‘৭১ এর এই দিনে…. বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান

আজ ২৮ অক্টোবর রোববার মহান বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৩৬ তম শাহাদত বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই রণাঙ্গনে সম্মুখযুদ্ধে দেশের জন্য জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামের সন্তান সিপাহী হামিদুর রহমান।

স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যে ৭ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয় সিপাহী হামিদুর রহমান তাদের একজন। আর স্বাধীনতা যুদ্ধের ৩৫ বছর পর তার স্মৃতি রক্ষার্থে নির্ম্মান করা হয় স্মৃতিস্তম্ভ। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে আনার সিদ্ধান্ত হলেও কোন পথে নিয়ে আসা হবে তা নির্ধারন হয়নি।

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে কমলগঞ্জের ধলাই সীমান্ত এলাকায় প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল। চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে ধলাই সীমান্ত চৌকি। ধলাই সীমান্ত চৌকি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরে ছিল মুক্তিবাহিনীর সাবসেক্টর ক্যাম্প। সব প্রস্তুতি নিয়ে ২৮ অক্টোবর ভোর রাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে একটি দল পাক সেনাদের উপর চতুর্দিক থেকে সাঁড়াশি আক্রমন চালায়। ব্যাপক গোলাবর্ষনে পাক সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। প্রচন্ড গুলিবর্ষন ও পাকবাহিনীর পেতে রাখা মাইন বিষ্ফোরণে বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধা হতাহত হন। সৈনিক হামিদুর রহমান সীমান্ত চৌকি দখলের উদ্দেশ্যে মৃত্যুকে তুচ্ছ করে হালকা একটি মেশিনগান নিয়ে বিপ্তি গোলাগুলির মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে শত্রুপরে ৫০ গজের মধ্যে ঢুকে পড়েন। গর্জে উঠে তার হাতের মেশিনগান।
শত্রুদলের অধিনায়কসহ বেশ কয়েকজন সৈন্য এতে প্রাণ হারায়। এমন সময় শত্রুসৈন্যের একটি বুলেট হামিদুর রহমানের কপালে বিদ্ধ হয়। ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তের তৎকালীন ইপিআর বর্তমান বিডিআর ফাঁড়ির সামনে এক সম্মুখ যুদ্ধে মরনপন লড়াই করে সিপাহী হামিদুর রহমান মৃতূবরন করেছিলেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ সময় পর ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সীমান্ত রী বাহিনীর উদ্যোগে সর্বপ্রথম কমলগঞ্জ উপজেলার ধলাই সীমান্ত চৌকির পাশে নির্ম্মাণ করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিফলক। মহান এই বীরশ্রেষ্ঠের সম্মানে এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মানের দাবী দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাস্তবায়িত হয়। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে ১০ শতাংশ জায়গার উপর সাড়ে ১৪ ল টাকা ব্যয়ে গণপূর্ত বিভাগ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্ম্মাণ করে। ২০০৬ সালের ১ জুলাই তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম, সাইফুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করেন। সাথে সাথে কমলগঞ্জ পৌরসভার ভানুগাছ- মাধবপুর সড়কটিকে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়।

৭ জন বীর শ্রেষ্ঠের মধ্যে ২ জনের কবর ছিল বিদেশের মাটিতে। গত বছর ২৪ জুন পাকিস্তানের করাচী থেকে বীর শ্রেষ্ঠ ফাইট ল্যাঃ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিল। বাকী বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আমবাসা এলাকা থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ইতিমধ্যে সরকার উদ্যোগ গ্রহন করেছে। অতিসম্প্রতি ঢাকায় বিডিআর ও বিএসএফের মধ্যকার ৫ দিনব্যাপী সম্মেলনের প্রথম দিনে সিদ্ধান্ত গ্রহীত হয়েছে বিজয়ের মাস আগামী ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে বীর শ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে। শীঘ্রই ৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের ত্রিপুরা যাবেন।

বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ৩৬ তম মৃতূø বার্ষিকীতে কমলগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধারা েভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে পাঠ্য পুস্তকসহ বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে কমলগঞ্জ উপজেলার ধলই সীমান্তকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার ধলই সীমান্ত বলা হচ্ছে। কমলগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্যাঃ (অবঃ) সাজ্জাদুর রহমান প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এনিয়ে সরকারের বিভিন্ন মহলে বহুবার বলা হয়েছে যে, ধলই সীমান্ত কমলগঞ্জ উপজেলাধীন। এই ভুল সংশোধন করার ব্যাপারে সরকারীভাবে কোন উদ্যোগ গ্রহন করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের সাথে তিনিসহ কমলগঞ্জের বহু মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করেছিলেন। তারা দাবী করে বলেন, ভারতের আমবাসা থেকে অতি সহজে কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর চেকপোষ্ট দিয়ে বাংলাদেশে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে নিয়ে আসা যাবে। এতে করে সহজে বাংলাদেশে তার দেহাবশেষ প্রবেশ করবে আর কমলগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা শেষবারের মত তার কফিনটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবে।
এব্যাপারে আলাপকালে ত্রিপুরায় গিয়ে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের কবর চিহিßতকরন দলের সদস্য ল্যাঃ কর্ণেল(অবঃ) সাজ্জাদ এ জহির বলেন, বিষয়টি নির্ভর করছে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের উপর। তাই এখন সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না যে কোন পথে ও কিভাবে দেহাবশেষ বাংলাদেশে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *