‘স্বীকৃতি পেলে সব অপমান ভুলে যাব’ : বীরাঙ্গনা রাজিয়া বেগম

মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রতিদিনের মতো কাজে গিয়েছিলেন রাজিয়া ও তার স্বামী। তবে দুজন দুই জায়গায়। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন গরিবের কোনো শত্রু নেই। তাই সারা দেশে যুদ্ধ চললেও তাদের কাজ একদিনের জন্যও বন্ধ করেননি তারা। কাজের খোঁজে বাংলামোটর (তৎকালীন পাক মোটর) আসতেই কতগুলো অচেনা মানুষ রাজিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। তখনো বোঝেননি রাজিয়া এর পরিণতি কী হবে। কিছু বোঝার আগেই তিনি উপর্যুপরি ধর্ষণের শিকার হন।

সপ্তাহ খানেক পর তিনি শীর্ণ দেহে নিজেকে একটি খালের পাশে পড়ে থাকতে দেখেন। তার আশপাশে কোথাও কেউ নেই! আছে শত শত নিষ্প্রাণ নিথর দেহ, পানির ওপর ভাসছে। মৃত মানুষের গন্ধ আর রক্তে রঞ্জিত পানিতে উঁকি দিচ্ছে শাপলা শালুকের ডগা।

জীবন্ত কোনো মানুষের অস্তিত্ব দেখতে পেলেন না তিনি। এক একটি বীভৎস রাত কেটেছে ওই নির্জন খালে। পেটের ক্ষুধা সহ্য করতে না পেরে বৈরী পরিবেশ উপেক্ষা করে মৃতদেহ সরিয়ে খেয়েছেন শাপলার ডগা আর শালুক। পিপাসা পেলে পান করেছেন রক্তমাখা খালের দুর্গন্ধযুক্ত পানি।

এভাবেই একাত্তরের বঞ্চনার কথা বললেন হবিগঞ্জের নির্যাতিত অপমানিত মা রাজিয়া বেগম।

তিনি জানান, কান্না আর ভয়ে তিনি অজ্ঞান হয়ে যেতেন। পার করছিলেন কত বীভৎস দিন-রাত তার মনে নেই। হেমায়েত বাহিনীর (বীর বিক্রম হেমায়েত উদ্দীন) সদস্যরা তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করেন। জ্ঞান ফিরে দেখেন অচেনা মানুষ, অচেনা জায়গা। আবার চিৎকার করে ওঠেন ভয়ে। কিন্তু সান্ত¡না দেন মানবিক লোকগুলো।

রাজিয়া জানান, বর্তমানে তিনি রাজধানীর তেজগাঁও রেলগেট সংলগ্ন অস্থায়ী বস্তিতে মেয়ের সংসারে থাকেন। মেয়ে আর নাতি-নাতনির অকৃত্রিম ভালোবাসায় বেশ ভালোই আছেন তিনি। একাত্তরের সেই দম বন্ধ করা অন্ধকারের স্মৃতিটুকু ছাড়া বেশ সুখে আছেন। তাই তিনি চান না পেছনের বেদনার কথা স্মরণ করে আবারো তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হোক। বিশেষ প্রয়োজনেও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে চান না তিনি বীরাঙ্গনা। এমনকি কৌতূহলবশতও নাতি-নাতনিরা স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস জানতে চাইলে তিনি তাদের এড়িয়ে যান। এ সব আলোচনা করতে নিষেধ করেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত ইতিহাস আর তার জীবন এক সূত্রে গাঁথা।

কী এক অজানা অভিমানে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রাখেন। সব ভুলে কেবলই চুপচাপ থাকেন তেজগাঁও রেলগেট সংলগ্ন অস্থায়ী বস্তিতে। যেখানে কথা হয় রাজিয়ার সঙ্গে। ছোট্ট স্যাঁতস্যাঁতে ঘর। ঘরে বসার মতো তেমন জায়গা নেই। চারদিকে মানুষের কোলাহল আর ময়লা-আবর্জনার গন্ধ।

সাংবাদিক শুনে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। চোখে মুখে নেমে এল তার রাজ্যের বিষণœতা। কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন তিনি! তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন একাত্তরের কথা। নিজেকে যেন সামলাতেই পারছিলেন না তিনি। এই পঁয়তাল্লিশ বছরে কত মানুষ আইল যাইল। কত কিছু জানতে চাইল। কিন্তু কিছু কী লাভ হইল বল? খালি আমারে দুঃখের কথাটা স্মরণ করিয়ে দেয়া ছাড়া। দুঃখের কথা মনে কইরা কি লাভ? কষ্ট বাড়ে, যন্ত্রণা বাড়ে। ঘুমাতে পারি না। বুক ফাইট্টা কান্না আসে।

এরপর তাকে একাত্তরের ঘটনা বলার জন্য অনুরোধ করলে তিনি যুদ্ধে বিপর্যস্ত হওয়ার দিনগুলোর কথা মনে করেই যেন মুষড়ে পড়েন। তিনি জানান, যুদ্ধের সময়ও তেজগাঁও এলাকায় বাস করতেন। স্বামী-সংসার নিয়ে চলত তার সংসার। দুজনেই ছিলেন শ্রমিক। কখনো ওষুধের দোকানে আবার কখনো বিভিন্ন জনের দোকান পরিচ্ছন্ন করার কাজ করতেন।

রাজিয়ার জন্ম হবিগঞ্জে হলেও তার বেড়ে ওঠা ও বিয়ে ঢাকায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুস্থ শরীর নিয়ে জন্মস্থান দেখার প্রবল আকাক্সক্ষা নিয়ে বাড়ি ফেরেন রাজিয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজিয়ার ওপর যে পাশবিক নির্যাতন হয়েছে সে খবর গ্রামের মানুষ জেনে যায়। তাকে দেখে গ্রামের ছোট বড় সবাই বলাবলি করতে থাকে ‘রাজিয়া নষ্টা। ওরে পর পুরুষে ধর্ষণ করেছে।’ প্রতিনিয়ত মানুষের ছুড়ে দেয়া উপহাসের তীর যখন তাকে বিদ্ধ করতে থাকে তখন রাজিয়া অপমান আর অভিমানে চলে আসেন ঢাকায়। তারপর আর তার ফেরা হয়নি স্মৃতিবিজড়িত গ্রামে। যে গায়ের আলো হাওয়া ধীরে ধীরে রাজিয়াকে রাজিয়া করে তুলেছে।

তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধা স্বর্ণলতা ফলিয়ার সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং ভালোবাসা পেয়েছিলেন। দেখা করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগ্রহ ও অনুপ্রেরণা স্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকবে নিজের জীবনে বলে জানালেন রাজিয়া।

যদি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাই তাহলে জীবনে আর কিছুই চাওয়ার থাকবে না। শুনেছি সরকার এখন বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিচ্ছে। জানি না, আমি এর যোগ্য কিনা। যদি সরকারের স্বীকৃতি পাই তাহলে একাত্তরের ক্ষতচিহ্ন মুছতে না পারলেও সমস্ত অপমান ভুলে যাব। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলব আমিও মুক্তিযোদ্ধা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *