সবাই মিলে দেশের উন্নয়ন করতে হবে

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ২০১৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করার জন্য দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ঠিক যেভাবে দেশের জনগণ ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে আমাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছিল, তেমনিভাবে আমরা আশা করি ২০১৯ সালের নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে জনগণ দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখবে। এ লক্ষ্যে দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে আপনাদের কাজ করে যেতে হবে। সবাই মিলে দেশের উন্নয়ন করতে হবে।
গত ৮ নভেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম যৌথসভায় সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকারীদের উদ্দেশে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জনগণের শান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জনগণ শান্তি ও নিরাপত্তা চায় এবং আমরা সেই শান্তি ও নিরাপত্তাবিধানে অঙ্গীকারাবদ্ধ। আমরা এজন্য প্রয়োজনে যে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেব। একই সাথে বিএনপি-জামাত কিংবা সহিংসতার পাঁয়তারাকারী যে কোনো দল বা সংগঠনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলায় দলের সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
দেশবিরোধী চক্রের বিরুদ্ধে দেশবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি, তাদের দোসর এবং এ দেশে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা এক জোট হয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। যখন দেশের মানুষ শান্তিতে আছে, একটু সুখের মুখ দেখতে আরম্ভ করেছে, বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে, বিদেশি বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি বিশেষ করে বিএনপি-জামাত ষড়যন্ত্র করে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিতে চাইছে।
দেশের জনগণকে একযোগে এই সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এ সম্পর্কে জনমনে যথেষ্ট সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে এবং কেউই এখন সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদ নামের অশুভ শক্তির উত্থান দেখতে চায় না। জনগণ শান্তি চায় এবং আমরা অবশ্যই সেটা তাদের দেব। প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জঙ্গিবাদের শেকড় খুঁজে বের করায় যথেষ্ট সক্রিয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি সরকার ও জনগণ একযোগে প্রচেষ্টা চালায়, তা হলে আমরা অবশ্যই এই মাটি থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ চিরতরে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হব ইনশাআল্লাহ।
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের এই যৌথসভাটি অনুষ্ঠিত হলো। বঙ্গবন্ধুরই পৈতৃক জমিতে নবনির্মিত পারিবারিক ভবনে অনুষ্ঠিত এই যৌথসভায় সভাপতিত্ব করেন অষ্টমবারের মতো আওয়ামী লীগের পুনর্নির্বাচিত সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে আগামী তিন বছরের জন্য নির্বাচিত আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি আনুষ্ঠানিক দলীয় কর্মকা- শুরু করল। তবে ফেরি বিভ্রাটের কারণে অনেক কেন্দ্রীয় নেতাই সঠিক সময়ে টুঙ্গিপাড়ার বঙ্গবন্ধুর মাজারে পৌঁছতে পারেন নি।
বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর সাংগঠনিক বিষয়ে কিছু আলোচনা হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বৈঠকে ১০ নভেম্বর শহীদ নূর হোসেন দিবস, ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়। এরপর যৌথসভাটি ৯ নভেম্বর সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগ নবনির্বাচিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ ও উপদেষ্টা পরিষদের যৌথ মূলতবি সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী দলের ঐতিহ্য ও গৌরব অর্জনের ইতিহাস অক্ষুণœ রেখে আগামীতে পথ চলার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, আমরা যখন সব দিক থেকে দেশের উন্নয়ন করে যাচ্ছি, দেশ যখন সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা যখন দেশের মানুষকে শান্তিতে থাকার পরিবেশ তৈরি করছি, ঠিক তখনই ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের শান্তি বিনষ্টের চেষ্টা করছে। দলীয় নেতাকর্মীসহ দেশবাসীকে ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করব। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। আর আওয়ামী লীগ ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব পালন করবে। এ জন্য এখন থেকেই আমাদের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে।
দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, যখনই দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়, দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যায় তখনই বিএনপি-জামাত চক্রান্ত করে। আমি এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। তিনি বলেন, দেশের সন্ত্রাস দমন করে জনগণের মনে শান্তি অব্যাহত রাখার জন্য যে যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার আমরা তা নেব। সারাদেশের সকল নেতাকর্মী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ করবে, এটাই আমরা চাই। একই সাথে স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিকে এ ব্যাপারে সরকারকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ ও সরকার সম্মিলিতভাবে সক্রিয় থাকলে এই দেশ থেকে সকল সন্ত্রাস আমরা দূর করতে পারব। বাংলাদেশকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে দলের অর্থনৈতিক নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়ন করেছে। আমরা পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করে দেশের উন্নয়ন করেছি। সুপরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করার সুফল জনগণ পাচ্ছে। ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় ছিলাম বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যদি আর পাঁচটা বছর বেঁচে থাকতে পারতেন তা হলে আজকে বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যরকম হতো। এই অন্ধকারের মধ্যে বাংলাদেশকে পড়তে হতো না। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে হত্যা, ক্যু এবং ক্ষমতা দখলের রাজনীতি শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধের ধারাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। এজন্য বাংলাদেশ যে আদর্শ নিয়ে গড়ে ওঠার কথা ছিল সেই আদর্শে গড়ে ওঠেনি। রাজাকার, আলবদর, স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানো হয়েছিল বাংলাদেশকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য। এরপর দেশে হাজার হাজার স্বাধীনতার পক্ষের নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের উন্নয়নের জন্য কাজ শুরু করে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলায় তার রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমি বিশ্বাস করি আমরা যেসব অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো হাতে নিয়েছি তা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই আমরা সেই অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হব।
জাতির পিতার মাজারে শ্রদ্ধা : প্রধানমন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের টুঙ্গিপাড়ায় আগমন উপলক্ষে পুরো গোপালগঞ্জেই ছিল উৎসবের আমেজ। ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক এবং গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া সড়ক, মুকসুদপুর থেকে টুঙ্গিপাড়া বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্স পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার সড়কে শতাধিক তোরণ নির্মাণ করা হয়।
আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে বিমান বাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে তার পৈতৃক বাড়ি টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছেন। টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কমপ্লেক্সে হেলিপ্যাডে অবতরণের পরপরই প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সোজা এই মহান নেতার সমাধিতে যান। এ সময় তার ছোট বোন শেখ রেহানাসহ বঙ্গবন্ধুর পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও ছিলেন।
দুপুর ১২টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিবেদীতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের স্মারক হিসেবে সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। এরপর আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, দলের নবনির্বাচিত উপদেষ্টা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় ফাতেহা পাঠ করেন ও বিশেষ মোনাজাতে শরিক হন। বাদ জোহর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলেও তারা অংশ নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *