স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : অন্যরকম একদল মুক্তিযোদ্ধা

কল্পনার চোখে ভাবুন দৃশ্যটা! সবুজ জমিনে লাল সূর্য্যের মাঝখানটায় হলুদ মানচিত্র- পতপতিয়ে উড়ছে তখনো না জন্মানো একটি দেশের কাল্পনিক এক পতাকা। আর তা সদর্পে উচিয়ে মাঠ দাপাচ্ছেন একদল তরুণ। এরাও মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু হাতে বন্দুক নেই। জার্সি আর শর্টস পায়ে বুট পড়ে পতাকার মান রাখতে সারা ভারত জুড়ে খেলে বেড়াচ্ছে তারা। আমি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের কথা বলছি।
আইডিয়াটা শামসুল হকের মাথা থেকে বেরিয়েছে। জুনের সেই দূরন্ত দিনগুলোতে কলকাতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি এবং সিদ্ধান্ত নেন একটি ফুটবল দল গঠনের যারা সারা ভারতজুড়ে খেলে সমর্থন আদায় করবে আমাদের স্বাধীন বাংলার স্বীকৃতির জন্য। তার সাহায্যে এগিয়ে এলেন সমিতির প্রথম সেক্রেটারি লুতফর রহমান, কোচ আলী ইমাম ও ইস্ট এন্ড ক্লাবের সাবেক ফুটবলার সাঈদুর রহমান প্যাটেল।
তাদের তৎপরতায় ভারতের আকাশবানীতে একটি বিবৃতি প্রচার হলো যাতে পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত ফুটবলারকে যোগ দিতে বলা হলো একটি বিশেষ ঠিকানায়। ঘোষণা দিতে বাকি, কদিনে মধ্যেই কোচ ননী বসাকের (চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শবনমের বাবা) বিশেষ 30 জনের মতো খেলোয়াড় ট্রায়ালে যোগ দিলেন। তাদের মধ্যে থেকে 25 জনকে বাছাই করা হলো। পরে অবশ্য ভারত সফরে আরো বেশ কজন খেলোয়াড় দলে যোগ দেন। পার্ক সার্কাস এভিনু্যর কোকাকোলা বিল্ডিংয়ের একটি রুমে থাকতেন ফুটবলাররা। আর প্র্যাকটিস করতেন পাশের মাঠেই।
24 জুলাই এলো সেই ঐতিহাসিক দিন। জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে পশ্চিম বঙের নদীয়া জেলায় কৃষ্ঞনগর স্টেডিয়ামে কৃষ্ঞনগর একাদশের বিপক্ষে প্রথম খেলতে নামে লাল-সবুজরা খেলাটি ড্র হয় 2-2 গোলে। তবে এ নিয়ে হই হট্টগোল কম হয়নি। বিশ্ব মিডিয়া সমালোচনা করে এমন ম্যাচের। ফলশ্রুতিতে নদীয়ার জেলা প্রশাসক সাসপেন্ড হন অফিসিয়াল একটি দল নামানোয়, আর ভারতীয় ফুটবল এসোসিয়েশন (আইএফএ) বাধ্য হয় নদীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগি পদ বাতিল করতে।
সাবেক বিসিবি ম্যানেজার তানভির মাজহার ইসলাম তান্না ছিলেন দলটির ম্যানেজার। তার ভাষায়, ‘ভারতের যেখানেই গিয়েছি আমরা, প্রচণ্ড সাড়া পেয়েছি সাধারণ মানুষের।’
অধিনায়ক পিন্টুর ভাষায়, ‘এই ঘটনার পর প্রতিপক্ষ আর অফিসিয়াল নাম ব্যবহার করতে পারেনি। এমনকি মোহনবাগান খেলেছে গোষ্টপাল একাদশ নামে। মজা হয়েছিল মুম্বাইয়ে- মহারাষ্ট্র একাদশের হয়ে খেলেছিলেন স্বয়ং নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি (ভারতীয় অভিনেতা সাইফ আলী খানের বাবা) এবং আমাদের বিপক্ষে একটি গোলও করেন। আমার এখনো চোখে ভাসে স্বয়ং দিলীপ কুমার এসেছিলেন ম্যাচটি দেখতে এবং এক লক্ষ রুপি অনুদানও দেন দলকে।’
মোট 6টি ম্যাচ খেলেছে স্বাধীন বাংলাদেশ ফুটবল দল। এর মধ্যে জিতেছে 3টি, ড্র করেছে 1টি আর হেরেছে দুটিতে। দিল্লীতে আর একটি ম্যাচ খেলতে যাবার ঠিক আগে এল অসাধারণ খবরটি- বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। সেদিন ছিল 16 ডিসেম্বর।
স্বাধীন বাংলা দলের সদস্যদের মধ্যে লুৎফর রহমান, ননী বসাক, আলী ইমাম, মাহমুদ ও লালু আর আমাদের মাঝে নেই। এনায়েত, সাঈদুর রহমান প্যাটেল ও শাহজাহান মার্কিন প্রবাসী। গোবিন্দ কুন্ডু ও নিহার ভারতে অভিবাসন নিয়েছেন। আর গোলকিপার অনিরূদ্ধ পাকাপাকিভাবে থাকছেন দুবাইতে।
বাকিরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন দেশের আনাচেকানাচে, কিন্তু তাদের বীরত্ব গাথা বিবেক থাকলে ভুলবে না বাঙালী।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল : জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), প্রতাপ শংকর হাজরা (সহ-অধিনায়ক), কাজী সালাহউদ্দিন, নওশেরউজ্জামান, লেঃ নুরুন্নবী, তাসলিম, আইনুল হক, খোকন (রাজশাহী), লুৎফর (যশোর), শেখ আশরাফ আলী, অমলেশ সেন, হাকিম (যশোর), আমিনুল ইসলাম সুরুজ (বরিশাল), বিমল (চট্টগ্রাম), সুভাষ চন্দ্র সাহা (নরসিংদি), মুজিবর রহমান, কায়কোবাদ, ছিরু, সাত্তার, সনজিৎ, মোমেন জোয়ার্দ্দার (চট্টগ্রাম), সাঈদুর রহমান প্যাটেল, পেয়ারা (সাবেক সেক্রেটারি কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থা), এনায়েতুর রহমান খান, শাহজাহান, অনিরুদ্ধ, নিহার, গোবিন্দ কুন্ডু, প্রয়াত আলী ইমাম, প্রয়াত লালু, প্রয়াত মাহমুদ।

ছবি : 1.স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল, 2. নদীয়ায় ম্যাচ শেষে সালাউদ্দিনের নেতৃত্বে বেরিয়ে আসছেন বাকিরা
কৃতজ্ঞতা : হাসান মাসুদ (বিবিসি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *