শিবনারায়ণ দাশ – বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকার প্রথম নকশা-প্রণেতা – রাগিব

সে এক অদ্ভুত সময়ের গল্প।বাতাসে তখন ঘনীভূত শ্লোগানের বুদবুদ,পিচপথে মিছিলের ক্যারাভান।ক্লাস ফাঁকি দেওয়া ছাত্রের চোখে আঁকিবুকি কেটে যায় এক দুর্বিনীত রোমান্টিসিজম – স্বাধিকার।সেই প্রমত্ত সময়-স্রোতে সওয়ার একজন দুরন্ত তরুন এক ঘুটঘুটে রাতে বসে এঁকে ফেললেন মহাকালের শ্রেষ্ঠতম ফ্রেসকো।পশ্চাদপটে তার তুমুল সবুজের আঁচল,বুকে রক্তবৃত্ত।তার মাঝে জ্বলে আছে এক খাবলা গনগনে সোনালী আগুন।রঙের এমন অগ্নিগর্ভ সংমিশ্রণ,সাথে অহংকার আর প্রতিজ্ঞার সর্বগ্রাসী আবহ – পৃথিবীতে কোনদিন কল্পনা করেনি কেউ।ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সেই চিত্রকর্মের কারিগরের নাম শিবনারায়ন দাশ,আমাদের ভুলে যাওয়া কালপুরুষ।

৭০ এর ৬ জুন,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ( বর্তমান জহুরুল হক হল ) ১১৮ নম্বর রুমে জড়ো হয়েছেন আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, মার্শাল মনি, কাজী আরেফ আহমদ,শিবনারায়ন দাশ,স্বপন কুমার চৌধুরী,হাসানুল হক ইনু,ইউসুফ সালাউদ্দিন…আরো অনেকে।পরদিন রেসকোর্স ময়দানে আসবেন বঙ্গবন্ধু।মহাকালের মহানায়ককে গার্ড অব অনার দেয়া হবে – এই নিয়ে প্রস্তুতি পরিকল্পনা জয়বাংলা বাহিনীর।উপস্থিত সভ্যগন ঠিক করলেন একটি পতাকা ওড়ানো হবে।সেই পতাকায় মাখানো থাকবে সংগ্রামের প্রত্যয়,স্বাধীনতার জন্য বুভুক্ষা।আলোচনা শুরু হল।শেষ পর্যন্ত পতাকার মূল পরিকল্পনা খসড়া করা হলো – সবুজ জমিনের উপরে একটা টকটকে রক্তাভ বৃত্ত,এর মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র।জানা গেল আঁকাআঁকিতে দারুন হাত কুমিল্লা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শিবনারায়ন দাশের।সেই রাতেই বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ৪০১ নম্বর রুমে বসে রং-তুলির ছোপে-আঁচড়ে শিবনারায়ন দাশ এঁকে ফেললেন পতাকার চূড়ান্ত ডিজাইন।ভোরের মধ্যেই নিউমার্কেটের নিউ পাক ফ্যাশন টেইলার্সের মাস্টার মালেক মোহাম্মদী সুঁই-সুতোয় বুনে দিলেন লাল-সবুজ-সোনালী বাংলাদেশের পতাকা – উদ্ধত অহংকারের বিমূর্ত প্রতিকৃতি।

পরদিন রেসকোর্সে উড়লো এই পতাকা।বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকা তুলে দিলেন আ স ম আব্দুর রব।এর আগে পতাকা নিয়ে ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে জয় বাংলা বাহিনী।১৯৭১ এর ১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলার সমাবেশে ( জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হবার পর ) আবারো উড়েছিল এই পতাকাটিই।

মিছিলের পুরনো মুখ শিবনারায়ন দাস,রাজপথের সহযোদ্ধাদের প্রিয় শিবু দা।জেল খেটেছেন ৬২ শিক্ষা আন্দোলনে,আসামী হয়েছেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ( ৩৫ জনের মধ্যে ১৭ তম ),কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আইয়ুব খানের ছবি পায়ে দলে মাথায় নিয়েছেন হুলিয়া।শিবনারায়ন দাশকে খুজতে গিয়েই কুমিল্লায় হানা দেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনী,৭১ এর ২৫ মার্চ।না পেয়ে ধরে নিয়ে যায় তার আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক বাবা সতীশচন্দ্র দাশকে,হত্যা করা নৃশংসভাবে,সে রাতেই।মাইকিং করে শিবনারায়নের মাথার দাম ঘোষণা করা হয় দশ হাজার টাকা।

স্মৃতিচারণে শিবনারায়ন বলেন,

যারা স্বাধীনতার সংগঠক ছিলেন, যারা স্বাধীনতার প্রত্যাশায় উজ্জীবিত ছিলেন, যারা সংগঠন তৈরি করেছেন, যারা গোপনে কাজ করেছেন নিজের জীবনকে বাজি রেখে, মূলত সেই সংগঠক, সংগঠন ও সেই নেতারাই পতাকা তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সে সময়ে আমার ওপর দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল পতাকা তৈরি করার। আমি পরিকল্পনা মাফিক সে দায়িত্ব পালন করেছি। আমার হাতেই পতাকা তৈরির কাজ শুরু ও শেষ হয়

মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম নেই শিবনারায়ন দাশের,এ নিয়ে আক্ষেপও নেই তার

জাতির কাছে আমার চাওয়ার কিছুই নেই। জাতি তার নিজের প্রয়োজনে অনেক কিছু করে…মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়ও আমার নাম নেই। এ নিয়েও আমার কোন আক্ষেপ নেই

১৬ ডিসেম্বর আসছে।আন্তর্জালে তুমুল উদ্দীপনা – ফেসবুক ছেয়ে যাবে লাল সবুজে।সেদিন হয়তো অনেকের মনে উঁকি দিয়ে যাবে না এই কালপুরুষের নাম।আমিও আমার একাউন্টটি মুড়িয়ে দেবো বাংলাদেশের পতাকায়,আমার গর্বে,অহংকারে,ভালবাসার আবরণে।ইমেজ সিলেক্ট করে আপলোড বাটনে ক্লিক করার আগ মুহুর্তে চোখের কোনায় হয়তো এক বিন্দু ভালবাসা চিকচিক করে উঠবে শিবনারায়ন দাশের জন্য,হয়তো উঠবে না।তাতে কী ! শিবনারায়ন দাশ,শিবু দা,আপনি ভালো থাকুন,আমাদের সব অকৃতজ্ঞতা,সব গ্লানি ক্ষমা করে আপনি ভালো থাকুন।

পাদটীকা :

১)৭ জুন ১৯৭০ তারিখে বঙ্গবন্ধুকে পল্টোন ময়দানে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।কুচকাওয়াজে নেতৃত্ব দেন আ স ম আব্দুর রব,পতাকাটি ধরে রেখেছিলেন হাসানুল হক ইনু।কুচকাওয়াজ শেষে পতাকাটি লুকিয়ে রাখেন ইনুর সহপাঠী বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ৪০৪ নম্বর রুমের শরীফ নুরুল আম্বিয়া।

২)শিবনারায়ন দাশের পতাকাটির ডিজাইনে বাংলাদেশের মানচিত্রটি আছে।এই মানচিত্রের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখন্ডটিকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া।স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শিবনারায়ন দাশের ডিজাইন কৃত পতাকার মাঝে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে পতাকার মাপ, রঙ, ও তার ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয় পটুয়া কামরুল হাসানকে। কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জিত রূপটিই বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।জাতীয় পতাকা হিসেবে মানচিত্র সম্বলিত ডিজাইনটি যুদ্ধকালীন সময়ের জন্য বহাল রাখা হয়।এ নিয়ে বিতর্কের কোন সুযোগ নেই।

৩)পাঠ্য বইগুলোতে,আন্তর্জালে বিভিন্ন লেখায় জাতীয় পতাকার নকশাকার হিসেবে কামরুল হাসানের নাম উল্লেখ করা হয়।প্রকৃত তথ্যের সাথে এই অসঙ্গতি একজন প্রথিতযশা,কীর্তিমান শিল্পীকে বিতর্কিত করে তুলতে পারে।এজন্য পুরো ইতিহাসটি বইপত্রে শুদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ করা প্রয়োজন।সম্প্রতি অবশ্য বেশ কিছু পাঠ্যবইয়ে নকশাকার হিসেবে শিবনারায়ন দাশের নাম দেখেছি,এই প্রশংসনীয় উদ্যোগ অব্যাহত থাকুক।

তথ্য সূত্র :

১)বাঙালির জাতীয় সংগ্রাম: মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম , ডা. মাহফুজুর রহমান
২) উইকিপিডিয়া
৩) শিবনারায়ণ দাশ – বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকার প্রথম নকশা-প্রণেতা , ব্লগার রাগিব
৪) স্বাধীন বাংলার পতাকার প্রথম নকশাবিদ , ব্লগার বিপ্লব রহমান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *