১৯৭১ এ হারিয়ে যাওয়া বাবলু মামার কিছু কথা!

মায়ের সাথে কথা হয়েছে ১৩ ডিসেম্বর রাতে। আমি যখন ফোন করলাম। মায়ের তখন সকাল। মা তখন বসে সকালের পেপার পড়ছিলেন। মায়ের শরীর এবং অন্যদের খবর জানবার পরই মাকে বলি ,”মা আজ বাবলু মামার কথা শুনবো।” ছোটবেলা থেকে মায়ের মুখে মামা খালাদের গল্প শুনে বড় হয়েছি। বাবলু মামার গল্প ও বহুবার শুনেছি। মা একটু অবাকই হন। মাকে বলি মা বাবলু মামাকে নিয়ে লিখতে ইচ্ছা করছে। মা খুব খুশি হন। আমাদের পরিবারের অনেকেই বাবলু মামাকে নিয়ে লেখালেখি করেছে। মায়ের সবচেয়ে ছোটভাই মীর মনাজ হক বার্লিনে বসে বগুড়ার উপর করা ওয়েব সাইটে মামাকে নিয়ে লিখেছেন।
লিঙ্ক:
http://www.bogra.info/war.html
আমার ভাইজান জাকিউল ইসলাম ফারুকী তার কবিতার বই ,”বাথানের মহিষেরা” উৎসর্গ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে হারিয়ে যাওয়া বাবলু মামার স্মৃতির উদ্দেশ্যে এবং আমাদের হারিয়ে যাওয়া নানা মীর আজিজুল হক এর স্মৃতির উদ্দেশ্য। যিনি সংসার ত্যাগী হয়েছিলেন। যাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনো।
এবার মায়ের মুখে শুনলাম বাবলু মামার বয়স যখন ১০ মাস । তখন নানা একদিন হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রঃ) কে স্বপ্ন দেখেন। যিনি নানাকে বলেন , “তোমার ঘর এ নতুন এমন একজন মানুষের জন্ম হয়েছে, যে থাকলে তুমি সংসারে থাকতে পারবেনা।” এই স্বপ্নের নানা কেমন অদ্ভুত আচরণ করতে থাকেন এবং মামাকে দেখলেই কেমন অস্থির হয়ে উঠতেন।
মায়েরা ১২ ভাইবোনের মধ্যে মামা ছিলেন অস্টম। আমার মা খালাদের আদরে মামা বড় হতে থাকেন। নানা মাঝে মাঝেই আজমীর শরীফে চলে যেতেন। একবার গিয়ে আর ফিরে এলেন না। তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনো।বড় মামা মীর মাহমুদুল হক এবং মেজোমামা মীর হায়দার আজম ছাড়া সবাই তখন স্কুলের ছাত্র।
বড় মামা এবং মেজোমামার ছায়ায় একসময় এই পরিবারের ছোটছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে লাগলো। আর নানী ও ছিলেন অসম্ভব বুদ্ধিমতী একজন মানুষ।

বাবলু মামাকে সবাই ডাকতো রাঙা মামা বলে। আমাদের ৭ মামার সবারই এমন প্রিয় কিছু নাম ছিলো। কে জানতো এই রাঙা মামা সত্যিই একদিন তাঁর স্মৃতিতে রাঙিয়ে চলে যাবেন। আমাদের পরিবারের অনেকের কাছে বাবলু মামা শুধু একটা নাম হয়ে আছেন। বগুড়ায় সুলতানগঞ্জ পাড়ায় “হামিদা বাগ” বাড়িটায় ঢুকলে বসার ঘর এর দেয়ালে কয়েকটা সাদাকালো ছবি। আমাদের নানার আর মামাদের । আমরা ছোটবেলায় ছবি দেখে দেখে নাম বলতাম। বাবলু মামাকে ঐ ছবি দেখেই চেনা।
মামা পশ্চিম পাকিস্তানের কাকুলে গিয়েছিলেন আর্মির ট্রেনিং এর জন্য। কমিশন পাবার তিনদিন আগে একদিন খাবার টেবিলে বসে একজন বাঙালীকে পাকিস্তানীরা যখন তার তোতলামীর জন্য ব্যঙ্গ করছিলো ,মামা এর বিরোধীতা করেন এবং শুধু এই কারনেই কমিশন পাবার তিনদিন আগে দেশে চলে আসেন। এসে সোজা লালমনিরহাট এ তাঁর মেজবু (আমার মায়ের) কাছে চলে আসেন। পরিবারের একটা চাপ তো ছিলোই ,কদিন পরই কমিশন অফিসার হয়ে যেতেন! এর কিছুদিন পর যান রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমীতে। সেখান থেকে দারোগার ট্রেনিং নিয়ে পুলিশের সাব ইনস্পেক্টর হন। সেখানেও ঘুষ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চাকরী ছেড়ে দেন ।
এরপর মামা রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাস এ এম এ করেন। এবং বগুড়ায় চন্দন বাইসা নামে এক কলেজে অধ্যাপনার কাজ নেন।

১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ এ পাকিস্তান আর্মিরা যখন ঢাকায় নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করে ,তখন মামা তাঁর আর্মি অফিসার বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। এবং বাংলাদেশী সাংবাদিকদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানীদের নির্মমতার এবং বর্বরতার কথা তুলে ধরবার জন্য কাজ শুরু করেন।
২৭ এবং ২৮ তারিখে উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যান এবং শামসুন্নাহার হল এবং রোকেয়া হলের মেয়েদের উপর অত্যাচারের খবর তৈরী করেন এবং ছবি তোলেন। বাসায় ফিরে উনি আমার খালাকে বলেছিলেন,”এমন বর্বরতা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায়না”। ২৯ তারিখে সকালে খালা মামাকে বাসা থেকে বের হতে দিতে চাননি। বলেছিলেন ,”তোর কিছু হয়ে গেলে মা কে কি জবাব দেবো?”
মামা অনুরোধ করায় বাইরে যেতে দিয়েছিলেন। যাবার সময় খালা ডাঃ সফুরা খাতুনের ছুটির দরখাস্তটা নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের আউটডোরে পৌছে দিয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু এরপর মামা আর ফিরে আসেন নি।

মীর মকসুদুল হক আমাদের বাবলু মামা,
যিনি একজন আর্মি অফিসার হতে পারতেন
যিনি পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর হয়েছিলেন।
যিনি কলেজে পড়াতেন।
যিনি সাংবাদিকতা করতেন শখে।
………………………..হারিয়ে গেলেন।১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে।

আমার নানা হারিয়ে গিয়েছিলেন। অলিখিত কোন কারনে আর ফিরে আসেন নি। নানী মাসের পর মাস, বছরের পর বছর তাঁর জন্য রাতে ভাত রেখে দিতেন। যদি গভীর রাতে এসে পড়েন নানা। মামার জন্যও এর পর খাবার রেখে দিতেন।
যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।
আমার অন্য মামারা যুদ্ধ শেষে দেশে ফিরেছে।
শুধু ফিরে আসেনি বাবলু মামা। অদ্ভুত সেই মানুষটা যে কখনো অন্যায় এর সাথে আপোষ করেনি। যে কাকুলে মিলিটারী একাডেমীতে পাকিস্তানী অফিসারদের বলে এসেছিলো,”তোমাদের দিন আর বেশী নাই।”
এমন মানুষের রক্ত দিয়ে গড়া আমাদের দেশ…………আমাদের পতাকার লাল এ আমাদের রাঙা মামার রক্তও লেগে আছে।
আমার ভাইজানের বই এ উৎসর্গে লেখা আছে,
 নানা মীর আজিজুল হক
যিনি সংসার ত্যাগী হয়েছিলেন
তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি কখনো
মামা মীর মকসুদুল হক
মুক্তিযুদ্ধের পর যিনি ফিরে আসেন নি,
কোথাও হারিয়ে গেছেন।
তাঁরা কি মৃত্যুহীন!
এদেশের প্রতিটি পরিবারের
হারিয়ে যাওয়া
তাঁদের
প্রতি
যাদের কবর নেই
আছে স্মৃতি সৌধ…..আর রক্তক্ষরণের বেদনা।

রাঙা মামা আমরা আপনাকে ভুলবোনা।
আপনাদের ভুলবোনা।
যেই দেশের স্বপ্ন আপনাদের চোখে ছিলো ।সেই দেশ আমাদের হয়েছে।
মানচিত্রে বাংলাদেশ জ্বলজ্বল করছে।
আজ দেশ থেকে বহুদুরে এসেও আপনাদের মনে করি। আমাদের সন্তানরা যারা এখানে জন্মেছে বড় হচ্ছে ,তারাও জানে আমাদের দেশের একটা গৌরবময় ইতিহাস আছে। তবু কোথায় যেনো কি অপূর্ণ রয়ে গেছে! দেশটা স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু কোথায় যেনো কি বাকি রয়ে গেছে।
এই সংশয় থেকেই ইত্তেফাকের ডিসেম্বর ১৬, ২০১০, বৃহস্পতিবার : ২ পৌষ, ১৪১৭ তারিখের লেখায় মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন,

“স্বাধীনতার প্রায় চল্লিশ বছর পার হবার পর আমাদের একই সাথে সম্পূর্ণ নতুন একটা উপলব্ধি হয়েছে। পৃথিবীর নৃশংসতম প্রাণী পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর তাদের আজ্ঞাবহ অনুচর রাজাকার আলবদরদের পরাজিত করতে সময় লেগেছিল মাত্র নয় মাস। কিন্তু যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে আমরা নয় মাসে দেশটি স্বাধীন করেছিলাম, সেই বাংলাদেশ তো আমরা এখনো গড়তে পারিনি। দেখতে দেখতে চল্লিশ বছর হতে চললো, এখনো তো আমরা জোরগলায় বলতে পারি না যে, আমরা আমাদের দেশটি পেয়েছি। আমাদের কী এখন মনে হয় না, স্বাধীনতা অর্জনটুকুই বুঝি সহজ ছিল- মাত্র নয় মাসে সেটা পেয়েছি। স্বপ্নের দেশে পরিবর্তন করাই বুঝি কঠিন- চল্লিশ বছরেও সেটা সোনার হরিণ হয়ে আমাদের স্পর্শের বাইরে থেকে গেল। নতুন প্রজন্ম মাঝে মাঝে দুঃখ করে আমাকে বলে, ‘ইশ! আপনারা কী সৌভাগ্যবান-আপনাদের প্রজন্মের মানুষেরা দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পেরেছে।’
তাদের কথা একশ’ ভাগ সত্যি। কিন্তু স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর আমরাও তাদেরকে বলতে পারি, ‘তোমরাও কম সৌভাগ্যবান নও। স্বাধীনতা অর্জনের মতই কঠিন একটা কাজের সুযোগ তোমরা পেয়েছ। সেটা হচ্ছে দেশটাকে নিজের পায়ের ওপর দাঁড় করানো! সেই সুযোগটাই আর কয়জন পায়?’
আজ বিজয়ের দিনে আমরা নতুন প্রজন্মকে সেই কথাটাই মনে করিয়ে দিই!”

লিঙ্ক:
Click This Link

আসলেই নতুন প্রজন্মের সবাইকে বলি, “তোমরাই পারবে। যেমন করে রাঙা মামার মতন মানুষেরা পেরেছিলো স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে।
তোমরা পারবে এই দেশটাকে পৃথিবীর মানচিত্রে সন্মানজনক জায়গায় নিতে। আমরা সবাই তাকিয়ে আছি। হয়তো কোথায় না কোথাও থেকে সেইসব শহীদ মুক্তিসেনারাও দেখছে!

তোমাদের জয় হোক নতুন প্রজন্ম!
ষোল কোটি মানুষের জয় হোক!”

মায়ের সাথে কথা বলার ফাঁকে মা বললেন,’কত বই পড়ি মা। কত ইতিহাস।সব এখন গল্প। বাবলু এখন গল্প হয়ে গেছে।”
আমি বললাম মা ,” বাবলু মামা তো বাংলাদেশ মা। বাবলু মামা হলেন বাংলাদেশের পতাকা।”
ওপাশে মা হঠাৎ চুপ করে গেলেন।
প্রায় চল্লিশ বছর আগে হারিয়ে ফেলা ভাইটার জন্য গলা আটকে আসলো মায়ের। আমি বললাম , মা আজ রাখি।
এপারে চোখ তো ভেসে গেলো আমার ও মা!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *