১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, ১৮৫ জনের যাবজ্জীবন

পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। এ ছাড়া যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে ১৮৫ জনকে। আর ১৯৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং খালাস পেয়েছেন ৪৯ জন।

আজ সোমবার বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অপর দুই বিচারপতি হলেন মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। আদালত এ রায়কে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে রায়ে বিভিন্ন সুপারিশও করা হয়েছে।

জজ আদালতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া ১৫২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখেছেন হাই কোর্ট। আটজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং চারজনকে হাইকোর্ট খালাস দিয়েছে। সর্বোচ্চ সাজার আদেশের মধ্যে এক জনের মৃত্যু হয়েছে।

জজ আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ পাওয়া ১৬০ জনের মধ্যে ১৪৬ জনের সাজা বহাল রাখা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে; আর হাইকোর্টে খালাস পেয়েছেন ১২ জন।

জজ আদালতে খালাস পাওয়া যে ৬৯ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেছিল, তাদের মধ্যে ৩১ জনকে হাই কোর্ট যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। এছাড়া চারজনকে সাত বছর করে কারাদণ্ড এবং ৩৪ জনের খালাসের রায় বহাল রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে হাইকোর্টের রায়ে এ মামলায় ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য এ মামলায় আসামি ছিলেন ৮৫০ জন। সাজা হয় ৫৬৮ জনের। তাদের মধ্যে বিচারিক আদালতের রায়ে ১৫২ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬০ আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ২৫৬ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছিল। খালাস পেয়েছিলেন ২৭৭ জন।

এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) হাইকোর্টে আসে। সাজার রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তিরাও জেল আপিল ও আপিল করেন। ৬৯ জনকে খালাসের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে।

২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়, শেষ হয় ৩৭০তম দিনে গত ১৩ এপ্রিল। সেদিন শুনানি শেষে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এরপর হাইকোর্ট রায় ঘোষণার জন্য ২৬ নভেম্বর তারিখ ধার্য করেন।

আসামি সংখ্যার দিক দিয়ে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ মামলার রায় পড়া শুরু হয় রোববার সকাল ১০টা ৫৪ মিনিটে। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী বলেন, রায়ে এক হাজার পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ রয়েছে। পর্যবেক্ষণ আলাদাভাবে দিলেও আসামিদের সাজার বিষয়ে তিন বিচারক সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বলে গতকালই জানিয়ে দিয়েছিলেন বিচারপতি শওকত হোসেন।

মামলা সংশ্লিষ্ট আইনজীবী, অ্যাটর্নি জেনারেল ছাড়া আজ আদালতে কাউকে ঢুকতে দেয়া হয়নি। পরিচয়পত্র দেখে সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় স্বজনদের কাউকে রায় শোনার জন্য ভেতরে ঢোকানো হয়নি।

সোমবার দুপুরের পর্যন্ত রায়ের পর্যবেক্ষণে নারকীয় এই হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস ও বর্বরোচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন ইপিআর পাকিস্তান বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত এই বাহিনী দেশে-বিদেশে সম্মানের সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু ২০০৯ সালে পিলখানায় তৎকালীন বিডিআরের কিছু সদস্য আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। এই কলঙ্কচিহ্ন তাদের অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে।

একসঙ্গে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার নজির ইতিহাসে নেই। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় মনোবল নিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যৌক্তিক পদক্ষেপ নিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

সোমবার রায় পড়তে গিয়ে বিচারপতি নজরুল বলেন, তৎকালীন বিডিআরের নিজস্ব গোয়েন্দারা কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে তা আগে জানতে পারেনি, সেই ব্যর্থতা খুঁজতে একটি তদন্ত কমিটি করা দরকার। তিনি মহাপরিচালকের উদ্দেশে বলেন, কোনো সমস্যা এলে তা তাৎক্ষণিক সমাধান করতে হবে। বিজিবির জওয়ানরা কোনো সমস্যা নিয়ে এলে তা মীমাংসা করতে হবে এবং বিজিবিতে সেনা কর্মকর্তা ও জওয়ানদের মধ্যে পেশাদারি সম্পর্ক থাকতে হবে। নজরুল ইসলাম প্রশ্ন করেন, কেন সে সময়ের বিডিআর ডাল-ভাত কর্মসূচি নিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো কর্মসূচি যেন না নেওয়া হয়, সে ব্যাপারে বিজিবিকে সতর্ক করেন তিনি।

আরেক বিচারপতি মো. শওকত হোসেন বলেন, কোনো সেনা কর্মকর্তা সীমান্তরক্ষী বাহিনীতে থাকবে না, এটাই ছিল বিদ্রোহে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মূল মনোভাব। তিনি জওয়ানদের সঙ্গে ঔপনিবেশিক (কলোনিয়াল) আমলের মতো ব্যবহার না করার কথা বলেন। তিনি বলেন, একই দেশ। এখানে সবাই ভাই ভাই।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ওই হত্যাযজ্ঞে ৫৭ কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এই হত্যা মামলায় ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর বিচারিক আদালত রায় দিয়েছিলেন। আজ হাইকোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারপ্রক্রিয়ার দুটি ধাপ শেষ হলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *