শোকের মাসেই চলে গেলেন মোহিতুল ইসলাম

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার বাদী এএফএম মোহিতুল ইসলাম ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি কিডনি ও ফুসফুসের রোগে ভুগছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ আগস্ট দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। মোহিতুলের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীসহ বিশিষ্টজনরা গভীর শোক জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার শোক বিবৃতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মোহিতুল ইসলামের সাহসী ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, মোহিতুল ছিলেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালরাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও নির্মম হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষদর্শী। মোহিতুল সে সময়ে ঘাতকদের হাত থেকে শেখ রাসেলকে বাঁচানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন। ঘাতকরা তার হাত থেকে রাসেলকে ছিনিয়ে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোহিতুলের মৃত্যুতে আমরা আওয়ামী লীগ এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের একজন বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠজনকে হারালাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে যখন নির্মমভাবে হত্যা করা হয় মোহিতুল তখন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী। তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা।
মোহিতুল ইসলামের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী।
চিরনিদ্রায় শায়িত
সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার বাদী এএফএম মোহিতুল ইসলাম চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন। মোহিতুল ইসলামকে তার পৈতৃক ভিটা যশোরের মণিরামপুর উপজেলার কাশিমপুর গ্রামে গত ২৬ আগস্ট বাদ জুমা পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয়। এর আগে সেখানকার সরদারবাড়ি প্রাঙ্গণে মরহুমের শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজার আগে এএফএম মোহিতুল ইসলামকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
জানাজার পর মোহিতুলের কফিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শ্রদ্ধা জানান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক ও কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন। এ সময় স্থানীয় সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
শেষ সাক্ষাৎকার : নিষ্পাপ রাসেলের কাছে মিথ্যাবাদী হয়ে রইলাম
“আমাকে জড়িয়ে ধরে শেখ রাসেল বলল, ‘ভাইয়া ওরা আমাকে মারবে না তো!’ নিষ্পাপ শিশুটিকে সেদিন আমি মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল ওরা তাকে মারবে না। কিন্তু নরপিশাচ ঘাতকরা তাকে বাঁচতে দেয়নি। মৃত্যুর আগে শিশুটি জানলো আমি একজন মিথ্যাবাদী। আমি নিষ্পাপ রাসেলের কাছে মিথ্যাবাদী হয়ে রইলাম।” ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতের ন্যক্কারজনক হত্যাকা-ের প্রত্যক্ষদর্শী ও বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বাদী আ ফ ম মোহিতুল ইসলাম এভাবেই নিজের ভেতরে চেপে রাখা কষ্টের কথা প্রকাশ করেছিলেন ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি। সেই সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘সেই ঘাতকদের ফাঁসির আদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। ঘাতকদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। এই রায়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ রাসেলের আত্মা শান্তি পাবে। আমিও শান্তিতে ঘুমাতে পারব। আজ আমি একজন সফল মানুষ।’
দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী বর্তমান আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের চেম্বারে দেওয়া শেষ সাক্ষাৎকারে মোহিতুল ইসলাম এসব কথা বলেছিলেন। কথাগুলো বলার সময় তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়েছিল।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যে কজন বেঁচে যান তাদের একজন মোহিতুল ইসলাম। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় মোহিতুল ছিলেন তার রিসিপশনিস্ট কাম রেসিডেন্ট পিএ।
ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর সেদিনই ৩২ নম্বরে রাষ্ট্রপতির বাসভবন থেকে মোহিতুল ইসলামকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আটক অবস্থায়ই তাকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালের একজন কর্মচারীর সহায়তায় তিনি পালাতে সক্ষম হন। জানালা ভেঙে হাসপাতালের বিছানা থেকে পালিয়ে সোজা গ্রামের বাড়ি যশোর চলে যান তিনি। সেখান থেকে আবার তাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় গণভবনে ইন্টারগেশন সেলে দুই দিন আটক রেখে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ওই অবস্থায় তার এক আত্মীয় সেখান থেকে তাকে ছাড়িয়ে নেন। কয়েক দিন পর তিনি আবার তার চাকরিতে যোগ দেন।
চাকরিরত অবস্থায় মোহিতুল ১৯৭৬ সালের ২২ অক্টোবর লালবাগ থানায় গিয়েছিলেন মামলা করতে। এ প্রসঙ্গে মোহিতুল ইসলাম বলেন, “বিবেকের তাড়নায় মামলা করতে যাই। কিন্তু সেদিন থানার ডিউটি অফিসার মামলা না নিয়ে উপরন্তু চড়-থাপ্পড় মেরে আমাকে থানা থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। সেদিন তিনি (ডিউটি অফিসার) আমাকে বলেছিলেন, ‘তুইও মরবি, আমাদেরও মারবি।’ আজ তার সঙ্গে দেখা হলে কৃতজ্ঞতা জানাতাম। জানি না তিনি বেঁচে আছেন কি-না। সেদিন আমাকে থানা থেকে বের করে দেওয়াটাই আমার জন্য আশীর্বাদ ছিল। কারণ সেদিন মামলাটি গ্রহণ করলে হত্যার সুষ্ঠু বিচার পেতাম না। ঘাতকরা আমাকে মেরে ফেলত। তখন তো ঘাতকরা এ দেশেই অবস্থান করছিল।”
মোহিতুল বলেন, ‘সেদিন থানা থেকে অনেক কষ্ট নিয়ে বের হয়েছিলাম। তবে একটা আশায় বুক বেঁধে ছিলাম এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলামÑ বেঁচে থাকলে একদিন না একদিন মামলা করবই। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর মামলা করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ধানমন্ডি থানায় যাই মামলা করতে। এবার আর গলা ধাক্কা খেতে হয়নি। থানা এজাহার গ্রহণ করে। শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া। আইনগত জটিলতা এড়িয়ে মামলা হয়। বিচারও হয়। কিন্তু ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া থমকে যায়। আবার অপেক্ষার পালা। অবশেষে বিচার শেষ হলো। ঘাতকদের ফাঁসি দেখে যেতে পারছি। আমি আজ সুখী মানুষ।’
বঙ্গবন্ধু হত্যা প্রসঙ্গে মোহিতুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আমি কখনও বিশ্বাস করতে পারিনি ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু চাইলে পেছনের বাড়ি দিয়ে আত্মগোপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেন নি। তিনি নিজেও বিশ্বাস করতে পারেন নি তাকে কেউ হত্যা করবে।’ মোহিতুল বলেন, “ঘাতকরা শেখ রাসেলকে ধরে আমাদের কাছে নিয়ে আসে। এ সময় রাসেল আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ভাইয়া ওরা আমাকে মারবে না তো!’ ঘাতকরা হেঁচকা টান দিয়ে রাসেলকে আমার কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। এ সময় রাসেল কাঁদছিল। সে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য বলছিল। ঘাতকরা তাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে শেষ গুলি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *