৭১ – এর সাহসী “মা”; শেরিফ আল সায়ার

চমৎকার এই লিখাটি আজই পোষ্ট করেছেন শেরিফ আল সায়ার। একাত্তরের যুদ্ধে মা’দের ভুমিকা নিয়ে কোথাও লেখা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এই লিখাটি আমাকে মুগ্ধ করলো। সকলকে পড়ার অনুরোধ করলাম।

আইরিন সুলতানার “১৯৭১ : বীরাঙ্গনা অধ্যায়” পোষ্টটা স্টিকি করার আহবান জানিয়েছিলাম। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সাড়া দেননি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রতিবেলায় যে কারও একটি দলিল ভিত্তিক পোষ্ট আমি কপি-পেস্ট করে পোষ্ট করবো। হয়তো ব্লগ কর্তৃপক্ষ আমাকে এর শাস্তি দিবেন। যদি কেউ আমার সিদ্ধান্তটিকে মেনে না নেন তাহলে বলবেন; আমি তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো।
———————————————————————————

মা শব্দটার মর্ম কিংবা গভীরত্ব অনেক। মা’র যে পরম মমতা তা কখনোও কেউ ব্যাখ্যা করতে যায়ও না। সন্তানকে দশমাস দশদিন পেটে ধারণ করার পর প্রসবের যে যন্ত্রণা তা মা ছাড়া আর কেই বা অনুভব করতে পারে!
তবে আমাদের সমাজে মা মানে খুব অসহায় একজন মানুষ। যার কাজ শুধু আচলে চোখ মুছা আর অঝোরে কেঁদে যাওয়া। ইতিহাসও মাদের সাহসের কথার চেয়ে অসহায়ত্বের কথাই বেশী বলে। যেমন, আমাদের মুক্তিযুদ্ধে মাদের অবদান কি? এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে সকলেই বলবে, তাঁর ত্যাগ। তাঁরা তাঁদের অমূল্য বুকের ধনকে মুক্তিযুদ্ধে যেতে দিয়েছেন। তাঁরা অনেকে হারিয়েছেন তাদের সন্তানকে। তাঁরা কেঁদে চলেছেন; এসব গল্পই আমরা শুনি। কিন্তু তাঁদের সাহসের কথা কেউ বলে না। কেউ বলে না মা’রা খুব সাহসের সাথে তাঁদের ছেলেদের যুদ্ধে পাঠিয়েছেন। তাঁরা তখন মায়ার সমস্ত বন্ধন ছিঁড়ে ছেলেকে অনেকটা উৎসর্গ করেছেন। তারা এজন্য আফসোস করেননি কখনও! এসব কথা ইতিহাস বলে না।

একবার একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অনুষ্ঠানে এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মাকে আনা হয়েছিল। তিনি খুব গরীব ছিলেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মাকে অর্থ সহায়তা প্রদান এবং ছেলের স্মৃতিচারন করবার জন্য। সেই মা মঞ্চে উঠেই অঝোরে কাঁদলেন; তারপর বললেন, এদেশে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছিল এ কথাই বার বার বলা হয় কিন্তু কেউ বলে না সেই ৩০ লক্ষ মানুষের মা ছিল। ৩০ লক্ষ মাও যে শহীদ হয়েছিল। সে কথা কেউ বলে না।
তারপর তিনি তাঁর ছেলেকে নিয়ে কিছু স্মৃতি কথা বললেন। অর্থ সহায়তার বিষয়ে বলেন, টাকা দিয়ে কি করবো!! টাকা দিলে দু’বেলা না হয় পেট ভরে খেতে পারবো। টাকা যখন শেষ হয়ে যাবে! তখন? তখন কি হবে? আমার এই টাকা চাই না। আপনারা আমার ছেলেকে মনে রাখবেন এতেই আমি খুশী।

মারা হয়তো এমনই হয়। খুব শান্ত এবং বাস্তববাদী। মা’রা অঝোরে কাঁদবেন ঠিকই কিন্তু সেই কান্নার শব্দ বুঝতে দেবেন না কাউকে। তারা সাহসের সাথে যে কোনো বাস্তবতার মোকাবেলা করে যাবে। ৭১-এ বাস্তবতা ছিল সে রকম। ছেলেকে যুদ্ধে পাঠাতে হবে না হলে দেশ স্বাধীন হবে কি করে! অনেক মা’রা মায়ার বন্ধন ছিড়তে পারেননি। তাই ছেলেকে যুদ্ধে যেতে বাধা দিয়েছেন। কিন্তু সেই ছেলে ঘর থেকে পালিয়ে চলে গেছে যুদ্ধে। এতে মা কষ্ট পেয়েছেন। ছেলে হারাবার বেদনায় কেঁদেছেন ঠিকই কিন্তু মনে মনে গর্ব করেছেন নিশ্চই।
যতযাই হোক মুক্তিযুদ্ধের সময়গুলোতে সব মা’রাই ছিল ত্যাগী, সাহসী, ধৈর্যশীল এবং সহনশীল তো বটেই।

যেমন, বাংলাদেশের সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল একজন ক্রিকেটার ছিলেন। তিনি যুদ্ধে শহীদ হন। জুয়েলের মৃত্যুর খবর যখন তার মা কাছে এসে পৌছায়। তখন তিনি বলেন,
যে ক্রিকেটকে ভালোবাসতো, সে স্টেনগান হাতে নিল, আমি মা হয়ে মানা করিনি। নিজের চোখে যখন দেখলাম অসংখ্য মানুষ মিলিটারীর হাতে প্রাণ দিচ্ছে তখন বাছাকে আমি মানা করি কিভাবে? আমি জানতাম স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন প্রাণকে উৎসর্গ করে তার পরিণতি কি হয়। তাই ছেলের মৃত্যুতে আমি অবাক হইনি।

আবার, বাংলাদেশের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কাদের সিদ্দিকি বীরউত্তম; মুক্তিযোদ্ধাদের মাদের কথা বলতে গিয়ে যুদ্ধের সময়কার একটি ঘটনার উদ্ধৃতি দেন। তিনি বলেন,
কাউলজানী বাজার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বাদিয়াজানে ঘাটের সোজা পাঁচশত গজ পূর্বে কাউলজানীর চৌধুরী বাড়ি। … এই বাড়ির বা পাড়ায় পঁচিশ ত্রিশজন তখন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেছে। আমি মাত্র মিনিট খানেক হলো বৈঠকখানায় বসেছি। এর মধ্যেই রঞ্জুর মা এলেন। এসেই রঞ্জুর খোঁজ খবর নিলেন। একটু পরে এলেন ডা. শাহজাদা চৌধুরীর মা। তিনিও ছেলের খোঁজ-খবর নিলেন। এরপর চৌধুরী বাড়ির সবচাইতে ধনী পরিবারের একজন মা, তার সঙ্গে দশবছরের একটি ছেলে নিয়ে এলেন, নাম নজরুল ইসলাম চৌধুরী। মায়ের বয়স চল্লিশ-পয়তাল্লিশ। তিনি এসেই তাঁর ছেলে হাত আমার হাতে দিয়ে বললেন, ওর বাবা ছয় সাত মাস আগে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন। আমাদের পয়সা কড়ির অভাব নেই। এই-ই আমার একমাত্র ছেলে। একে দেখাশোনার করার অভিভাবকের অভাব আছে। তুমি আমার বড় ছেলে, এর দায়িত্ব বাবা, তুমি নাও।

এভাবেই মা’রা সেদিন তার সন্তানকে সাহসের সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। সেই মা’দের অবদান ইতিহাসে তেমন একটা চোখে পড়ে না। যে মা’রা তাদের অমূল্য সম্পদকে এভাবে দেশের জন্য ত্যাগ করেছেন তারা কেউ কোনো ধরনের ক্ষতি পূরণ দাবি করেননি। সব ধরণের অর্থসাহায্য তারা খুব বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তারা তাদের অন্তরে তাঁদের ছেলেদের লালন করছেন তাঁদের মতো করে। যেমন, জাহানারা ইমামের বাসার দেয়ালে রুমির সামরিক পোশাক পরা তৈল ছবি দেখা যাবে। গেরিলা যোদ্ধা রুমির কখনও সে পোশাক পরা হয়নি। এটা হয়তো ছেলের স্বপ্ন ছিল। তাই কল্পনায় সেই পোশাক পরিয়ে ছেলেকে তিনি ফ্রেম বন্দি করেছেন। যার নিচে লেখা- আবার অসিবো ফিরে এই বাংলায়।
৭১-এ অধিকাংশ মা’দের সন্তান যুদ্ধে গিয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে। সে শহীদ যোদ্ধাদের মা’রা যখন দেখেন এ জাতি সেই স্বাধীনতার মূল্য দিচ্ছে না। তখন বেদনায় কাতর সেই মাদের কথা একটু ভাবুন তো। রুমির সেই স্বপ্ন যেমন মা তার কল্পনা দিয়ে সাজিয়ে একটা চিত্রে দাঁড় করিয়েছেন সে রকম এই দেশটার স্বপ্ন তারা কি করে নিজের কল্পনায় দাড় করাবেন!

শেষ করবো একটি ভিন্ন ধরনের একটি গল্প দিয়ে। অন্যধরনের মা।

বীরাঙ্গনা শেফা তাঁর জবানবন্দিতে বলেছিল,
হঠাৎ অনেক লোকের আনাগোনা, চেচামেচি কানে এল। একজন বাঙ্কারের মুখে উকি দিয়ে চিৎকার করল, কোই হ্যায়; ইধার আও। মনে হলো আমরা এক সঙ্গে কেঁদে উঠলাম। ঐ ভাষাটা আমাদের নতুন করে অতঙ্কগ্রস্ত করল। এরপর কয়েকজনের মিলিত কন্ঠ, এবারে মা আপনারা বাইরে আসুন। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা আপনাদের নিতে এসেছি। চিরকালের সাহসী আমি উঠলাম। কিন্তু এতো লোকের সামনে আমি বিবস্ত্র, উলঙ্গ। দৌড়ে আবার বাঙ্কারে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু যেই বলিষ্ঠ কন্ঠ আমাকে আওয়াজ দিয়েছিল, “কোই হ্যায়” বলে, সেই বিশাল পুরুষ আমাকে আড়াল করে দাড়িয়ে নিজের মাথার পাগড়ীটা খুলে আমাকে যতটুকু সম্ভব আবৃত করে করলেন। ভেতর আরও ছয়জন আছে বলায় আশপাশ থেকে কিছু লুঙ্গি, শার্ট জোগাড় করে ওরা একে একে বেরিয়ে এলো এবং ওদের কোন রকমে ঢাকা হলো। আমি ওই শিখ অধিনায়ককে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে ওঠলাম। ভদ্রলোক আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, রো মাৎ মাই…

এই বীরাঙ্গনা স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে গিয়েছিল। বিয়েও হলো। প্রথম সন্তানের নাম তার শশুরবাড়ির লোকজন দিলেন আরমান। কিন্তু শেফা ওকে ডাকে “যোগী” বলে। এর কারণ হচ্ছে, সেই শিখ ভারতীয় সেনার নাম ছিল যোগন্দির সিং; যে তার পবিত্র শিরস্ত্রাণ খুলে শেফার অপবিত্র উলঙ্গ দেহটাকে ঢেকে দিয়েছিল। আর তাঁকে মাতৃ সম্বধণ করেছিল। তাই শেফা মনে মনে সেই শিখকে তাঁর প্রথম সন্তানের মর্যাদা দিয়েছিল। এজন্যই সে তার প্রসবকৃত প্রথম সন্তানকে যোগী বলে ডাকে। আরমান যেনো তাকে সারা জীবন এভাবে হেফাজতে রাখে!

মা না হয়েও শেফার মন তখন সেই ভারতীয় সেনার জন্য মমতায় ভরে গিয়েছিল। যোগন্দির সিং শেফার উলঙ্গ দেহ ঢেকে দিয়ে শেফার হৃদয়ে সন্তানের জায়গা করে নিয়েছিল। এটা হয়তো খোদ সেই সেনাও জানে না। আর ইতিহাস জানবে কিভাবে!!
ইতিহাস বরাবর মাদের ভুলে যায়। তাদের পবিত্র আত্মা, পবিত্র মমতা, অসীম সাহসের কথা কেউ বলে না। মাদের ইতিহাসেও অসহায় করে রাখা হয়েছে।
প্রতিটি যোদ্ধার মা এক একজন রত্নগর্ভা। যেই রত্নগর্ভ মা’রা শহীদ যোদ্ধাদের নিজ দেহের অভ্যন্তরে লালিত করেছেন তার জন্য এ জাতি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এ জাতির উচিত প্রথমে তাদের সম্মানে ভূষিত করা।

এতো কিছুর পরও সন্তান হারানোর বেদনা বুকে নিয়েও তারা বাংলার পতাকা উড়ায়। এ পতাকা যে তাদের সন্তানের স্বপ্ন। সন্তানেরা এ পতাকার জন্যইতো বিলিয়েছে প্রাণ! তাই সন্তানের স্বপ্ন পূরণ হবার খুশীতে তারা ভুলে যায় সন্তান হারাবার বেদনা আর গর্বের সাথে গেয়ে ওঠে– আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।
———————————————————————————

তথ্যসূত্র:
১. সরদার ফজলুল করিম, পৃষ্ঠা: ১৭৬
২.কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, ১৯৯২, পৃষ্ঠা: ২৭৯
৩.নীলিমা ইব্রাহিম, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, ঢাকা, জাগৃতি প্রকাশনী, পৃষ্ঠা: ১৬
৪.মালেকা বেগম, একাত্তরের নারী, দিব্যপ্রকাশ, সপ্তম অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *