শহীদ সাগর- যে সাগর রক্তের বিনিময়ে এসেছিলো বাংলার স্বাধীনতা

এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলবোনা!!
ঠিক এমনি এক সাগর আমি দেখেছি। ঠিক এমনি এক সাগরের ঠিকানা জানি আমি। রাজশাহী বিভাগের নাটোর জেলায় উত্তরবঙ্গ চিনিকল বা গোপালপুর স্যুগারমিল এর অফিসার্স কলোনির মাঝে বয়ে চলেছে সে লোহিত স্রোতধারা। নীল সাগরের স্বচ্ছ শীতল জলের বদলে প্রবাহমান সেথায় শহীদের লাল রক্ত স্রোতস্রিনী।।
যে রক্তধারায় প্রবাহিত এ সাগর, সে শত শহীদদের নাম গাঁথা রয়েছে সেথায় এক খন্ড প্রস্তর ফলকে। পাষান ফলক নীরবে সয়ে যায় সেই শত শহীদের বুকফাঁটা আর্তনাদ। পাষান চোখে চেয়ে চেয়ে দেখে প্রতি বছর ৫ই মে শহীদদের স্মরণে সেথায় আগত তাদের প্রিয়জন, স্বজনদের নীরব অশ্রুমোচন।

গোপালপুর গণহত্যা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা সংঘটিত অন্যতম এক গণহত্যা। এই গণহত্যার প্রাণ দিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গ চিনিকলে কর্মচারীরা।

১৯৭১ এর ৫ই মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নাটোর জেলার গোপালপুরে পৌছে দখল করে ফেলে গোপালপুর চিনিকল। চিনিকলের প্রায় ২০০ কর্মচারীদেরকে জড়ো করে সেথায়। মুক্তিযোদ্ধা নেতা অবসরপ্রাপ্ত লে. আনোয়ারুল আজিম যিনি ছিলেন সে সময়ের স্যুগারমিলের ব্যাবস্থাপক। সেনাবাহিনীর হাতে ধরা দেন তিনি এবং অনুরোধ করেন যেন নিরীহ লোকজনকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু পাকী সেনারা লে. আজিমের কথায় কর্ণপাত করেনি। লে. আনোয়ারুল আজিমসহ বন্দী কর্মচারীদের চিনিকলের ভিতরে একটি পুকুরের সামনে লাইন করে দাঁড়া করানো হয় এবং তারপর……….

পাকিস্তানী সৈন্যদের গগণবিদারী ব্রাশফায়ারে ধরায় লুটিয়ে পড়ে একের পর এক বাংলা মায়ের শান্তিপ্রিয় সন্তানেরা। গুলিবিদ্ধ হয়েও প্রায় ২০০ জন মানুষের মাঝে মাত্র কয়েকজন প্রাণে বেঁচে যান। তাদেরই একজন প্রত্যক্ষদর্শী খন্দকার জালাল আহমেদের সাক্ষাৎকার—

“১৯৭১ সালের ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় দায়িত্ব পালন করছিলাম। দুজন পাকিস্তানি সেনা আমার দুই পাশে এসে দাঁড়াল। একজন পিঠে রাইফেল ঠেকিয়ে বলল, ‘ইয়ে বাঙালি, মিটিং মে চল’। এ সময় মাথায় সাদা রুমাল বাঁধা মঞ্জুর ইমান নামের একজন অবাঙালি কর্মচারী বাঙালিদের শনাক্ত করে দিচ্ছিল। এর মধ্যে মিলের কর্মকর্তা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট আনোয়ারুল আজিমকেও ধরে আনা হয়। একজন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা আজিমকে বলে, ‘কিসনে মেজর আসলামকে মারা হায়’? তিনি বলেন, জানি না। আজিম এ সময় হানাদারদের সঙ্গে তর্ক শুরু করেন। পরে নরপশুরা আমাদের মিলের অফিসার্স কোয়ার্টারের পুকুরঘাটে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘাতকদের ১৩টি স্বয়ংক্রিয় এলএমজি একসঙ্গে আমাদের ওপর গর্জে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে পুকুরঘাট লাশের স্তূপে পরিণত হয়। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন মিলে কর্মরত প্রায় ২০০ শ্রমিক কর্মকর্তা-কর্মচারী। মৃত্যু নিশ্চিত করতে আমাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে পানির মধ্যে গড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনারা। একসময় জ্ঞান ফিরে পেয়ে দেখি, আমার মাথাটা ঘাটের ওপর এবং দেহের অর্ধেক অংশ পানির মধ্যে ডুবে আছে। লাশের স্তূপের মধ্যে উল্টে-পাল্টে জীবন্ত কাউকে খুঁজছিলেন আমার সহকর্মী মেহমান আলী। বুঝলাম, তিনিই আমাকে লাশের স্তূপ থেকে উদ্ধার করেছেন। বহু কষ্টে উঠে বসতেই দেখতে পেলাম, পাশে পড়ে আছে ছোট ভাই মান্নানের লাশ। হত্যার আগে ও আমাকে পালিয়ে যেতে বলেছিল।”

এ রিপোর্টে আরো বলা হয়,
“জালাল আহমেদ জানান, ব্রাশফায়ারের আগ মুহূর্তে মান্নান নামের মিলের এক হিসাব সহকারী শায়িত অবস্থায় মাথাটা সামান্য উঁচু করে পবিত্র কোরআন পাঠ করছিলেন। তাঁকে দেখে হানাদারেরা বলে, ‘তুম মৌলবি হু? ছোড় দাও।’ তখন তিনি বলেন, ‘আমি একা যাব না। সবাইকে ছাড়।’ হানাদারেরা তখন মান্নানকে পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মিলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা পুকুরে অর্ধেক ডুবন্ত অবস্থায় কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে।”
এই গণহত্যায় মহান শহীদদের কয়েকজন হলেন, লে. আনোয়ারুল আজিম (অবঃ), সহিদুল্লাহ, গোলজার হোসেন তালুকদার, সাইফুদ্দিন আহমদ, আবুল হোসেন, আবদুর রউফ, মান্নান ভূইয়া, গোলাম কিবরিয়া, নূরুল হক, আজহার আলী, মকবুল হোসেন, আবুল বাসার, মনসুর, রহমান, সাজেদুর রহমান, ইসমাইল হোসেন, হাবিবুর রহমান, মোসাদ্দারুল হক, মোকসেদুল আলম, আঃ রহমান আমিন, মোহাম্মদ আলী, মোজাম্মেল হক, আব্দুল মান্নান, ফিরোজ মিয়া, আক্তার উদ্দিন, সোহরাব আলী, আনোয়ারুল ইসলাম, পরেশ উল্লাহ, আঃ মান্নান, কামাল উদ্দিন, আবুল কাসেম, আব্দুর রব, শামসুল হক, আব্দুল মজিদ, আবুল কালাম, নজরুল ইসলাম, আয়েজ উদ্দিন, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল, মোসলেম উদ্দিন, জহির উদ্দিন, শহীদুল্লাহ, মোঃ আলী প্রমুখ। এছাড়া আরো শহীদদের নাম পাওয়া যায়নি।
সে দিন যারা সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন তারা হলেন, মেহমান আলী, নওসাদ আলী, খন্দকার ইমাদ উদ্দিন আহম্মেদ, আব্দুল জলিল সিকদার, তোফাজ্জল হোসেন, আজের আলী প্রমুখ।

আনোয়ারুল আজিম- শহীদ সাগরে সেই বিজয়ের কান্ডারী
লেফটেন্যান্ট মো. আনোয়ারুল আজিম একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধার নাম। এই সাহসী মানুষটির জন্ম ১৯৩১ সালের ১৩ ডিসেম্বর, নওগাঁর রানীনগর গ্রামে। ম্যাট্রিক পাস করেছেন ১৯৪৯ সালে। এরপর রাজশাহী কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন। তিনি ছিলেন একাধারে সুবক্তা, গায়ক ও নাট্যশিল্পী।
তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ এমপ্লয়মেন্ট এঙ্চেঞ্জে। এরপর ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস ও গোপালপুর উত্তরবঙ্গ চিনিকলে কিছুদিন চাকরি করেন। ১৯৬৫ সালে ইন্টারন্যাশনাল লেবার ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ফুলব্রাইট স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকার মিশিগানে চলে যান। দেশে ফিরে ইপিআইডিসির নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে সিনিয়র প্রশাসনিক অফিসার পদে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে নর্থবেঙ্গল সুগার মিলে প্রধান প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। চাকরিকালীন তিনি নিযুক্ত ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্যাসরো বিভাগের অনারারি লেফটেন্যান্ট পদে।
অসহযোগ আন্দোলনের সময় উত্তরবঙ্গ সুগার মিলের চিনি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়ে মিলের শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তারা পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের অবস্থান নেন। শুরু সেখান থেকেই।
২৫ মার্চের কালরাতে গণহত্যা শুরুর পর মিলের লোকজন আরো সচেতন হয়ে ওঠে। উত্তরবঙ্গ প্রতিরোধের শলাপরামর্শে এই শলাপরামর্শ হতো মিলের ‘গেস্ট হাউসে’।
এপ্রিলের মাঝামাঝি। রাজশাহী থেকে পাকিস্তানি সেনার একটি বড় দল ঢাকা ফেরার পথে মুলাডুলী নামক জায়গায় বাধা পায়। সেখান থেকে সেনাদলটা মিলের দিকে আসতে শুরু করে। স্থানীয় লোকজন একত্রিত হয়ে মিলে আসার রাস্তার উপর ব্যারিকেড রেলগাড়ির ইঞ্জিন দিয়ে ব্যারিকেড দেয়। পাক আর্মি ব্যারিকেডের পিছনে থেমে ভারি গোলাবর্ষণ করতে থাকে। বিপরীত পাশ থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বন্দুক থেকে গুলি ছোড়ে। সে সময়ের মত পাক বাহিনী কিছু আহত সৈনিক নিয়ে পিছু হটে। মিলে বেশ কিছু রাইফেল ছিল। সেগুলো বিলি করা হয় মিলের দারোয়ান আর শ্রমিকদের মধ্যে, লাঠিসোটা নিয়েই তৈরি হলেন বাকিরা। প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন মিলে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু পরে পাকিস্তানি বাহিনীর আরো সুসজ্জিত দল সেখানে প্রবেশ করে।
আনোয়ারুল আজিম সতর্কতা হিসেবে তার মিলের হিন্দু শ্রমিকদের মিল ছেড়ে চলে যেতে বলেন এবং নিজেরা মিল থেকে আধা-মাইল দুরবর্তী নরেন্দ্রপুর ফার্মে আসেন। সেখানে তারা ১০-১২ দিন থাকেন। সেখান থেকেই পাকিস্তানী বাহিনী আনোয়ারুল আজিমকে বন্দী করে মিল চালু করার হুকুম দেয়। আনোয়ারুল আজিম মিল চালু না করার সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় মিলের বিহারী শ্রমিকরা বাঙালিদের বাড়িঘর হামলা করে ও সেখানে লুটপাট চালাচ্ছিলো। ‘৭১-এর ৫ মে আনোয়ারুল আজিম ও তার বাঙালি সহকর্মীদেরকে ৫ই মে সকালে মিল এলাকার পুকুর পাড়ে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর উদ্যত বন্দুকের সামনে তিনি অকুতোভয়ে জামার বোতাম খুলে বুক পেতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আমাকে গুলি না করে আমার একটি লোককেও গুলি করা যাবে না।’

শহীদ আজিমের এই আত্মত্যাগের জন্য ১৯৭৪ সালে গোপালপুর রেলস্টেশনের নামকরণ করা হয় আজিমনগর এবং ১৯৯৪ সালে তাঁর নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার।

১৯৭৩ সালের ৫ই মে শহীদ সাগর চত্ত্বরে লেঃ আনোয়ারুল আজিমের স্ত্রী বেগম শামসুন্নাহার স্মৃতিসৌধ উদ্বোধন করেন। শহীদ আজিমের ছেলে প্রজন্ম একাত্তরের একজন সক্রিয় কর্মী। প্রতিবছর ৫ মে শহীদদের আত্নীয়-স্বজন, মিলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় লোকজন সমবেত হন শহীদ সাগরে।

আনোয়ারুল আজিমচাচাকে কখনও দেখিনি আমি । তিনি আমার আপন চাচাও নন। দূরসম্পর্কের বাঁধনে জড়িয়ে রইলেও তার কাহিনী আমি খুব ছোট থেকে বাবা মা ও অন্যান্য পরিজনদের কাছে শুনে এসেছি। আর তার বীরত্ব ও আত্মত্যাগে শিহরিত হয়েছি বারবার।

মহান বিজয় দিবসে আনোয়ারুল আজিমসহ সকল শহীদ আত্মার প্রতি জানাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

আমরা তোমাদের ভুলবোনা!!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *