স্মৃতি ১৯৭১ (শেষ পর্ব)

ঈদের পরপরই মিছিরউল্লাহ মোক্তার তার পরিবার সহ গ্রামের বাড়িতে চলে গেলো। বাসায় রয়ে গেলো বহু পুরোন মানুষ বটুমিয়া। আব্বা চিন্তায় পড়ে গেলেন। আমাদের কে কোথাও পাঠানোর জন্য ব্যাস্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু কোথায় পাঠানো যায়? দাদার বাড়ী, নানার বাড়ী এতো দূরে- কে নিয়ে যাবে? মামাদের বলবেন এসে নিয়ে যেতে তারও উপায় নেই। বড় মামা তাঁর পরিবার নিয়ে কোন অবস্থায় আছে কে যানে, মেজ মামা পাকশী পেপার মিলের ইঞ্জিনিয়ার। উনার কথা যা শুনেছি, তাতে গায়ের রক্ত হীম হয়ে যায়। একরাতে পেপার মিলের প্রায় ৩০/৪০ জনকে ধরে নিয়ে যায় পাকসেনারা। মামাও ছিলেন সে দলে। সবাই হাত পিছমোড়া করে বেধে পদ্মার তীরে নিয়ে যায়। সেখানে আরো অনেক লোক কে ধরে আনা হয়েছিলো। সবাই কে সার বেধে দাড় করানো হয়। মামার পাশে তিন/চারজন লোক, তারপরই নদীর খাড়া পাড়। যখন ব্রাশফায়ার শুরু হলো মামা তখন আগেই কাত হয়ে ঐ তিন/চারজনকে নিয়ে নদীতে পড়ে যান। রাতের অন্ধকারে হাত বাধা অবস্থায় চিত হয়ে সাঁতার কাটেন। ক্লান্ত হয়ে এক চরে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান। সকালে গ্রামের মানুষ উনাকে উদ্ধার করে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে ক’দিন থেকে উনি গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে যান। সেজ-মামা ভারতে চলে গেছেন, কেও যানেনা উনি বেঁচে আছেন কিনা। বাকি দুজন মামা তো ছোট। অগত্যা কী আর করা। আব্বা আমাদের নিয়ে সিলেটেই রওনা দিলেন। আমার। দুর-সম্পরকিয় ফুপুর বাসায়। ফুপা হাবিব ব্যাঙ্কে এজিএম ছিলেন। সুবিদবাজারে বাসাটা খুবই নিরিবিলি। সামনে পিটি স্কুল, পিছনে চা-বাগান। আমাদের রেখে আব্বা পরদিনই মৌ্লভীবাজার ফিরে গেলেন।

আব্বার জন্য মন খারাপ হতো, তবে এ বাসায় টেলিফোন থাকায় আব্বার সাথে প্রায়ই কথা হতো। এখানেও রাতেরবেলা স্বাধীনবাংলা বেতার শোনা হতো। এতো সুন্দর সুন্দর গান বাজানো হতো- “তীর হারা ঐ ঢেউ এর সাগর পাড়ি দেবো রে, হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাত বাংলাদেশ, বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, নোঙ্গর তোলো তোলো সময় সে হলো হলো, আরও কত যে গান- শুনলেই বুকের ভিতর কেমন করে উঠত। সুবিদবাজার এলাকাটা মূল শহর থেকে দূরে, গ্রাম গ্রাম মনে হতো, কাছের গ্রাম আখালিয়া হতে তরিতরকারি, হাঁস মুরগি এনে রাস্তার পাশে নিয়ে বসত গ্রামের মানুষ। তাও সকালের দিকে। যখন তখন সাইরেন বেজে উঠত, মাথার উপর দিয়ে প্লেন উড়ে যেত। বুম বুম বোমার শব্দ। সবাই ছুটাছুটি করে ট্রেঞ্চে যেয়ে ঢুকতাম। এমনি করে যখন দিন রাত কাটছিলো, তখন হঠাৎ একদিন আব্বা এসে হাজির।

শুনলাম উনার মুখ থেকে—মুক্তিবাহিনী খুব দ্রুত এগিয়ে আসছিলো, পাকবাহিনী পিছু হঠছিলো। এমন অবস্থায় আব্বা খেয়াল করলেন দল বেধে পাকবাহিনীর গাড়ি শহর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। আব্বার কাছে যেসব মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা আসতো, তারাই আব্বাকে বল্লো, “ ম্যানেজার সাহেব আপনি এখান থেকে চলে যান। ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। শান্তিকমিটির মেম্বারদের আমরা কাফনের কাপড় পাঠানো শুরু করেছি। আমাদের এখন টাকার দরকার। আপনি চলে যান। তবুও আব্বা মনস্থির করতে পারছিলেন না। আমাদের পাশের বাসায় এক ভদ্রলোক নাম সম্ভবত আতাউর রহমান। উনিও উনার দুই ছেলে জুবের আর জুনেদসহ স্ত্রীকে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এক রাতে আতাউর রহমান সাহেব এসে আব্বাকে বললেন, “ আর তো এখানে থাকা যাবেনা। আপনি নাহয় আমার সাথেই গ্রামে চলেন। আব্বা উনাকে বুঝিয়ে বললেন, আমি তো পারমিশন না নিয়ে যেতে পারবোনা। আপনি যান। আমি দেখি কালকে কি করতে পারি।

আর্মির উচ্চপদস্থ অফিসারের অনুমতি ছাড়া সরকারি কর্মকর্তারা কোথাও যেতে পারবেনা, এমনই আইন জারি করা ছিলো। আব্বার উপর্যপরি অনুরোধে সেই অফিসার খুব কড়া ভাষায় আব্বাকে নিষেধ করল। আব্বার মনে খটকা লাগল। রাতের বেলায় বাসা তালা দিয়ে, হারুন ভাইএর সাইকেলে উনাকে নিয়ে আব্বা রওনা হলেন। হারুন ভাইকে উনার গ্রামের মুখে নামিয়ে আব্বা যতদুর সরে আসতে পারেন তাই আসবেন। শহরের মুখে চেকপোষ্টে আব্বাকে আটকানো হল। এক পাঞ্জাবি সেপাই আব্বাকে বলল, তোমার অনুমতিপত্র কোথায়? আব্বা বললেন, অনুমতিপত্র তো দেননি, মেজর সাহেব মুখে বলেছেন। সেপাইটি তখন আব্বাকে বলল, ঠিক আছে, আমার সামনে ফোনে কথা বল, আর আমার সাথে কথা বলিয়ে দাও। চেকপোষ্ট থেকে ঐ অফিসার কে ফোন করা হলে, খুব কড়া ভাষায় আব্বাকে মানা করে অফিসার ফোন রেখে দিলো। সেপাই বলল, কি বললেন অফিসার? আব্বা করুন মুখ করে বললেন, মেজর সাহেব এখন ঘুমাবেন তাই আর ফোন করতে মানা করলেন। এ কথা শুনে সেপাইটা রেগে আগুন হয়ে আব্বা কে বলল, তুমি কি জানো তোমার কপালে কি আছে? যে ব্ল্যাক-লিস্ট করা হয়েছে, তাতে তোমারো নাম আছে। আমরা ডিউটি করে, গুলি খেয়ে মরি, আর উনারা আয়েস করেন, মচ্ছব করেন, আর নাক ডাকিয়ে ঘুমান। যাও, যাও তুমি, ভাগো—। আব্বার কাছে তখন ঐ পাঞ্জাবি সেপাইটি ফেরেস্তার মত মনে হয়েছে। সাইকেল চালিয়ে কিছুদুর আসার পর একটি জিপ আব্বার পাশ কাটিয়ে কিছুদুর গিয়েই আবার ব্যাক করে ফিরে এলো। আব্বাতো তখন মনে মনে কলেমা পড়োছিলেন। আল্লাহ’র অশেষ রহমত, যে ওটা পাক-আর্মির জিপ ছিলোনা। গাড়িতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো, ওদের মাঝে দেওয়ান ফরিদ গাজি, মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান আব্বার পরিচিত ছিলেন। উনারা আব্বাকে জিপে উঠতে বললে সাইকেল রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে আব্বা ওদের সাথে সিলেট আসেন।

কড়কড় শব্দে মাথার উপর দিয়ে প্লেন উড়ে যেত। বোমার শব্দ, গুলির শব্দ, প্লেনের শব্দ, সব মিলিয়ে দিশেহারা অবস্থা। রাতের বেলায় সাইরেন বাজলে আব্বা আমাদের নিয়ে বাসার মাঝখানের একটি রুমে অবস্থান নিতেন। একদিন খুব নিচু দিয়ে প্লেন উড়ে গেলো। কানে তালা ধরানো শব্দে বোমার আওয়াজ শোনা গেলো। সারা বাড়ি কেঁপে উঠল, ঝনঝন করে জানালার কাঁচ ভেঙ্গে গেলো। খুব কাছাকাছি কোথাও বোমা পড়ল। ১৪ই ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ৩/৪ জন মিলিটারি অফিসার এলো বাসায়। খুব বিদ্ধস্ত আর হতাশ চেহারা। অনুরোধ জানালো ওদেরকে রেডিও’র খবর যদি শুনতে দেয়া হয়। বাইরের ঘরে বসে আব্বা, ফুপার সাথে বসে ওরা খবর শুনলো। কিছুক্ষন পাথরের মত বসে থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে গেলো। ১৫ই ডিসেম্বর বারবার
রেডিওতে পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পন করার ঘোষনা দেয়া হল। রাস্তা ঘাটে উতফুল্ল মানুষ বেরিয়ে পড়ল। বাসার সামনে দিয়ে সার বেধে পাকসৈন্যদের মাথা নিচু করে যেতে দেখলাম। ১৬ই ডিসেম্বর সকাল থেকেই রাস্তায় গাড়ির আনাগোনা। অসংখ্য মানুষ দলবেধে বেরিয়ে পড়ল। শুনলাম আজ পাক-বাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পন করবে। আমরাও বেড়িয়ে পড়লাম। শহরের বারুদখানা এলাকায় যে দুটো জায়গায় বোমা পড়েছে তা দেখলাম। দু-জায়গাতেই বোমার আঘাতে ছোটখাট পুকুরের সৃষ্টি হয়েছে। বড় বড় কনভয় ভর্তি মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয়-সেনা, আর মিলিশিয়া। জয়বাংলা ধ্বনীতে আকাশ বাতাস মুখরিত। দীর্ঘ নয়মাস রক্ত ঝরা সংগ্রামের পর এই মাটি স্বাধীন হল। জন্ম হল একটি নতুন স্বাধীন দেশের। বাংলাদেশ।

মৌলভীবাজার ফিরে যাওয়ার আগে আব্বা আমাদের পাকবাহিনীর বর্বরতার চিহ্ন দেখাতে জিপে করে অনেক জায়গায় নিয়ে গেলেন। রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল (বর্তমানে সিলেট ক্যাডেট কলেজ )। ওখানে গিয়ে আমরা দেখলাম হাজার মানুষের ঢল। ওখানে হাজার হাজার বাঙ্গালিদের বন্দী করে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। মেয়েদের বন্দী করে রাখা হয়েছিল। অনেকেই এসেছিল তাদের নিখোজ স্বজনদের খোঁজে। কয়েকটা গনকবর আবিস্কৃত হয়েছে। তখন পর্যন্ত লাশগুলো পঁচে-গলে যায়নি। সে এক বিভৎস দৃশ্য। পঁচা লাশের গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আমাদের জিপে রেখে আব্বা আর ফুফা আরও অনেকের সাথে বিল্ডিঙ্গের ভেতরে গেলেন। একটু পরেই থমথমে মুখে ফিরে এলেন। পরে জেনেছি। টানা লম্বা একটি হলঘরে যেখানে বন্দীদের রাখা হয়েছিলো, এখনো সেখানে মেঝেতে আর দেয়ালে রক্তের দাগ শুখিয়ে কালচে হয়ে আছে।
এখন যারা এয়ারপোর্ট রোডটি দেখেছেন তারা কল্পনাও করতে পারবেন না তখন সেই রাস্তাটি কত দুর্গম ছিলো। দু’ধারে উঁচু খাড়া পাহাড়ের মাঝে আঁকাবাঁকা সরু পথ। পথে মালনিছড়া, লাক্কাতুরা চা-বাগান। সেসব বাগানের কুলিদের বস্তিও পুড়ে ছাই হয়ে আছে। ম্যানেজারের বাংলো গুলিতে বিদ্ধস্ত। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে, রকেট, কামান, মর্টারের গোলা।

মৌলভীবাজার ফেরার সময় সেরপুর সাদীপুর দুটো ফেরী পার হতে হতো। সেসব ফেরীঘাটে গাড়ীর লম্বা লাইনে পড়ে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হয়েছে। তখন দেখেছি। সামনে সারি সারি ভারতীয় মিলিটারি কনভয়। অস্ত্র ভর্তি সেসব গাড়ীতে কালো পোষাকের মিলিশিয়া আর ভারতীয় আর্মী। সাদীপুরে অনেক তাজা গ্রেনেড, মর্টার-শেল পাওয়া গিয়েছে। সেগুলোও তারা গাড়ীতে তুলে নিচ্ছে। পুরো দেশেই এমন অনেক তাজা মর্টার, গ্রেনেড, গোলা-বারুদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। এসব তারা ভারতে নিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধের পর পাক-আর্মি আত্বসমর্পনের পর সব গোলা-বারুদ, অস্ত্র-সশ্ত্র ভারত নিয়ে গিয়ে যেন বাংলাদেশকে সাহায্য করার ঋণ শোধ করে নিলো। এমন কথাই আব্বা আম্মা বলাবলি করছিলেন।

বাসায় ফিরে দেখলাম চেয়ার-টেবিল ছাড়া আর কিছুই নেই। সব কিছু লুট হয়ে গিয়েছে। আম্মা মুষড়ে পড়লেন। ট্রাঙ্ক ভর্তী উনার বিয়ের সময়কার কাঁসার বাসন-কোসন, বিয়ের শাড়ি, আয়না। আয়নাটা ভারী সুন্দর ছিলো। বড় চারকোনা আয়নার চারধার হাতীর দাঁত দিয়ে বাঁধান ছিলো। আব্বার মন খারাপ হলো উনার ছবির এ্যালবামের জন্য। ওটাতে আমাদের ছোটবেলার ছবি আর উনার মায়ের ছবি ছিলো। ঐ ছবিগুলো তো ফেলেই দিবে। যে নিয়েছে তার কাছে তো ওগুলোর কানাকড়িও মূল্য নেই। আর আমার মন খারাপ হলো, দাদার উপহার পাওয়া একটি পিতলের কলসি ও ডিম্বাকৃতির একটি আয়নার জন্য। এ দুটোতেই দাদী আমার নাম খোদাই করে দিয়েছিলেন। ভাগ্য ভালো বইএর বড় বড় কাঠের বাক্সের তালা ভাঙ্গলেও বইগুলো নিয়ে যায়নি। লুট হয়ে যাওয়া দেশে লুট হয়ে যাওয়া সংসারে আমাদের নতুন করে যাত্রা শুরু হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *