমাদের ছয় বছরের বিবাহিত জীবনের অনেক স্মৃতি আছে। তিনি খুব কাজপাগল ছিলেন তো, তাই আমাকে খুব একটা সময় দিতে পারেননি। এই যে তাঁকে পাচ্ছি না, তিনি এত ব্যস্ত থাকছেন—এ নিয়ে আমার কোনো আফসোস তখনো ছিল না। ভোরে ঘুম থেকে উঠে মেডিক্যাল কলেজে চলে যেতেন, ক্লাস নিতেন। এরপর নিজে ড্রাইভ করে আমাকে স্কুল থেকে বাসায় নিয়ে আসতেন। খাওয়াদাওয়া, সামান্য বিশ্রাম সেরে সন্ধ্যায় চেম্বার করতেন। সব শেষে রাজনীতি করতেন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। মোজাফফর আহমদ, মণি সিংহ, খন্দকার ইলিয়াস, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া—এঁরা নিয়মিত আমাদের পল্টনের বাসায় আসতেন। তাঁদের গোপন বৈঠক হতো। পাকিস্তান আমলে তো এই নেতাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া ছিল। তাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকতেন। আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি ও ডা. ফজলে রাব্বি তাঁদের চিকিৎসা করতেন। ডা. ফজলে রাব্বি বয়সে ছোট হলেও তাঁরা দুজন এক ধরনেরই কাজ করতেন। এত কাজ করে ঘরে ফিরতে ফিরতে তাঁর রাত ১টা-২টা বেজে যেত। তার পরও যেটুকু সময় তাঁকে পেয়েছি, তাতেই মনে হয়েছে আমি খুশিতে ভেসে গেছি। কোনো দিন কেনাকাটার সময় তাঁর ছিল না, কিন্তু যখনই সাংসারিক বা ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে আলাপ হতো, তাঁর চেহারার দিকে তাকালেই মনে হতো, তিনি আমার খুব যত্ন করছেন। তাঁর আরো একটি গুণের কথা বলি, তিনি তো নানা জায়গায় যেতেন। যখন কেউ বলতেন, খেয়ে যান, তিনি বলতেন, ‘আমার স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে নিই। ’ তাঁরা অবাক হয়ে কারণ জানতে চাইতেন। তখন তিনি বলতেন, ‘সে আমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষা করবে। ’ তিনি আমাকে ‘শ্যামল’ নামে ডাকতেন। ফোন করে বলতেন, ‘শ্যামল, আমাকে এঁরা খেতে বলছেন, খাব? তুমি কী মনে করো?’ আমি বলতাম, হ্যাঁ, খেয়ে নাও। তিনি চেম্বার থেকে এসে পকেটের টাকাও বের করতেন না। পকেটেই পড়ে থাকত। ভিজিটের টাকা আমি হিসাব করে তাঁকে বুঝিয়ে দিতাম। নিজের কোনো জিনিস নিজে কিনতে পারতেন না, সব আমিই কিনেছি। অনেক সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এই যে বিএমএ (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন), তখন পিএমএ ছিল, তিনি তাঁর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ডাক্তারদের এই আন্দোলনেও প্রতিদিন তাঁকে যেতে হতো, কখনো আমিও সঙ্গে যেতাম। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে পিএমএর অনেক কার্যক্রম ছিল। তাঁর পরিকল্পনা ছিল, যাঁরা চাকরি করবেন, তাঁরা প্র্যাকটিস করবেন না। এটি হবে নন-প্র্যাকটিসিং জব। তিনি এর প্রবক্তা ছিলেন। এ জন্য তাঁকে অনেকের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে।

আজিমপুর থেকে আপনারা পুরানা পল্টনে ফিরে গেলেন কেন?

আলীম সাহেব ঠিক করলেন, একটি চোখের ক্লিনিক করবেন। রোগীদের চোখের অপারেশন করবেন, তাদের রাখবেন। সে জন্য ১৯৭০ সালে একটি তিনতলা বাড়ি ভাড়া নিলেন। আমরা আবার ২৯/১ পুরানা পল্টনে চলে গেলাম। এই বাড়ি থেকেই তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়িটি এখন আর নেই, অ্যাপার্টমেন্ট ভবন হয়ে গেছে। নিচতলায় তিনি ক্লিনিক করলেন। রোগীদের অপারেশন করতেন, তাদের বেড ছিল, তাঁর চেম্বারও। দোতলায় আমরা থাকতাম। তত দিনে নীপা-শম্পা হয়েছে। ভাইবোনরাও থাকে। তিনতলায় একটাই রুম। সেখানে আমার মা-বাবা থাকতেন। কিছুদিন শ্বশুর-শাশুড়ি থেকেছেন। তখন তো রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। তিনি সব কিছুতেই গভীরভাবে জড়িত, ভীষণ ব্যস্ত। অনবরত তাঁর কাছে লোকজন আসে। তাদের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করছেন। মিটিংয়ের পর মিটিং করছেন। আমি তো জানিই তিনি এসব করেন, মেনেই নিয়েছি, সমর্থন করেছি।

২৫শে মার্চের পর আপনারা ঢাকা ছেড়ে গেলেন না কেন?

আমাদের বাবা তখন খুব অসুস্থ। আর মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আলীমের একটাই কথা ছিল, ‘আমরা সবাই যদি ওপারে চলে যাই, তাহলে মুক্তিযোদ্ধাদের কে সাহায্য করবে? ওদের চিকিৎসা করতে হবে, অস্ত্র কেনার টাকা লাগবে। এগুলো এখান থেকে দিতে না পারলে ওরা কিভাবে যুদ্ধ করবে?’ ওপারে যাবেন এমন অনেককে তিনি আমাদের বাসায় আশ্রয় দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে রোগী সাজিয়ে লুকিয়ে রাখতেন। তারপর ওদের নিজে গাড়ি চালিয়ে অন্য নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিতেন। কত রকমের লোক যে আসত! সবাই কি তাঁর রোগী! তাদের তিনি অনেক টাকা চাঁদা তুলে দিয়েছেন। খালি গাড়ি নিয়ে বেরোতেন, গাড়িবোঝাই ওষুধ নিয়ে ফিরতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাহায্য চাইবেন বলে তাঁকে দেখে বন্ধুরা তাঁর মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিতেন। বলতেন, ‘ওই যে আলীম গাড়ি নিয়ে আসছে, আর্মি যদি দেখে সে আমার বাসায় আসছে, তাহলে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। ’ এমন বিপজ্জনক কাজ তিনি করতেন। কোনো কিছুর পরোয়া করতেন না। আহত মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তাঁদের চিকিৎসা করতেন। নানা ধরনের ওষুধ কিনে তাঁদের সরবরাহ করতেন। আমি তাঁদের জন্য সোয়েটার বানাতাম, চাল-ডাল সংগ্রহ করতাম। সেগুলো তাঁরা আমার কাছ থেকে নিয়ে যেতেন। তিনি শহীদ হওয়ার পর এক মুক্তিযোদ্ধা আমার কাছে এসে বলেছেন, ‘এই যে দেখেন ব্যান্ডেজ, এটি আলীম ভাই আমার চোখে পরিয়ে গেছেন। ’ ১৮ ডিসেম্বর দুজন মুক্তিযোদ্ধা বাসায় এসে আমাকে বলেছিলেন, ‘যেখানেই থাকুন, আলীম ভাইকে আমরা খুঁজে বের করব। ’ তাঁরা তাঁকে খুঁজতে গিয়ে আর ফেরেননি। ওরা তাঁদের মেরে ফেলেছে। একজনের নাম কবীর, অন্যজন অবজারভারের সম্পাদক আবদুস সালাম সাহেবের ছেলে।

মাওলানা আবদুল মান্নান কিভাবে আপনাদের বাড়িতে এলেন?

সে এলো জুলাইয়ের মাঝামাঝি। আমাদের পাশের বাসায় পিডিপির (পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি) মতিন থাকতেন। তিনি আমার স্বামীকে নানা বলে ডাকতেন, খুব শ্রদ্ধা করতেন। একদিন তিনি তাঁর কাছে একজন লোক নিয়ে এলেন। ওপর থেকে ভয়ংকর চেহারার লোকটিকে দেখেই এক অজানা আশঙ্কা আমার ভেতরে তৈরি হলো। কেন যে খুব ভয় পেলাম, বুঝতে পারিনি। দেখলাম, আলীম ওপরে এসে বললেন, ‘মতিন সাহেব একজন ভদ্রলোককে নিয়ে এসেছেন, তিনি খুব বিপদে পড়েছেন। কারা তাঁর ঘরবাড়ি সব পুড়িয়ে দিয়েছে, পরিবার নিয়ে রাস্তায় বসে গেছেন। তাঁর বাড়ি চাঁদপুরে। একটু আশ্রয় চাইছেন। বলেছেন, দু-এক দিন পরই চলে যাবেন। ’ তখন আমার শ্বশুর-শাশুড়ি, আমার মাও ছিলেন। শুনেই আমি চিত্কার করে উঠলাম—অসম্ভব, যাকে চিনি না, তাকে এ অবস্থায় আমরা জায়গা দেব না। তখন তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। ’ এই বলে নিচে নেমে গেলেন। ওরা তাঁর হাতে-পায়ে ধরে বলল, ‘আপনার তো ঘর খালিই আছে। দুই দিনের জন্য হলেও আশ্রয় দিন। ’ এমনভাবে অনুরোধ করল যে তিনি আর ফেলতে পারলেন না। আবার ওপরে উঠে এসে শাশুড়িকে বললেন, ‘তোমার বউমা তো ওর কথা শুনতেই চাইছে না, কিন্তু ওরা তো বিপদে পড়ে এসেছে। ’ শাশুড়ি আমাকে ডেকে বললেন, ‘বউ, এত মানুষকে আশ্রয় দিচ্ছ, আবার নিরাপদে যেতেও দিচ্ছ, এই লোকটি কী দোষ করল? এত রাগ করছ কেন?’ শাশুড়ি বলায় চুপ করে গেলাম, কিন্তু কেন যেন কান্না পাচ্ছিল, থামাতে পারছিলাম না। এই ভয়ংকর লোকটিকে জায়গা দিতে হচ্ছে বলে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল।

এরপর তো তিনি পরিবার নিয়ে উঠে গেলেন?

সে তিন ছেলে, এক মেয়ে আর স্ত্রীকে নিয়ে নিচতলায় উঠল। ফাঁকা ক্লিনিকের পুরো একটি তলা তাকে আমরা ছেড়ে দিয়েছিলাম। কোনো রোগী ছিল না, চেম্বার আলীম দোতলায় নিয়ে এসেছিলেন। ক্লিনিকে তো খাট, বিছানা—সবই ছিল। তিন-চার দিন তাদের খাওয়াদাওয়া পাঠালাম। তবে তাকে এত ভয়ংকর লাগছিল যে নিচে যাইনি। ওর সঙ্গে কথাই বলতাম না। তারপর দেখি, ওরা আর যাচ্ছে না। সে কোনো পরিচয়ও দেয়নি। শুধু নাম বলেছে, মাওলানা আবদুল মান্নান। কয়েক দিন পর টের পেলাম, তার সঙ্গে আর্মির যোগাযোগ আছে। ওদের গাড়ি আসে। আরো কিছুদিন পর দেখি, অ্যাশ কালারের প্যান্ট, নীল শার্ট পরে আলবদররা অস্ত্র হাতে তার বাসা পাহারা দেয়। আমাদের আলাদা গেট ছিল। বিবিসি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনে তত দিনে আলবদরদের পরিচয় জেনেছি। ওরা দল বেঁধে দিনরাত ওর, আমাদের গেট পাহারা দেয়। এসব দেখে আলীমের মনে প্রশ্ন জাগল। মান্নানকে জিজ্ঞেস করার পর সে বলল, ‘আমি আলবদরদের অর্গানাইজার, এরা আমার আলবদর ছাত্র। ’ আলীম বললেন, ‘ওরা আপনার গেট পাহারা দেয়, ঠিক আছে, কিন্তু আমার গেটে কেন?’ সে বলল, ‘মুক্তিযোদ্ধারা তো আপনার গেট দিয়ে ঢুকেই আমাকে মারবে। ওরা আমাকে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে চিঠি দিয়েছে, আলীম ভাই ওপরে না থাকলে কবেই তোকে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতাম। ’ এসব দেখে আলীম, আমরা খুব ঘাবড়ে গেলাম। অক্টোবরে আলীমকে রাজশাহী মেডিক্যালে চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে চলে যেতে হলো। আগেই বদলি করেছিল, কিন্তু তিনি ছুটি নিয়েছিলেন। পরে অর্ডার এলো, না গেলে তোমার কোর্ট মার্শাল হবে। তিনি চলে গেলেন। অনেক চেষ্টা করে ৩ নভেম্বর আবার ঢাকায় বদলি হয়ে এলেন।

১৫ ডিসেম্বর কী হয়েছিল?

দুপুর থেকে বারান্দায় বসে দেখলাম, ভারতীয় মিগ বোমা ফেলছে। বিজয় এগিয়ে আসছে বলে আমরা খুব খুশি। আলীম হো হো করে হাসছেন, আমাকে বলছেন, ‘দেখো, বিজয়ের আর বেশি বাকি নেই। ভারতীয়রা এমনভাবে বোমা ফেলছে যে মনে হচ্ছে আকাশটা ওদের। মাওলানারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। ওরা ভাবছে, ওদের আমেরিকা বাবা এসে ওদের বাঁচাবে। ’ এসব বলছেন আর তিনি, আমি, আমার মা হাসছেন। তখন কারফিউ চলছে। এর মধ্যে হঠাৎ গাড়ির শব্দ শুনলাম। তাকিয়ে দেখি, মাটি দিয়ে লেপা একটি মাইক্রো এসে মান্নানের গেটে থামল। আলীমও দেখলেন। আমাকে সাবধান করে বললেন, ‘আর উঁকি দিয়ো না, ভেতরে চলে যাও। ’ আমরা ভেতরে চলে গেলাম। তিনি বাথরুমে গেলেন। কারফিউ হলে আমাদের গেটে তালা দিয়ে রাখতাম। গেটে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছে। ঘাবড়ে গেলাম। ওর অ্যাসিস্ট্যান্টরা কী করবেন জিজ্ঞেস করলেন। আমিও আলীমকে কী করব জিজ্ঞেস করলাম। ভয়ে তাঁর মুখ শুকিয়ে গেল। এমন বিপদে আমরা কোনো দিন পড়িনি। তিনি বললেন, ‘খুলে দাও। ’ বলে দৌড়ে তিনি মান্নানের কাছে গেলেন। পেছন থেকে বললাম, কোথায় যাচ্ছ? তিনি বললেন, ‘মান্নানের কাছে, তিনি বলেছেন কেউ এলে যেন তাঁর কাছে যাই। তিনি রক্ষা করবেন। ’ কিন্তু যে দরজাটি সব সময় খোলা থাকে, সেদিন সেটি বন্ধ। তিনি বারবার ডাকছেন, ‘মাওলানা সাহেব, দরজা খুলুন। ’ আমরা সবাই শুনছি, বারবার তিনি দরজা ধাক্কাচ্ছেন। মান্নানের ছেলেরাও শুনেছে। ওরা পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। তবে মান্নান দরজা না খুলে একটু ফাঁকা করে বলল, ‘আপনি যান, আমি আছি, আমি দেখব। ’ তিনি ওপরে উঠতে লাগলেন, ওরা ভেতরে ঢুকে বলল, ‘হ্যান্ডস আপ। ’ আমি সিঁড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে, তিনি নিচে। তাদের গায়ে আলবদরের পোশাক। আলীম বললেন, ‘কী ব্যাপার?’ তারা তাঁর নামটিও জানতে চাইল না, শুধু বলল, ‘আমাদের সঙ্গে চলুন। ’ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন?’ ওরা বলল, ‘গেলেই জানতে পারবেন। ’ ‘কাপড় পরে আসি। ’ ‘তার দরকার হবে না। ’ তিনি লুঙ্গি পরা, গায়ে শার্ট। সেই অবস্থায়ই তাঁকে নিয়ে গেল। অ্যাসিস্ট্যান্টরা ওপরে এসে আমাকে বললেন, ‘বেগম সাহেবা, সাহেবকে তো ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ’ আমি দৌড়ে গিয়ে দেখলাম, মাওলানার দরজা খোলা।

মাওলানা আবদুল মান্নানকে কি অনুরোধ করলেন?

তাকে গিয়ে বললাম, আমার স্বামীকে কারা যেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে, আপনি একটু দেখেন। সে কোনো কথা বলেনি। সোফায় বসে ছিল। আবার বললাম, মান্নান সাহেব, আমার স্বামীকে তো ধরে নিয়ে যাচ্ছে। সে কিছুই বলছে না। গাড়ি স্টার্টের শব্দ পেলাম, তারা চলে গেল। তখন সে বলল, ‘আপনি ঘাবড়াবেন না। আমার ছাত্ররা তাকে নিয়ে গেছে। ’ কেন নিল? ‘চারদিকে কেমন বোমা ফেলা হচ্ছে দেখছেন না? আহতদের চিকিৎসার জন্য তাঁকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাচ্ছে। ’ এরপর সে নিজেই বলল, ‘ওরা ডা. ফজলে রাব্বিকেও নিয়ে গেছে। ’ কখন দিয়ে যাবে? ‘চিকিৎসা হলেই দিয়ে যাবে।’

এরপর কী করলেন?

দৌড়ে ওপরে উঠে মিসেস রাব্বিকে ফোন করলাম। খুব কাঁদছেন, জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওরা কি আর ফিরবে?’ শুনেই ভয় লেগে গেল। টেলিফোনটিও বিকল হয়ে গেল, যাতে আর কোনো ফোন করতে না পারি। মনে হলো, মান্নানেরই কারসাজি। আবার ওর কাছে গেলাম। বললাম, আমার স্বামী তো শীতের কাপড়ও নেননি। আমি শীতের কাপড় দিতে চাই। তিনি কোথায় আছেন? একটু ফোনে কথা বলতে চাই। সে বলল, ‘এখন তো ফোনে কানেকশন নেই, ফোনে পাবেন না। ’ তার পরও অনুরোধ করার পর বিরক্ত হয়ে বলল, ‘চলেন, আপনাকেও আপনার স্বামীর কাছে দিয়ে আসি। ’ খুশিতে ওপরে কাপড় আনতে গেলাম। মা শুনে বললেন, ‘রাত হয়ে গেছে। ছোট দুটি বাচ্চা রেখে তুমি যেতে পারো না। ’ তিনি বয়স্ক মানুষ, সব বুঝতে পেরেছিলেন। মন খারাপ করে সারা রাত আলীমের জন্য অপেক্ষা করেছি। এভাবে সকাল ৮টা বেজে গেল। সবাই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছে। বুঝলাম, পাকিস্তান আর্মি হেরে গেছে। মনে হলো, আমার আলীমকে তো আর আটকে রাখতে পারবে না। একটু পরে মুক্তিযোদ্ধারা বাসায় এলেন। তাঁদের হাতে বন্দুক। তাঁরা বললেন, ‘যে আলীম ভাইকে মেরেছে, সেই শয়তানটি কোথায়?’ সে তখন পালিয়ে গেছে।

আবদুল মান্নানকে পরে আর গ্রেপ্তার করা যায়নি?

আলীম শহীদ হওয়ার তিন-চার দিনের মধ্যে হাফিজ এবং আরো কয়েকজন মান্নানকে খুঁজে বের করেছিলেন। আজিমপুরের একটি বাসায় তাকে পাওয়া গিয়েছিল। তাকে ধরে রমনা থানায় দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সাত দিনের মধ্যে কিভাবে বেরিয়ে গেল, জানি না। পরে আবার মুক্তিযোদ্ধারা তাকে আটক করে থানায় দিয়েছিলেন। সে যে অনেক লোককে মেরেছে, এটি তাঁরা জেনে গিয়েছিলেন। মাস ছয়েক সে জেলও খেটেছে। তবে আবার সে বেরিয়ে এসেছিল। আমি বক্তৃতায় তার কথা বলতাম। শুনেছি, সে লোকজনের কাছে বলেছে, কোনো দিন সে নাকি একটি পাখিও মারেনি। তবে কোনো দিন আমার মুখোমুিখ হওয়ার সাহস তাঁর হয়নি।

ডা. আলীম চৌধুরীর মরদেহ কবে পাওয়া গেল?

১৮ ডিসেম্বর আলীমের লাশ পাওয়া গিয়েছিল। আমাদের বাসায় তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হয়েছিল। আমি দেখেছি, তাঁর বুকে অনেকগুলো গুলির গর্ত, হাত পেছনে বাঁধা, শরীরটি বেয়নেটে খোঁচানো, চোখে গামছা বাঁধা, হাতে ঘড়িটিও নেই। সব নিয়ে গেছে। তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হলো। অসংখ্য মানুষ তাঁর জানাজায় এসেছিল। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ‘শহীদ আলীম চৌধুরী’ নামে একটি হল হয়েছে। একাত্তরের বীর ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে এ দেশের মানুষ তাঁকে সম্মান করে।

আলীম চৌধুরী মারা যাওয়ার পর আপনাদের ভয়াবহ দুর্যোগ গেছে।

আলীম মারা যাওয়ার আগে-পরে এই পরিবারে ছয়-সাতটি মৃত্যু হয়েছে। প্রথমে তাঁদের একমাত্র বোনের স্বামী, ডিআইটির চিফ অডিট অফিসার ক্যান্সারে মারা গেলেন। তিনিও আমাকে খুব ভালোবেসেছেন, আদর করেছেন। আমাদের জীবনে তাঁরও অনেক অবদান আছে। কয়েক দিন পর ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ মারা গেলেন শ্বশুর। ১৯৭১ সাালের ১৫ ডিসেম্বর, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে আলীম চৌধুরী নিজে শহীদ হলেন। ১৬ ডিসেম্বর সকাল ৮টার দিকে আমরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিলাম। আগের দিন বিকেল ৪টায়, মাত্র ১৬ ঘণ্টা আগে আলীম শহীদ হলেন। কিছুদিন পর তাঁর একমাত্র ছোট ভাই হাফিজ চৌধুরীর স্ত্রী সন্তান প্রসবের সময় মারা গেলেন। সেই মাতৃহারা শিশুটিকে আমি মানুষ করতে নিয়েছিলাম। কয়েক মাস পর সে মারা গেল। তারপর তো আমার বাবা মারা গেলেন। টানা সাড়ে তিন বছর ধরে একের পর এক স্বজন হারানোর বেদনায় আমরা খুবই বিপর্যস্ত ছিলাম। এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা! শাশুড়ি পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। আমার দুটি শিশুসন্তান, হাফিজের শিশুসন্তানকে নিয়ে আমি তখন দিশাহারা। শাশুড়ি, ননাশ চিন্তা করছিলেন, এই শিশুদের কী হবে? ওদের কে দেখবে? তখন তাঁরা ঠিক করলেন, হাফিজের তো বউ নেই, ওর সঙ্গে শ্যামলীর বিয়ে দিয়ে দিই। না হলে এই শিশুদের দেখাশোনার কেউ থাকবে না, ওদের মানুষ করা যাবে না। আপনজন হারানোর বেদনায় তখন আমরা খুব কষ্টে আছি। তার মধ্যে এই প্রস্তাব? হাফিজেরও কষ্ট হয়েছে, আমারও হয়েছে। আমরা দুজনেই এটি মেনে নিতে পারিনি। হাফিজ রাগ করে আজমির শরিফ চলে গেলেন। আমিও এই বাসায় আসিনি। তার পরও শাশুড়ি, মা—সবাই মিলে চাপ দেওয়ায় রাজি হতে হলো। প্রথমে বুঝিনি, রাগ করেছি, কিন্তু পরে বুঝলাম, শাশুড়ির সিদ্ধান্তই ঠিক। তবে হাফিজ চৌধুরীও মানুষ হিসেবে খুব ভালো ছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, আমি যে সব জায়গায় নিজেকে ডা. আলীম চৌধুরীর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিই, এ ব্যাপারে তুমি কী বলো? তিনি বলেছিলেন, ‘আমার টুনু (আলীম চৌধুরীর ডাকনাম) ভাইয়ের কথা তুমি না বললে কে বলবে?’ হাফিজ চৌধুরী ২০১৩ সালে মারা যান।

বিয়ের পর কি কুমুদিনীর চাকরি ছেড়ে দিলেন?

বিয়ের পর সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। তারপর আলীমের এক বন্ধুর বোনের মাধ্যমে ১৯৬৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি উদয়ন স্কুলে সহকারী শিক্ষক পদে যোগ দিলাম। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর থেকে ‘এমএড’ পাস করলাম। তখন অবকাঠামোগত অবস্থা খারাপ হলেও স্কুলের ফল খুব ভালো হতো। স্বাধীনতার পর এর নাম হলো ‘উদয়ন বিদ্যালয়’। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কুলের জন্য জমি দিল। ওখানে ভবন তৈরি করা হলো। আস্তে আস্তে ওপরের ক্লাস হলো, সমাজবিজ্ঞান, সমাজপাঠ পড়াতাম। নবম-দশম শ্রেণিতে বাংলা পড়িয়েছি। (ফয়সল আরেফিন) দীপন মারা গেছে, ও আমার ছাত্র ছিল। ফেরদৌস আরা, তারানা হালিমও আমার ছাত্রী। উদয়ন তো খুব নামকরা স্কুল, আমার অনেক বিখ্যাত ছাত্রছাত্রী আছে। আট বছর সহকারী শিক্ষক, ১১ বছর সহকারী প্রধান শিক্ষক ছিলাম। ১৯৬৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে দু-তিন বছর বাদে এই স্কুলেই তো জীবনের ৩৬ বছর কাটল। বেসরকারি স্কুল উদয়নকে আমি কলেজ করেছি। তখন আমি প্রধান শিক্ষক ছিলাম। কলেজের অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় ২০০১ সালে একুশে পদক পেয়েছি।

উদয়ন ছাড়তে হলো কেন?

২০০২ সালের জুলাইয়ে খালেদা-নিজামী সরকার আমাকে বের করে দিল। তার আগে আমার সময়ে এটি শ্রেষ্ঠ স্কুল হয়েছিল। সেই সরকার বলল, আমি নাকি রাষ্ট্রদ্রোহী। ব্যারিস্টার হায়দার স্কুল কমিটি ভেঙে দিয়ে একটি অ্যাডহক কমিটি করলেন। কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জামায়াতি কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন, ব্যারিস্টার হায়দার বিএনপিপন্থী। যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন চলছিল, সেটির সঙ্গে আমি জড়িত ছিলাম। আসলে এ জন্যই তাঁরা আমাকে টার্গেট করেছিলেন। এই দাবিতে কথা বলেছি, বক্তৃতা দিয়েছি। উদয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হিসেবে নয়, শহীদ বুদ্ধিজীবীর স্ত্রী হিসেবে ১৯৭২ সাল থেকে এই দাবিতে আমি, আমরা সোচ্চার ছিলাম, আছি। বুদ্ধিজীবীদের তো তারাই হত্যা করিয়েছে। আলবদর বাহিনীর প্রধান নিজামীই তো আমার স্বামীকে হত্যা করিয়েছে। যখন টিভিতে স্বামী সম্পর্কে বলতে হতো, আমি তাদের বিরুদ্ধে বলতাম। এসব কারণে তারা বুঝেছে, আমি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল, আমাকে বের করতে হবে। একদিন তারা মিটিং করে এসে আমাকে বলল, ‘আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, আপনি রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করেছেন। আপনি এখানে থাকতে পারবেন না। এক ঘণ্টার মধ্যে আপনাকে চলে যেতে হবে। ’ বললাম, কী রাষ্ট্রদ্রোহ করলাম? যারা এসেছিল, তাদের প্রত্যেকের কাছে ফাইল, তারা ফাইলের ভেতর থেকে পেপার কাটিং বের করল, সেগুলোতে আমার ছবি। গণধর্ষিতা পূর্ণিমার ধর্ষণকারীদের বিচারের দাবিতে আমি সোচ্চার। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর সংখ্যালঘুদের ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে। সেগুলোরই একটি পূর্ণিমার গণধর্ষণ। পূর্ণিমাকে নিয়ে আমরা সভা, সংবাদ সম্মেলন করেছি। সে খবর পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, ওরা দেখাল। বলল, আপনি পূর্ণিমাকে সাহায্য করেছেন। তখন বললাম, পূর্ণিমাকে সাহায্য করা তো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, এটি কিভাবে রাষ্ট্রদোহ হলো? তারা বলল, এই সরকারের কাছে পূর্ণিমাকে সাহায্য করাই রাষ্ট্রদ্রোহ। তারপর তারা আরো কয়েকটি কাটিং দেখাল। সবগুলোতে হলুদ মার্কার দিয়ে দাগ দেওয়া। জামায়াত-বিএনপি সরকার তখন মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবিরকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁদের নামে অভিযোগ, ময়মনসিংহে সিনেমা হলে তাঁরা বোমা মেরেছেন। এই মিথ্যা অভিযোগের বিপক্ষে আমি মানববন্ধন করেছি। তারা বলল, আপনি শাহরিয়ার কবিরের পক্ষে মানববন্ধন করেছেন, এটিও সরকারের বিরুদ্ধে গেছে, আপনি সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করেছেন। এসব বলে আমাকে বলল, আপনি চাকরি থেকে রিজাইন দেন। বললাম, আপনারা যা কিছু করতে চান করেন, আমি নিজে রিজাইন দেব না। কারণ রিজাইন দেওয়ার মতো কোনো কাজ আমি করিনি। তখন তারা নিজেরাই লিখল, আপনার চাকরি আর নেই। চাকরি থেকে আপনাকে অপসারণ করা হলো। আপনার জায়গায় অমুককে নিয়োগ দেওয়া হলো। আমাদেরই এক শিক্ষক, তিনি যে জামায়াতের পক্ষের লোক ছিলেন, বুঝিনি। তাঁকে দায়িত্ব হস্তান্তর করে, চাবি দিয়ে চলে এলাম। সেই অপসারণপত্রে আমি, আমার স্থলে যে শিক্ষক দায়িত্ব নিলেন তিনি এবং ব্যারিস্টার হায়দার স্বাক্ষর করলেন। ব্যারিস্টার হায়দার তখন ঢাকার প্রশাসনিক কমিশনার। ২০০২ সালের ১ জুলাই ৩৬ বছরের কর্মক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে এলাম।

আপনার আমলে উদয়নের কী কী উন্নতি হয়েছে?

আমার আমলে উদয়ন শ্রেষ্ঠ স্কুল হয়েছে। যখন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলাম, টানা ১১ বছর শতভাগ ছাত্রছাত্রী প্রথম বিভাগে পাস করেছে। কোনো দ্বিতীয়, তৃতীয় বিভাগ বা ফেল ছিল না। এ নিয়ে সচিবালয় থেকে ইন্সপেকশন হলো। তারা এসে বলল, এটা কী করে হয়? তখন আমি আমার টেবুলেশন শিট দেখিয়েছি। এখনো লোকে বলে, আপনার সময় উদয়ন স্বর্ণযুগে ছিল। টানা ১৪ বছর আমি প্রধান শিক্ষক ছিলাম, উদয়নের কলেজও তো আমার করা।

কেন উদ্দীপন করতে গেলেন?

আমি উদয়ন ছেড়ে আসার পর উদয়নের জামায়াতি শিক্ষকরা এতই ক্ষমতাবান হয়ে গেলেন যে তাঁরা সবার সঙ্গেই দুর্ব্যবহার শুরু করলেন। যাঁরা আমার আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন, আমার সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের প্রত্যেকে অত্যাচারিত হলেন। আমি, শিবানী দাস ও এডলিন মালাকার খুবই ক্লোজ ছিলাম, এখনো আছি। তাঁরা সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। দুর্ব্যবহারের ফলে তাঁরা স্কুল থেকে বেরিয়ে এলেন। তখন আমরা তিনজন বসে ঠিক করলাম, একটি স্কুল করব। আমাদের তো টাকাপয়সা ছিল না। তবুও এক লাখ করে তিনজন তিন লাখ টাকা সংগ্রহ করলাম। এই স্কুলটি আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে প্রতিষ্ঠিত করেছি। উদয়ন তো নিজে প্রতিষ্ঠা করিনি। সেখানে আমার ভাবনা বাস্তবায়নের সুযোগও কম ছিল। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে ১/৪ ব্লক-বি, লালমাটিয়ায় একটি দোতলা বাড়ি ভাড়া নিলাম। ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে আমাদের উদ্দীপন বিদ্যালয় চালু হলো। এখানে আমরা উদয়নের মোট ১০ জন শিক্ষক কাজ শুরু করলাম। শুরুতে প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ছিল। এখন দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এই স্কুলের জন্য আমাকে অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে। বাড়ি খোঁজা থেকে শুরু করে সবই করতে হয়েছে। শুরু থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, বেতন কম নেব। কারণ ছেলেমেয়েদের হাজার হাজার টাকা খরচ করে পড়াতে অভিভাবকদের অনেক কষ্ট হয়। ডোনেশন, সরকারি অনুদান—কোনো কিছুই নিইনি। ফলে এখনো আমার স্কুলের টাকা নেই। কোনো অফিস স্টাফও রাখতে পারিনি, নিজেরা সব কাজ করি, কিন্তু আমার স্কুলের মান খুব ভালো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে লালমাটিয়ায়ই মোহাম্মদপুর থানার পেছনে স্কুলের জন্য পৌনে ১২ কাঠা জমি দিয়েছেন। এখনকার হুইপ মাহবুব আরা গিনি এই জমি পেতে আমাদের খুব সাহায্য করেছেন। অনেকবার তাঁকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, নানা জায়গায় যেতে হয়েছে। আমাদের নকশা রাজউক থেকে পাস হয়ে গেছে। এখানে আমরা সাততলা স্কুল ভবন করব, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত থাকবে। একে একটি ভালো স্কুলে পরিণত করব, সেই চেষ্টায় আছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *