১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এ উত্তরণ ও বাঙালির চেতনামুক্তি

অতুলপ্রসাদ সেন লিখেছিলেন: ‘মোদের গরব, মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা! তোমার কোলে তোমার বলে কতই শান্তি ভালবাসা।’ এমন লেখা হৃদয়কে আবেগে আপ্লুত করে বারবার। ১৭৬০ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জনগণ কমপক্ষে সতের বার বিদ্রোহ করেছে।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্মের আগে থেকেই বঞ্চিত ও শোষিত বাঙালি জনগোষ্ঠী নিজের ভাষায় কথা বলার জন্য সংগ্রাম শুরু করেছিল। ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সাল থেকে নিয়ে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারী। তবে ভাষার অধিকারের জন্য বাঙালিকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল আরো ৫টি বছর। ১৯৫৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারী পাকিস্তান সংবিধান উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। দীর্ঘ সংগ্রামের পর এলো বাংলা ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতা, আর এই ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত গড়ে উঠেছিল।

বাহান্নর ভাষা আন্দোলনই একাত্তরের সূচনা!
১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালিদের আন্দোলন ছিলো।সংগ্রামে যদি পূর্ববর্তী প্রজন্ম পরাজিত হতো তাহলেও বাংলাভাষা শেষ হয়ে যেতো না; বাংলাদেশের মানুষ বাংলাতেই কথা বলতো এবং শিক্ষিতদেরকে সরকারি চাকরি বা সরকারি সুবিধার জন্যে উর্দুই শিখতে হতো! এখন যেমন ইংরেজি শিখতে হয়!
রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা কি বাংলা ভুলে যেতো? ইংরেজ শাসনামলে ভারতবর্ষের সরকারি ভাষা ছিলো ইংরেজি এবং তারও আগের মুসলিম শাসনামলে দাপ্তরিক ভাষা ছিলো ফার্সি। তাতে তো বাংলা বা ভারতবর্ষের অন্য কোন ভাষা লোপ পায়নি! পুরোটাই আসলে অর্থনীতি, রাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সংগে জড়িত। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করাই ভাষা আন্দোলনের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল এমনটা নয়! বরং এটা বৃহত্তর অর্থে বাঙালিদের স্বাধিকারের দাবি! কথিত মুখের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় স্বীকৃতি দেয়ার অধিকার আদায়ের ১০০% ন্যায়সংগত দাবি।

তখন পাকিস্তানে বিভিন্ন অঞ্চলে মাতৃভাষাভিত্তিক পরিসংখ্যান: ১) বাংলায় কথা বলে প্রায় ৫৪% জন, ২)পাঞ্জাবিতে প্রায় ২৭% জন, ৩)উর্দুতে প্রায় ৬% জন, ৪)পশতুতে প্রায় ৬% জন, ৫)হিন্দিতে প্রায় ৫% জন। সুতরাং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দাবি নি:সন্দেহে ন্যায়সংগত দাবি ছিল।

নিজের মুখের ভাষায় কথা বলতে পারার স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়াহেলার ব্যাপার না! বাঙালি অর্থনৈতিক, রাজনেতিক ও রাষ্ট্রীয় আর কোন ধরনের নিপীড়নই মেনে নিতে পারছিলো না! ভাষা আন্দেলন সাফেল্যই বাঙালির মনের ভিতরের লুকিয়ে থাকা আগুন দপ করে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে রক্ত দিয়েছিল রফিক, সালাম, বরকত, সফিউর, জব্বাররা। তাঁদের রক্তে শৃঙ্খলমুক্ত হলো পূর্ববাংলায় ‘বাংলা’। বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের সংগ্রামের সূচনা সেদিনই ঘটেছিল !

এরপর এক এক করে: ১৯৫৬ সালে সরকারি ভাষায় বিতর্ক, আইয়ুব খানের শাসন, পাকিস্তানে পাঞ্জাবি ও পশতুনদের দেনা বাঙালিদের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া, সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও সামরিক এবং বেসামরিক চাকুরির ক্ষেত্রে বাঙালিদের নগণ্য সুযোগ দেওয়া, জাতীয় রাজস্ব এবং সরকারি সাহায্যের দিক থেকে বাঙালিদের সামান্য অংশ বরাদ্দ ইত্যাদি কারণে এবং জাতিগতভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে বৈষম্যে বাঙালিদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের জন্ম দিল! পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ভাষা আন্দোলনের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আরো বড় অধিকার আদায় ও গণতন্ত্রের দাবিতে ছয় দফা আন্দোলন শুরু করলো। এ আন্দোলনই পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়ে উঠলো!

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের উদ্দেশ্য কি ছিল? তুলে ধরছি: ‘পাকিস্তান রাষ্ট্রটির মৌলিকনীতি ও ধারণার বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক, কল্যাণমুখী, মানবিক ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে এদেশের মানুষের মৌলক অধিকার ও ন্যায়সংগত অধিকার নিশ্চিত করা, জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠা, শোষণ, বৈষম্য, অন্যায়ের অবসান ঘটনা ও সাধারনের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা।’
বাহান্ন ও একাত্তর তাই একই আদর্শ ও উদ্দেশ্য গাঁথা। ১৯৫২ এর সফল ভাষা আন্দোলনই ১৯৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট গঠন, ৬৯-এর গণঅভুত্থ্যান, ১৯৭০ এর নির্বাচন ও সবশেষে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিপ্রস্তর।

১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনই ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয় এনে দিয়েছে, এমনটা নয়। ‘৭১ আসতই! ‘স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়!’ ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ কালো রাতে বাঙালিদের উপর পাক হানাদারদের বর্বরোচিত হামলার পর বাঙালিরা যে সাহস নিয়ে স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী।
অনেকটা ছোট্ট শিশুর মায়ের হাত ধরে এক পা দুই পা করে হাঁটতে শেখার মত !
বাহান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ববাংলার বাঙালির স্বাধিকারের আন্দোলন এবং বাংলাদেশের জন্মের দুই স্তম্ভ।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও ভারত আলাদা স্বাধীনতা লাভ করলেও বাঙালির সার্বিক মুক্তি ঘটেনি। বহুদিনের বঞ্চনা, শোষণ, নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে মুক্ত হয়ে শ্যামল সোনালী আবাসভূমিতে বসতি করার স্বপ্নই মুক্তিযুদ্ধ আর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই ছিল এই স্বপ্নের যাত্রামূল।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের ৩০তম সম্মেলনে ২৮টি দেশের সমর্থনে ২১ ফেব্রুয়ারী দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউনেস্কো। ২০০০ সাল থেকে বিশ্বের ১৮৮ দেশে ২১ ফেব্রুয়ারী কে মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করা হয়ে আসছে।

খারাপ লাগে যে স্মৃতিচারণ শুরু হয় ২০ শে ফেব্রুয়ারী রাত বারোটার পর থেকে! বাঙালি বাংলা ভাষা দিবসে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে খালি পায়ে ছুটে যাচ্ছে ইংরেজি সংস্কৃতির হাত ধরে!! একুশে ফেব্রুয়ারী দিনটা বাংলায় ৮ ফাল্গুন বেশিরভাগ ভুলেই যায়! একটা সোনালী সকালের হাত ধরে দিনটা শুরু করা যায় না? সংস্কৃতিগত দিক থেকে আমরা বাঙালিরা বড় বেশি বিশ্বায়নের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছি!

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি নাম ভুললে চলবে না! তিনি হলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যিনি এই আন্দোলনের এক রূপকার বলা যায়|

আসুন প্রতিটি দিন শুরু করি বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে। ইংরেজি ভাষা বা অন্য কোন ভাষার সাথে বাংলার কোন বিরোধ নেই| বাহান্ন আর একাত্তরের চেতনায় আসুন পূর্ণ বাঙালি হয়ে উঠি|

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *