স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক নমিতা ঘোষ

লেখক: কোহিনুর আক্তার রাখি
তারিখ: ২৮ নভেম্বর ২০১৬

আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা বিভিন্নভাবে অবদান রেখেছিলেন তাদের মধ্যে নমিতা ঘোষ অন্যতম। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রথম নারী শিল্পী । স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণীত করেছেন, সাহস যুগিয়েছেন। গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে যোগ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি। নমিতা ঘোষ ঢাকার একটি সম্ভ্রান্ত সংস্কৃতমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মা জসোদা ঘোষ সে সময় রেডিও টেলিভিশনে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। মাত্র চার বছর বয়সেই মায়ের কাছে সঙ্গীতের তালিম নেন তিনি। পরবর্তীতে সঙ্গীতানুরাগী বাবার উৎসাহে ওস্তাদ মুন্সি রইসউদ্দিন, বারীণ মজুমদার, পিসি গোমেজ, বেদার উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ সঙ্গীতজ্ঞের কাছে গানের প্রশিক্ষণ নেন নমিতা ঘোষ। এভাবেই সঙ্গীত জগতে পদচারণা শুরু হয় তার। রেডিও-টেলিভিশনে সঙ্গীত পরিবেশন করে কৈশোরেই আলোচিত হন তিনি। বর্তমানে তিনি রেডিও-টেলিভিশনে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন ছাড়াও একটি সঙ্গীত স্কুল পরিচালনা করছেন। পাশাপাশি লেখালেখি ও সমাজ সেবামূলক কর্মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নমিতা ঘোষ বলেন, কিছু কিছু স্মৃতি আছে যা মানুষের মনের মনিকোঠায় চিরদিন অম্লান হয়ে থাকে। আমার জীবনেও তেমনি একটি ঘটনা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ১৯৬৯ সালের কোন এক সময় একটি ঘরোয়া আসরে গান গাইতে যাই। তখনকার স্টেট ব্যাংকের এক কর্মকর্তার বাসায় আয়োজন করা হয়েছিল সঙ্গীতের আসরটি। সীমিত সংখ্যক অতিথি ছিল সেই আসরে। অনুষ্ঠানের মধ্যমনি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিদিন খবরের কাগজে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখতাম, তার সম্পর্কে নানা খবর পড়তাম। কিন্তু সেই সিংহপুরুষকে সেদিনের আসরে দেখে সত্যি আমি অভিভুত হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে ছাড়াও আরো বেশ কয়েকজন নামীদামী শিল্পী সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন সেদিন। আমি গেয়েছিলাম কীর্তন। কীর্তন শুনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যদি এদেশের শাসনভার পাই তাহলে রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও কীর্তন চালু করবো। কথাগুলো আশীর্বাদের মতোই আমার কানে বেজেছিল। আজও মনে পড়ে সেই দিনের কথাগুলো। ঠিক তেমনি ’৭১-এর কথা বলতে গেলে স্মৃতিপট জুড়ে আছে হৃদয়ের এক বিশাল এলাকা। ২৫ মার্চের ভয়াবহ রাতের কথা মনে হলে এখনো বুক কেঁপে ওঠে। ২৭ মার্চ শাখারী বাজারের প্রতিটা ঘরে ঘরে লাশ। সেই লাশের ওপর দিয়েই আমরা সদরঘাট টার্মিনালে পৌঁছাই। সেখানে হাজার হাজার মানুষ। নদী পাড় হওয়ার উদ্দেশ্যে বাবার সঙ্গে নৌকায় ওঠলাম। হঠাৎ পাকিস্তানী আর্মিদের তাড়া খেয়ে এক মহিলা ঝাঁপ দিয়ে নৌকায় ওঠতে গেলে আমাদের নৌকাটি ডুবে গেল। আমি সাতার জানিনা। আমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছিলাম। আমার চুল বড় ছিল। তখন দশ-বারো বছরের দু’টি ছেলে আমার চুল ধরে টেনে আমাকে অন্য একটি নৌকায় ওঠায়। এভাবেই আমি বেঁচে যাই। যাহোক, নৌকায় নদী পাড় হয়ে নদীর ওপাড়ে সুভড্ডা গ্রামে যাই। তারপর বিভিন্নভাবে খেয়ে না খেয়ে কুমিল্লা আখাউড়া বর্ডার পাড় হই। সেখানে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা প্রিয়দাস চক্রবর্তী বাবুর সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। তিনি আমাদেরকে নরসিঙ্গর পলিটেকনিক্যাল হোষ্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। সেখানে আগে থেকেই কিছু বিশিষ্ট পরিবার ছিলেন। অধ্যাপক আলী আহসান, ৫নং কেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা খসরু প্রমুখ। রাজবাড়ি ক্যাম্পে দেখা হয় আব্দুল জব্বার ও আপেল মাহমুদের সাথে। তখন কর্মসূচি নেয়া হয় সবাই মিলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে গান গেয়ে তাদের অনুপ্রেরণা দেওয়ার। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে আগর তলার বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করে অর্থ, জামা-কাপড়, খাবার ইত্যাদি সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাঠাতাম। আগর তলাতেই আমার, কবরী চৌধুরী ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি প্রামান্যচিত্রের জন্য সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সেই প্রামান্যচিত্রটি সাত-আট মাস ধরে ভারতের সব সিনেমা হলে দেখানো হয়েছে। পরবর্তিতে সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি তৌফিক ইমাম সাহেবের সহযোগিতায় মে মাসে আমার মা ও আমাকে বিমানের দু’টি টিকিটের ব্যবস্থা করে কলকাতায় পাঠান। পরে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক আমীনুল হক বাদশা ভাই আমাকে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে নিয়ে যান। সেই দিনটি ছিল ২৯ মে। সেই থেকে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে প্রথম মহিলা শিল্পী হিসেবে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করতে থাকি। পরে আরো মহিলা শিল্পী সেখানে যোগ দেন। কলকাতায় শরণার্থীদের সাহায্যকালে রবীন্দ্র সদনে যৌথভাবে বিচিত্রা অনুষ্ঠান হয়। সেখানে সঙ্গীত পরিচালক সমরদাসের পরিচালনায় আমরা গণসঙ্গীত পরিবেশন করি। ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন সন্ধ্যা মুখার্জী, বনশ্রী সেনগুপ্ত, আরবিন্দু বিশ্বাস, দ্বিজেন মুখার্জী, কাজী সব্যসাচী, কাজী অনিরুদ্ধ প্রমুখ।

নমিতা ঘোষ বলেন, মুজিব নগর সরকারের মরহুম তাজউদ্দিন আহমেদ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করার নির্দেশ দেন। পরে ব্যারিষ্টার বাদল রশীদ(এমএনএ)-এর নেতৃত্বে ও চিত্র পরিচালক দিলীপ সোমের ‘বিক্ষুব্ধ বাংলা’ গীতি আলেখ্য নিয়ে ১৪ সদস্যের একটি সাংস্কৃতিক দল মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য ফান্ড তোলার উদ্দেশ্যে ভারতের মহারাষ্ট্রসহ বোম্বে, দিল্লী, গোয়া, কানপুর, পুনা বিভিন্ন জায়গায় শাণিত কন্ঠে তীব্র প্রতিবাদের গান গেয়ে ১১ লাখ টাকা, কম্বল, পুলওভার, শতরঞ্জি, ওষুধ সামগ্রী সংগ্রহ করে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেই। আমরা মোট ১৪জন ছিলাম এই দলে। আমাকে ছাড়া অন্য যারা ছিলেন তারা হলেন সরদার আলাউদ্দিন, স্বপ্না রায়, আব্দুল জব্বার, আপেল মাহমুদ, মাধুরী আচার্যি, অরুনা বিশ্বাস, মাজহারুল ইসরাম, সাইফুল হাসান, মঞ্জুর হোসেন, রমা ভৌমিক, দিলীপ সোম, অবিনাশ শীল এবং ভারতের তবলা বাদক শান্তি মুখার্জী। আমরা বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। সেই দিনগুলির কথা মনে হলে এখনো আতংকে বুক কেঁপে ওঠে। তবে, কষ্টের হলেও দিনগুলো ছিলো আনন্দের। আমাদের মধ্যে তখন স্বাধীন দেশ গড়ার স্বপ্ন ছিলো। স্বাধীন ভষায় কথা বলার স্বপ্ন ছিলো। আজ নিজেকে ধন্য মনে করছি দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছিলাম বলে।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে কতটুকু মূল্যায়ন পেছেন জানতে চাইলে নমিতা ঘোষ বলেন, আসলে বরতে গেরে মানুষের ভালবাসা পেয়েছি একথা ঠিক। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে তেমন মূল্যায়ন হয়নি বলে আমি মনে করি। দু’একজন ছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীদের কারোরই তেমন মূল্যায়ন হয়নি। আসলে আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম বিভিন্ন কারণে বাস্তবে প্রকৃত অর্থেই আমরা আমাদের স্বপ্নের সেই বাংলাদেশকে পাইনি। রাজনৈতিক ঘাত প্রতিঘাতের কারণে আমরা যে উদ্দেশ্য নিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রর শিল্পীরা কণ্ঠ দিয়ে যুদ্ধ করেছিলাম, যে স্বপ্ন দেখেছিলাম সেই স্বপ্নের প্রতিফলন দেখতে পাইনি এই স্বাধীন বাংলাদেশে। তবে, আমি আশাবাদী আমাদের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন অবশ্যই হবে। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীদেরও সঠিক মূল্যায়ন হবে। আমি মনে করি মুক্তিযুদ্দ কেবল অস্ত্রের যুদ্ধ ছিল না ছিল গণসঙ্গীতেরও যুদ্ধ। বর্তমানে সমস্ত অপশক্তিকে দূরে ঠেলে দিয়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় এসেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শিল্পীদেরও এ সরকার যথাযথ মূল্যায়ন করবে।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র যে বাড়িতে স্থাপন করা হয়েছিল সে বাড়িটি সম্পর্কে নমিতা ঘোষ বলেন, আসলে সেই বাড়িটি একটি ঐতিহাসিক বাড়ি। আমি প্রতিবারই কলকাতায় গেলে সেই বাড়িটি দেখে আসি। গত বছরও গিয়েলিাম। আশেপাশের জায়গাগুলো অনেক পরিবর্তন হলেও বাড়িটি অবিকল আগের মতোই রয়ে গেছে। আমি বাড়ির ভেতরটা দেখার জন্য কলিং বেল বাজিয়েছিলাম। কিন্তু ভেতর থেকে এক অবাঙ্গালী লোক হিন্দিতে কি যেন বলছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম না। তারা দরজা খুলছিলনা। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে শেষে চলে এসেছিলাম। আমার তখন মনে প্রশ্ন জেগেছিল, বাংলাদেশ সরকার কি পারতো না এই বাড়িটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে? এই বাড়িটিকে যাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করলে কলকাতার নতুন প্রজন্ম আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধীনতা সংগ্রামে আমাদের ত্যাগ ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারতো। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের অসাধারণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো এই বাড়িটি। আমরাও এই বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও ফিরে যেতে পারতাম স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই আনন্দ আর বেদনার দিনগুলোতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *