১৯৭১ সালে মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে চট্টগ্রাম উত্তপ্ত হতে থাকে

১৯৭১ সালের ৩ মার্চের পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে ১ মার্চ থেকে সাধারণ মানুষের স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম উত্তপ্ত হতে থাকে।
এই স্থগিতের ঘোষণা বাঙ্গালীদের শান্তিপূর্ণ ও বৈধ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর অব্যাহত ষড়যন্ত্রের একটি অংশ ছিল।
সেদিনের কথা স্মরণ করে ছাত্রলীগের অন্যতম নেতা ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ এবং শ্রমিক সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে হাজার হাজার লোক স্বতস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আসে।
তিনি বলেন, ‘জনগণ ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবী জানায়।’
সরকারি-বেসরকারি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কল-কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। এটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের অংশ যা নগরীকে আন্দোলনের উত্তপ্ত এলাকায় পরিণত করে।
এরপর আন্দোলনকে আরো বেগবান করতে ২ মার্চ কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বৃহত্তর চট্টগ্রামে ৩ মার্চ হরতাল দেয় আওয়ামী লীগ। সেই সঙ্গে ৩ মার্চ বিকেলে লালদীঘি ময়দানে সমাবেশেরও ঘোষণা দেয়া হয়।
ন্যাপ, ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন এই হরতালের প্রতি সমর্থন জানায়।
৩ মার্চের হরতালে জনজীবন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে পড়ে। হরতাল শেষে লালদীঘি ময়দানে সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সিরাজুল হক মিয়া। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা পোড়ানো হয়। এরপর নগরীতে সব পাকিস্তানী পতাকা পুড়িয়ে ফেলে উত্তেজিত জনতা।
পাকিস্তানী পতাকা অব্যাহতভাবে পোড়াতে থাকলে নগরীর বিহারী অধ্যুষিত এলাকায় বাঙালী ও উর্দু ভাষী বিহারীদের মধ্যে দাঙ্গা বেধে যায়।
দাঙ্গা দমন নিয়ন্ত্রণের নামে প্রতিবাদী বাঙ্গালীদের ওপর পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের দোসরদের র‌্যালি ও হামলায় প্রায় একশ’ লোক নিহত এবং কয়েকশ’ লোক আহত হয়।
বিহারী কলোনী এলাকায় আবুল কালাম নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হলে লালদীঘি ময়দানে অনেক প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে বিহাী অধ্যুষিত ওয়ারলেস কলোনী, পাহাড়তলী ও আমবাগান একটি ভীতিকর এলাকায় পরিণত হয়।
দৈনিক আজাদী পত্রিকায় বলা হয়, দাঙ্গায় কমপক্ষে ৭০ জন নিহত ও কয়েকশ’ লোক আহত হয়। পরে স্থানীয় এবং ঢাকাভিত্তিক বিভিন্ন পত্রিকা ১২০ জনের নিহত হওয়ার খবর দেয়।
আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), খেলাফতে রব্বানী ও জামায়াতে ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যবসায়ী সংগঠন নিন্দা জানিয়ে দাঙ্গা বন্ধের আবেদন জানিয়ে বিবৃতি দেয়। ‘বাঙ্গালীর জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম : মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ নামক বইতে একথা উল্লেখ রয়েছে। বইটির লেখক ড.মাহফুজুর রহমান।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের রক্ত দিতে আওয়ামী লীগ জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়।
১৯৭১ সালের ৫ মার্চ আওয়ামী লীগের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের দেখতে যান।
চট্টগ্রামে দাঙ্গা বন্ধে একটি সর্বদলীয় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এ ব্যাপারে রাইফেল ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকীকে সর্বদলীয় শান্তি কমিটির আহ্বায়ক করা হয়।
কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাঙ্গা বন্ধ এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে নগরীর সর্বত্র শান্তি কমিটি গঠন করা হয়।
এই উস্কানীমূলক ঘটনা যাতে জনগণের আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে না পারে সেজন্য এই শান্তি কমিটি গঠন করা হয়।
এরপর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে নগরীর বিভিন্ন স্থানে গেরিলা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *