স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধুর যে আহ্বান-‘আর যদি একটা গুলি চলে আর যদি আমার লোককে হত্যা করা হয় তোমাদের কাছে অনুরোধ রইলো প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ২৫ মার্চের কালরাতে যখন গণহত্যার নীল নকশা অনুযায়ী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলো সেই গুলির শব্দের জবাব এলো-‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবেলা করার জন্যে আমি আহ্বান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আপনাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।’ স্বাধীনতার এই ঘোষণা ও আহ্বানকে কার্যকর করতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমম্বয়ে সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে জেলা, মহকুমা ও থানা এবং প্রতিটি গ্রাম-মহল্লায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, সামরিক ও ইপিআর বাহিনীর অফিসার বাঙালি ও সেনা সদস্যদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা প্রতিরোধ সব কিছু মিলে যে মোর্চা গড়ে ওঠে এরই ধারাবাহিকতায় রচিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক দলিল ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র।’ উক্ত ঘোষণাপত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি একজন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং তাঁর স্বীয় বিবেচনায় অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি প্রজাতন্ত্রের সকল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ প্রজাতন্ত্রের সকল নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন; কর আরোপন ও অর্থ ব্যয় ক্ষমতার অধিকারী হবেন। গণপরিষদ আহ্বান ও মুলতবি করার ক্ষমতার অধিকারী ও ন্যায়ানুগ সরকার গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অন্য সব কার্যাদি সম্পাদন করতে পারবেন। ক্ষমতা বিন্যাসের মাধ্যমে- একটি বিষয় খুবই লক্ষণীয় যে, আপাতদৃষ্টিতে এই ঘোষণাপত্র অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির হাতে সমস্ত ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়েছে বলে মনে হলেও, এটাকে একটি ভারসাম্যমূলক কেবিনেট সিস্টেমের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করা ও মন্ত্রীপরিষদ গঠনের বিষয়টিও স্থান পেয়েছিলো।

পাকিস্তানব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে সংবিধানটির খসড়া রচনা করা হয় সেটি অনুমোদনের জন্য ১ মার্চে পূর্বাণী হোটেলে একটি পার্লামেন্টারি পার্টির অধিবেশন ডাকা হয়। উক্ত অধিবেশন শুরুর পূর্বে গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতার সঙ্গে কোনোরূপ আলাপ-আলোচনা পরামর্শ ছাড়া ৩ মার্চে অনুষ্ঠিতব্য গণপরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণার মাধ্যমে সামরিক জান্তা পাকিস্তানের সাংবিধানিক সমাধানের পথ রুদ্ধ করে দেয়। ঢাকাসহ বাংলাদেশের সর্বত্র ধ্বনিত-হয় ‘ছয় দফা না এক দফা?’-এক দফা-এক দফা; ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর-বাংলাদেশ স্বাধীন কর। পিণ্ডি না ঢাকা? ঢাকা-ঢাকা। বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’

এমন একটি পরিবর্তিত অবস্থায় বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমাদের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সকল ক্ষমতা অর্পণ করেন এবং তিনি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন সেটাই হবে বাংলাদেশ গণপরিষদের সিদ্ধান্ত। কার্যত ঐদিন থেকে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণই Defacto বাংলাদেশ গণপরিষদে রূপান্তরিত হলো এবং গণপরিষদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সকল ক্ষমতা অর্পণ করা হয় এবং আরও বলা হয় যে, তিনি যে সিদ্ধান্ত দিবেন সেটাই বাংলাদেশের গণপরিষদের সিদ্ধান্ত বলে পরিগণিত হবে। গণপরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নির্বাচিত হুইপ হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে ১ মার্চের সভা অনুষ্ঠান আহ্বানসহ সকল কার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই সিদ্ধান্তটিও আমি নিজের হাতে খসড়া তৈরি করি। বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করলে আমি এটা পাঠ করি। তুমুল করতালির মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে এটা পাস হয়। এরপর সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এভাবেই ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত দলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা চালু ছিলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তিনজন সহ-সভাপতি ও পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ও পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম কামরুজ্জামান এই ‘হাইকমান্ড’ পরিচালনা করতেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সকল প্রশাসন পরিচালনা এই হাইকমান্ডের নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিলো। সিভিল প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ সকল সরকারি অফিস-আদালত থেকে শুরু করে ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, শিল্প-কল-কারখানা, ব্যবসা বাণিজ্য, আমদানি-রফতানি, জাহাজ যান চলাচল সবকিছু জনগণের নির্বাচিত প্রধানের আদেশ ও নির্দেশে পরিচালিত হতে থাকে। এমনিভাবে ১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই হাইকমান্ডটি একটি নির্বাচিত বৈধ অনানুষ্ঠানিক সরকারে পরিণত হয়। ইয়াহিয়া সরকার পরিণত হয় একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক সামরিক জান্তায় এবং বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের দ্বারা গঠিত হাইকমান্ড আইনানুগ ও কার্যত ‘Degure’ এবং ‘Defacto’ উভয়ই বৈধতা অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাই যুদ্ধকালীন সময়ে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও কেবিনেট একই সঙ্গে কেবিনেট সভা করতেন। সরকার গঠনে ও কার্য পরিচালনায় এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়েছে। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা এতে সংযোজন করা হয়েছিলো।

দিল্লিতে বসে যখন সরকার গঠনের আলোচনা হয়, তখন তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে মতবিনিময় করি। চিন্তা, যুক্তি, পাল্টা-যুক্তি, ভবিষ্যত পরিকল্পনা এবং কর্মধারা, যুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক সমর্থন, প্রচার, বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের কাছে ভারতের কূটনৈতিক তৎপরতা ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের নিকট তুলে ধরা থেকে শুরু করে ভারতে সম্ভাব্য এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয়, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, তরুণ ও যুবকদের একত্রিত করে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা সকল বিষয় সেই আলোচনায় স্থান পায়। সকল খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দু’দফা আলোচনায় সরকারের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সুসজ্জিত পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বতঃস্ফূর্ত যে জনযুদ্ধ শুরু হয়েছে একে সুসংগঠিত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়, ট্রেনিং ও Regronping, ছোট অস্ত্র ও ভারী অস্ত্রের ব্যবহার ও সরবরাহের ব্যবস্থা এবং প্রায় এক কোটি শরণার্থী যারা ওপার বাংলায় আশ্রয় নেবে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তা বিধানের জন্য প্রয়োজনীয় ও সঠিক সমর্থন ও সহযোগিতার বিষয়ে সম্ভাব্য কী কী আলোচনা হতে পারে, সে বিষয়েও মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আমাদের প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি বেতার বাণী প্রচারেরও ব্যবস্থা রাখা হয়। আলোচনার মূল বক্তব্য ছিলো, এই যুদ্ধ মূলত বাঙালির, বাংলাদেশের মানুষের। এই যুদ্ধ যাতে আন্তর্জাতিকীকরণ না হয় তার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে এবং এই যুদ্ধ যেন ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধে পরিণত না হয়। এই বক্তব্যে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী খুবই সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। একটি সাংবিধানিক, বৈধ ও আইনানুগ সরকার ছাড়া কি করে ভারত সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতা পাওয়া যাবে বা দুই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তি ও মাধ্যম কিভাবে স্থাপিত হবে সেই সঙ্গে এসব বিষয় নিয়েও আলোচনার প্রকৃতি ও কৌশল ঠিক করা হয়। এতদুদ্দেশ্যে সম্ভাব্য সকল প্রশ্নের জবাব কি হতে পারে, সে বিষয়ে চিন্তা ও প্রস্তুতির জন্য দিল্লিতে ভারত সরকারের একটি অতিথি ভবনে বসে তাজউদ্দীন আহমদ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘সরকার গঠন করার কথা বলছেন, কাদের নিয়ে সরকার গঠন করবেন?’ উত্তর প্রস্তুত ছিলো, সরকার তো বঙ্গবন্ধু তৈরি করে রেখে গেছেন। ১ থেকে ২৫ মার্চ যে সরকার দেশ পরিচালনায় সার্বিক নির্দেশনা দিয়ে আসছিলো এবং তা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হচ্ছিলো সেটি তো শুধুমাত্র ‘Defacto Government’-ই নয়। পরবর্তীকালে পাকিস্তান সুপ্রীমকোর্টের রায় অনুযায়ী (আছমা জিলানি বনাম পাঞ্জাব সরকার PLD 1972 (S.C 139), আমার সেই বাক্যটিই সঠিক প্রমাণিত হয়েছিলো। পাকিস্তানে ইয়াহিয়ার অবৈধ সামরিক সরকারের বিপরীতে বাংলাদেশ সরকার ছিলো একমাত্র সাংবিধানিক বৈধ সরকার। তফাৎ শুধু একটিই যে, বঙ্গবন্ধু শত্রুর হাতে বন্দী। তাঁর জীবন রক্ষা, মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক সরকার গঠন জরুরী প্রয়োজন। সশস্ত্র সংগ্রাম ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গা পর্যন্ত দীর্ঘপথ পরিক্রমায় এবং বিভিন্ন শহর ও গ্রামে আমরা যে প্রতিরোধ ও পাল্টা আক্রমণ এবং প্রাথমিক পর্যায়ে যে যুদ্ধ এবং শত্রু সেনাদের অবরোধ করে জনগণের যে প্রত্যয়ী ও সাহসী ভূমিকায় অংশগ্রহণের যে চিত্র দেখেছি তাতে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ একটি জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছি। সারাদেশেই প্রচারিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে, বেতারেও তারা শুনেছে। পদ্মার এপার দোহার থানার ওরঙ্গবাদ গ্রামে শুকুর মিয়ার বাড়িতে যখন আমরা রাত্রি যাপন করছি তখনই আমরা রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা প্রথম শুনতে পাই। পরে ফরিদপুর থেকে মাগুরা যাবার পথে রাজবাড়ির তৎকালীন এসডিও শাহ ফরিদের ও পরে ঝিনাইদহের এসডিপিও মাহাবুদ্দীন আহাম্মদ এবং চুয়াডাঙ্গা পৌঁছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে এবং মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, মেসেজ এসেছে কি আসেনি তা কারও মুখে আলোচনার বিষয় নয়। চুয়াডাঙ্গার ইপিআরের অধিনায়ক মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, ক্যাপ্টেন আজম এঁরা সবাই স্বতঃস্ফূর্ত যুদ্ধ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে রুখে দিতে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন।

এঁরা কোনো মেসেজের জন্য অপেক্ষা করেননি। তাঁদের সংকেতের জন্য বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণই ছিলো যথেষ্ট। সারাদেশের সাধারণ মানুষ কোনো Message বা ঘোষণা বা নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলেন না। ২৫ মার্চের রাত্রে Operation Search Light-এর প্রথম কামানের আওয়াজটাকেই বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার নির্দেশ অনুযায়ী স্বাধীনতার ঘোষণার সঠিক মুহূর্ত বলে দেশবাসী মনে করে। ‘আর যদি একটা গুলি চলে, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সবকিছু বন্ধ করে দিতে হবে-আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।’

কিন্তু প্রথম দালিলিক প্রমাণ আমাদের হাতে এলো যখন সীমান্ত পার হবার পর আমাদেরকে গোলক মজুমদার অভ্যর্থনা জানাতে সীমান্তে এলেন তখন। তিনি জানালেন বিএসএফের কাছে বঙ্গবন্ধুর Wireless Message তাদের Wireless-এ ধরা পড়ে। পরে তার একটা কপি আমাদেরকে দেন। তখনই আমার মনে পড়ে ২৫ মার্চ বেলা গড়িয়ে দুইটা বা আড়াইটার সময় Wireless Engineer নূরুল হক সাহেবের সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাত। আমি অনেক দেরি করে বাসায় এসেছি দুপুরের খাবার খেতে। আমি যখন গেট দিয়ে ঢুকছি তখন দেখি ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক আমার আগে তাঁর গাড়ি নিয়ে আমার বাসায় ঢুকছেন। পূর্বের একটি আলোচনার সূত্র ধরে তিনি বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু আমাকে একটি ট্রান্সমিটার আনতে বলেছিলেন। সেটি খুলনা থেকে আমি আনিয়ে রেখেছি। আমি এখন ওটা দিয়ে কি করবো সে বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে নির্দেশনা চাই।’ আমি তাঁকে বললাম, ‘বঙ্গবন্ধু যা বলার তা ৭ মার্চেই নির্দেশনা দিয়েছেন। আমার কাছে সংগঠন আছে আর কলম আছে। আমি এটা দিয়ে কাজ করবো। আপনার কাছে ট্রান্সমিটার আছে-সেটা দিয়ে আপনি শত্রুর মোকাবিলা করবেন। আমি আপনাকে কি লিখে দিবো কি বলতে হবে?’ উনি বললেন, ‘তার প্রয়োজন হবে না। আমি জানি কি বলতে হবে। But that may cost my life; yet it may be worth doing and I will do it.’

আমি তাজউদ্দীন সাহেবকে বললাম ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক তাঁর প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। পরে জানতে পেরেছি তিনি তাঁর এই প্রতিশ্রুতির মূল্য দিয়েছেন তাঁর জীবন দিয়ে। কয়েকদিন তাঁকে সেনাবাহিনী বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে খুঁজে বের করতে বলেন যে, ট্রান্সমিটার কোথায় রেখেছেন। তারা তাঁর বাড়িতেও তল্লাশি করান। এরপর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি আর ফিরে আসেননি। অনেকদিন পর হাজী গোলাম মোর্শেদের কাছ থেকে জানতে পারি যে, আমরা বঙ্গবন্ধুর বাড়ি ত্যাগ করার পর বঙ্গবন্ধু ও গোলাম মোর্শেদকে বন্দী করার পূর্বে একটা টেলিফোন আসে। কণ্ঠটি খুব গভীর ও দৃঢ়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চান। তিনি বলেন, আমি বলদা গার্ডেন থেকে বলছি। আমার কাজ শেষ করেছি। আমি এখন কি করবো। মুর্শেদি ভাই বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলে বঙ্গবন্ধু বলেন ওটা ভেঙ্গে-চুরে দিয়ে চলে যেতে বলো। দিল্লিতে যখন এম আর সিদ্দিকী আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন তখন তিনিও ঐ Wireless Message-এর প্রিন্টটি দেখে Confirm করেন যে এটাই সেই মেসেজ যেটা তাঁরা চট্টগ্রামেও পেয়েছিলেন।

৯ এপ্রিলে গভীর রাতে কলকাতায় বিএসএফের অতিথিশালায় বসে আমি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখতে শুরু করি। তখন ঐ একটি মাত্র দলিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বার্তা আমার সামনে ছিলো। আর কোনো দলিল বা বই আমার কাছে ছিলো না। ঐ ঘোষণাটির ওপর নির্ভর করেই আমি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি রচনা করি। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের স্বীকৃতি প্রাপ্তির যে চিঠিটি পরে আমি তৈরি করি তার সঙ্গে সংযুক্তি ছিলো ঐ ঘোষণাটি। আমার তৈরি করা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং প্রধানমন্ত্রীর ইংরেজিতে লেখা বক্তৃতাটি যেটা ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে পাঠ করা হয় এবং সাংবাদিকদের কাছে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র ও তাজউদ্দীন সাহেবের লিখিত ইংরেজি বক্তৃতাটি বিলি করা হয়।

ইতোমধ্যে সরকার গঠন করার জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে চাপ আসছে। রংপুর থেকে তরুণ এমপি আব্দুর রউফ দিল্লি এসেছেন। কসবার এমপি সিরাজুল হক এবং চট্টগ্রাম থেকে এম আর সিদ্দিকী; আরও চিঠি পেয়েছি ময়মনসিংহ থেকে রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া ও আবদুস সুলতানের কাছ থেকে। তাঁরা সবাই অবিলম্বে সরকার গঠনের তাগিদ দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, ছাত্র-যুবক দলমত নির্বিশেষে রাজনৈতিক নেতাকর্মীর সমন্বয়ে সারাদেশে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তৎকালীন ইপিআর, সামরিক বাহিনীতে কর্মরত অফিসার থেকে শুরু করে সাধারণ সৈনিকবৃন্দ এবং পুলিশ ও প্রশাসনসহ সর্বস্তরের জনগণ। এই যুদ্ধ ২৫ মার্চের রাত থেকে শুরু হয়-যার সুপরিকল্পিত নেতৃত্ব দেওয়া হবে এ সরকারের মূল কাজ। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিলো, বঙ্গবন্ধু শত্রু শিবিরে বন্দী, তাঁকে রাষ্ট্রপতি রাখলে তাঁর জীবনের ঝুঁকি কমবে, না বাড়বে! এর যৌক্তিক উত্তরও ছিলো। তাঁকে রাষ্ট্রপতি রাখলে তাঁর জীবনের ঝুঁকি অনেক কম হবে। কারণ, তাঁর জীবনের নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ স্বাভাবিকভাবেই আরও বৃদ্ধি পাবে। তিনি মুক্ত বা বন্দী যেভাবেই, যেখানেই থাকুন না কেনো, তিনিই হবেন এই যুদ্ধে বঙ্গবন্ধু প্রেরিত মূল নায়ক। তাজউদ্দীন আহমদ সে কথায় সায় দিলেন এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমি আমার নেতাকে যেভাবে জানি বা চিনি, তিনি আমাদের এই ঘোষণা বা তাঁকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠনের পদক্ষেপ নিলে জীবন গেলেও তিনি তা অস্বীকার করবেন না।’ তৃতীয় প্রশ্ন ছিলো, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? আমার উত্তর ছিলো, বঙ্গবন্ধু বন্দী হবার পর থেকে যিনি এই মুক্তিসংগ্রামে প্রধান ভূমিকা পালন করছেন তিনিই হবেন যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের যে অধিকার সেই অধিকারের ওপর প্রথম আঘাত হানা হয় ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রথম নির্বাচনের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হয়। তা ভারত শাসন আইনের ৯২ (ক) ধারা জারির মাধ্যমে গভর্নর শাসন প্রবর্তন করে। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ সালের ২৪ অক্টোবর, যেদিন পাকিস্তান গণপরিষদকে অন্যায়ভাবে ভেঙ্গে দেওয়া হয়। পাকিস্তানের ইতিহাসের এসব কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পূর্ণ সংস্করণ ঘটলো ১৯৭১ সালে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে। নির্বাচিত গণপরিষদের পূর্ব নির্ধারিত ৩ মার্চের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করে নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে নিরপরাধ মানুষের ওপর জিঘাংসা নিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী গণহত্যা, নরহত্যা, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে নগরের সব বস্তি এবং শহরের বাইরে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকে বাংলাদেশের আপামর মানুষ বার বার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। সামরিক জান্তা ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয় দেশের সর্ব অঞ্চলের জনগণ। তাদের দুঃশাসনের সর্বাধিক বঞ্চনার শিকার বাংলার জনগণ। সামরিক আইনের দুঃশাসন, সেই সঙ্গে শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের সর্বগ্রাসী থাবা বাংলার মানুষের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেনো?’ আওয়ামী লীগ প্রদত্ত ৬ দফা ও ছাত্রসমাজের ১১ দফা আন্দোলনের প্রথম দফায় সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবি রূপ পেয়েছিলো ‘এক মানুষ, এক ভোট’ সেøাগানে। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধিকারের আন্দোলন এবং তা থেকে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের দাবি পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের বিরুদ্ধে যে বাঁধা, তা উন্মোচনের সংগ্রামই ছিলো বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন এবং তা থেকে সৃষ্টি হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল স্রোতধারা।

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুজিবনগর সরকারের অন্যতম কর্তাব্যক্তি, মুজিবনগর সরকারের আইনি কাঠামোর প্রণেতা ও সত্তরের গণপরিষদ সদস্য। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা, বাংলাদেশের প্রবীণ আইনজীবী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *