১৯৭১: জামাত নেতা কামারুজ্জামানের নির্দেশে চলে পাশবিক নির্যাতন

রাষ্ট্রীয় সহায়তা ও নিরাপত্তা পেলে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসর যুদ্ধাপরাধী জামালপুর, টাঙ্গাইল ও শেরপুরের দায়িত্বে থাকা আল-বদর কমান্ডার জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিচারের জন্য আইনের আশ্রয় নিতে চান পাকিস্তান গ্যারিসনে সারেন্ডার লেটার বহনকারী ১১ সেক্টরের সাহসী মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী বীরপ্রতীক (বার)। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে হলে দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প শুনাতে হবে। আর দেশের জন্য যারা শহীদ হয়েছেন
প্রতিটি স্কুল-কলেজ তাদের নামানুসারে নামকরণেরও দাবি জানান তিনি।

একাত্তরের উত্তর রণাঙ্গনে পাকিস্তানি হানাদারদের সব চেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি জামালপুরকে মুক্ত করতে মরণপণ লড়াই করেন ১১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। দীর্ঘ ৯ মাস দফায় দফায় সম্মুখ যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর শক্তিশালী কামালপুর ঘাঁটির পতন ঘটান ১১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। কামালপুর মুক্ত হওয়ার ৫ দিনের মাথায় জামালপুরে পাকিস্তান বাহিনীর ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টার চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে মুক্তি ও মিত্রবাহিনী। ৯ ডিসেম্বর ফ্যাস্ট মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার এইচ এস ক্লে স্বাক্ষরিত একটি সারেন্ডার লেটার দিয়ে জহুরুল হক মুন্সীকে পাঠানো হয় জামালপুর পাকিস্তান গ্যারিসনে।

সাদা পতাকা নিয়ে বাইসাইকেলযোগে তিনি সন্ধ্যায় পৌঁছে যান জামালপুর শহরের পিটিআইয়ে অবস্থিত পাকিস্তান গ্যারিসনে। সেখানে পৌঁছার পর তার হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলে পাকিস্তান হানাদাররা। পরে তাকে জিপের চাকায় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল সুলতান মাহমুদের কাছে। সেখানে জামালপুর, টাঙ্গাইল ও শেরপুরের দায়িত্বে থাকা আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার (বর্তমানে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী জেনারেল সেক্রেটারি) কামারুজ্জামানের নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে তার ওপর চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। একপর্যায়ে রাইফেলের বাট দিয়ে পিটিয়ে তার দাঁত ভেঙে দেয়া হয়। এরপর বেনয়য়েট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারাত্মক আহত করে সিলিংয়ে পা বেঁধে ৪ ঘণ্টা ঝুঁলিয়ে রাখে পাকিস্তান বাহিনী। রাতে তার কানে একটি বুলেট বেঁধে সারেন্ডারের পরিবর্তে যুদ্ধ ঘোষাণার চিরকুট দিয়ে ফেরত পাঠানো হয় তাকে। এরপর শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। স্থলপথের পাশাপাশি আকাশ পথে চলে ভারতীয় বোমারু বিমানের হামলা। ভারতীয় বোমারু বিমান থেকে হাজার পাউন্ড ওজনের ২টি বোমা নিক্ষেপ করা হয় ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের হেডকোয়ার্টারে। এরই মধ্যে রাতের আঁধারে ২০০ সেনা নিয়ে পালিয়ে যান ঘাতক লে. কর্নেল সুলতান মাহমুদ। পরে ৩৭৬ জন পাকিস্তান সেনা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। শত্র“ মুক্ত হয় জামালপুর। আর জামালপুর মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সূচিত উত্তরবঙ্গসহ ঢাকাসহ বিজয়ের পথ।

বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সীর অভিযোগ, জামালপুর, টাঙ্গাইল ও শেরপুরের দায়িত্বে থাকা আল-বদর বাহিনীর কমান্ডার বর্তমানে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজামান ওরফে কামারুর নির্দেশে এবং উপস্থিতিতে পিটিআইয়ের পাকিস্তান গ্যারিসনে তার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। ভয়াঙ্কর এই যুদ্ধাপরাধীর বিচার দাবি করে জহুরুল হক মুন্সী বলেন, রাষ্ট্র যদি তাকে সহায়তা করে এবং জান-মালের নিরাপত্তা দেয় তা হলে তিনি যুদ্ধাপরাধী কামারুজ্জানের বিচারের জন্য আদালতের আশ্রয় নেবেন। তিনি একান্ত এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন।

এ ব্যাপারে জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সীকে তিনি চেনেন না জানিয়ে বলেন, ১৯৬৯ সাল থেকে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন। কাজেই পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাম্পে উপস্থিত থাকা তো দূরের কথা আল-বদর বাহিনীর সঙ্গেও তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। মুক্তিযোদ্ধা জহুরুল হক মুন্সী মিডিয়ার কাছে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ভিত্তিহীন এবং তার মনগড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published.