১৬ ডিসেম্বর ‘৭১- একটি অন্যরকম গল্প

(এক জায়গায় পড়া একটি স্মৃতি কথা, এক জায়গায় দেখা কিছু ছবি- পাঠক যখন আমি, একটা কিছু নিশ্চয়ই বেরিয়ে যাবে)

আব্বাস একজন ফটোগ্রাফার। বিখ্যাত বললে কম বলা হয়। ১৯৭১ সালেও পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে ভিয়েতনাম বরং অনেক আকর্ষনীয় ছিলো ছবি সাংবাদিকদের কাছে। যে কজন ভিন্নমতের তাদের একজন আব্বাস। ফ্রান্সে অভিবাসী এই ইরানী যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পাকিস্তানে আসেন। প্রথম দিকে পাকিস্তানীরা প্রেস ফটোগ্রাফারদের নিয়ে খুলনা-যশোরের দিকে নিয়ে যেত। ভারতীয়দের আগ্রাসনের প্রমাণ দিতে। ভারতীয় সেনাদের মৃতদেহের ছবি তোলাতো। ডিসেম্বরের শুরুতে ছবিটা পাল্টে গেলো। আব্বাসের লক্ষ্য ঢাকার মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু তারা ধরা দিতে নারাজ। এই পর্যায়ে এসে এক্সপোজড হতে ভয় তাদের।

আমাদের ছবির ঘটনাটা ১৬ ডিসেম্বরের। অন্যদের মতো সেদিনও আব্বাস হোটেল ইন্টারকনের প্রাঙ্গনে ঘুরোঘুরি করছেন। শহরজুড়ে একটাই খবর। মিত্রবাহিনী ঢুকে পড়েছে শহরে, আত্মসমর্পনের বেশী দেরি নেই। এখানে ওখানে জয় বাংলা ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। একটু পর সে ধ্বনি বেড়ে গেলো। আব্বাস এগিয়ে এসে দেখলেন ভারতীয় বাহিনীর জিপ দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে এসে লিফট চাইলেন। গাড়ীতে বসা একজন লেফট্যানেন্ট কর্ণেল। কেএস পান্নু। তখনও আব্বাস জানেন না যার সঙ্গী হয়েছেন তার বীরত্বগাথা।

অবশ্য প্রমাণ পেতে দেরী হলো না। ফার্মগেটের দিকে খানিকটা এগোতেই গাড়ির দিকে গুলি হলো। জিপের সবাই মাটিতে লাফিয়ে শুয়ে পড়লেন। একজন বাদে- পান্নু। দুহাত তুলে এগিয়ে গেলেন দেওয়ালের দিকে, গুলি এসেছে যেখান থেকে। লাফিয়ে আব্বাস সঙ্গী হলেন। তারও হাত তোলা, তবে ডান হাতে রাখা ক্যামেরায় শাটার টিপে চলেছেন। একজন পাকিস্তানী মেজরের নেতৃত্বে একদল সেনা এখানে অবস্থান নিয়েছে। পান্নু তাদের বললেন-পূর্ব পাকিস্তানের কমান্ড আত্মসমর্পন করেছে। ঢাকা শহর এখন মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে গোলাগুলি না করে তারাও যেন এতে যোগ দেয়। মেজর এরপর অধীনস্থদের সঙ্গে কথা বলেন। হেড কোয়ার্টারে ফোন করেন। তারপর নিশ্চিত হয়ে হাত মেলান পান্নুর সঙ্গে। একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কাহিনী এখানেই শেষ।

এবার আসি পান্নুর কথায়। কুলওয়ান্ত সিং পান্নু আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা দখল করেছিলেন। ১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ টাঙ্গাইলে ভারতীয় সেকেন্ড প্যারাট্রুপার বাহিনী তার নেতৃত্বে আকাশ থেকে নামে। পুংলি ব্রিজ দখল এবং ঢাকার দিকে পালিয়ে আসা পাকিস্তানী ৯৩ বিগ্রেডকে বিপর্যস্ত করে টাঙ্গাইল দখল নেন। ১৬ ডিসেম্বর বেলা ১০-৪৫ মিনিটে ঢাকায় ঢোকেন পান্নু ও তার বাহিনী। তার ভাষায় : I had five columns moved out into positions in Dacca taking control of the capital city. ১১টায় ঢাকা আসেন জেনারেল জ্যাকব। আত্মসমর্পনের সব কিছু চূড়ান্ত করেন তিনি। যুদ্ধে বীরত্বের জন্য পান্নুকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পদক মহাবীরচক্র দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

ভিডিও ফুটেজ : পান্নুর নেতৃত্বে ঢাকায় ঢুকেছে সেকেন্ড প্যারা 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *