RK 623 : মুক্তিযুদ্ধের রহস্যময় এক নৌ-কাফেলা

১০ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তানের ভারত আক্রমণ এবং সুবাদে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরাসরি অংশগ্রহনের এক সপ্তাহ পুরো হয়েছে। পূর্ব রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর দখলকৃত অঞ্চল দিয়ে ঢাকার দিকে এগোচ্ছে তাদের পদাতিকরা। আকাশে একচ্ছত্র অধিপত্র ভারতীয় বিমান বাহিনীর। জলেও তাই। পাকিস্তানী সাবমেরিন পিএনএস গাজীর অকালপ্রয়াণে বঙ্গোপসাগরে একাধিপত্য ক্যারিয়ার আইএনএস বিক্রান্তের। এই নেভাল ফ্লিট থেকে একে একে উড়ে চট্টগ্রাম-চালনা-খুলনা-মংলায় হামলা চালাচ্ছে তাদের হোয়াইট স্নেক (সি হক) ও কোবরা (এলিজ) বোমারুরা।

দুটো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার জন্ম এসময়, গুরুত্বের বিচারেও তাদের মূল্য সীমাহীন। প্রথমটি মার্কিন সপ্তম নৌবহর ইউএসএস এন্টারপ্রাইজের বঙ্গোপসাগর অভিমূখে যাত্রা। বর্তমান গতিতে (ঘন্টায় ৩৫ নট) তিন-চারদিনের মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে নাক গলাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এই পারমানবিক নৌবহর। দ্বিতীয়টি পাকিস্তানীদের একটি ইন্টারসেপটেড সিগনাল। এই বার্তার সারমর্ম হচ্ছে রাজাপুরে পাকিরা খুব গোপনে ছোট ছোট নৌযান দিয়ে একটি নৌবহর গঠন করেছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রামে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে কিছু উচ্চপদস্থ সেনাকর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ ক’জন রাজনীতিবিদ এবং ব্যবসায়ী। এরপর চট্টগ্রাম থেকে কিছু বানিজ্যিক জাহাজের ছদ্মাবরণে তারা মার্কিন নৌবহরে পালাবে। পাকিস্তানীদের এই গোপন কাফেলার কোড নেম- RK 623, যার অর্থটা বের করা সম্ভব হয়নি।

যদিও সপ্তম নৌবহরের বঙ্গোপসাগরমূখী অভিযাত্রাকে নিক্সন অন্যভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন পরে। তার বক্তব্য ছিলো পূর্ব পাকিস্তানে মার্কিন নাগরিকদের উদ্ধার করার জন্যই এন্টারপ্রাইজকে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গানবোট ডিপ্লোমেসির এই কূটব্যাখ্যাটা কেউই বিশ্বাস করেনি। ভারতকে ভয় দেখানোর পাশাপাশি মিত্র ইয়াহিয়ার খুনে সহযোগীদের বিপদ থেকে রক্ষা করাই ছিলো এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য।

দুয়ে দুয়ে চারের অঙ্কটি মেলানোর পর পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় নৌপ্রধানের তরফে একটি নির্দেশমূলক বার্তা আসে ভারতীয় নৌবহরের অধ্যক্ষের বরাবর। এতে লেখা ছিল:

১. জানা গেছে আজ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের সেনাধ্যক্ষসহ শত্রুপক্ষের বেশ কজন উচ্চপদস্থ অফিসার পালানোর চেষ্টা করবে এবং সম্ভবত তারা নৌপথ ব্যবহার করবে। কিছু কর্মকর্তা আকাশপথ ব্যবহারের চেষ্টা করবে। উপকুলে সম্ভবত মাইন ছড়িয়ে রাখা হয়েছে।

২. তোমাদের মিশন হচ্ছে :

ক. চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে ব্যবহার অনুপযোগী করা
খ. বিমান এবং জাহাজ থেকে বন্দরে জাহাজগুলো আক্রমণ।
গ. কুতুবদিয়ার আউটার এবং ইনার চ্যানেলে মাইন স্থাপন করা।

৩. সম্ভবত পূর্ব রণাঙ্গনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিশন হতে যাচ্ছে এটি। শত্রুকে যে কোনো উপায়ে ধ্বংস করতেই হবে। শুভকামনা রইল।

পাকিরা এই ঝুঁকিটা নেওয়ার পেছনে একটি হিসেব কাজ করছিলো। তাদের কাছে খবর ছিলো আইএনএস বিক্রান্তের জ্বালানী ফুরোচ্ছে। রিফুয়েলিংয়ের জন্য যাওয়া ও আসায় এর দুদিন লাগবে। এই দুদিনের অনুপস্থিতি সফলভাবে কাজে লাগাতেই মূল পরিকল্পনা। এর বাইরে আরেকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনের খবর আমরা পাই যেখানে রাও ফরমান আলীসহ বেশ কজন সিনিয়র পাকিস্তানী অফিসারকে হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। সুবাদেই সেরাতে ঢাকায় বিমানহামলা তীব্রতর করেছিল ভারতীয় বিমান বাহিনী।

১১ ডিসেম্বর দিনটা ‘নো উইন্ড ডে’ যে কারণে বিক্রান্ত থেকে সি-হক ওড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। দায়িত্বটা নেয় এলিজ। ভোর ৬টায় প্রথম এলিজটি আকাশে ওড়ে। রাজাপুরে RK 623র সম্ভাব্য গোপনস্থানসহ বেশ কটি জায়গায় বোমাবর্ষন করে এটি। পাশাপাশি নজরদারি উড়াল দেয় বরিশাল, মেঘনা নদী এবং দক্ষিণ শাহবাজপুরের ওপর।

সকাল দশটায় আরেকটি এলিজ একই উদ্দেশ্যে ওড়ার পর অদ্ভুত একটি ব্যাপার লক্ষ্য করে। ছোট একটি দ্বীপ নড়াচড়া করছে! ব্যাপারটা কি ভালো করে দেখার জন্য ডাইভ দেয় এলিজ এবং কাছাকাছি আসতে বুঝে যায় এটি আসলে একটি গানবোট (পরে এর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে পিএনএস যশোর বলে)। খুব কাছাকাছি অবস্থানে থাকা কয়েকটি বার্জ ও একটি টাগবোট সহকারে একটি বহর এটি। বিমানের চোখে ধুলো দিতে কৌশলে উপরিভাগে কাদা ও ঘাসের চাপড়া ব্যবহার করা হয়েছে যার জন্য এটিকে দ্বীপ মনে হয়। বেশ কিছু বিমানবিধ্বংসী কামান দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে বহরটির। এলিজের বৈমানিক বুঝে যান RK 623 এর দেখা পেয়ে গেছেন তিনি।
রকেট এবং ডেপথচার্জ সহকারে আক্রমনে যায় এলিজ। সঙ্গী হয় আগেরটিও। বহরের কামানগুলো গর্জে ওঠে, নিস্তব্ধ হতেও সময় নেয় না। একটি এলিজে ৬টি বুলেট আঘাত হানে, কিন্তু দক্ষ পাইলট তা ফিরিয়ে নিয়ে যান ক্যারিয়ারে। বিধ্বস্ত পাকি নৌবহর ছত্রখান হয়ে যায়। সাড়ে ১১টায় একই জায়গায় দুটো সন্দেহজনক বজরায় হামলা চালায় আরেকটি এলিজ। ডেপথ চার্জে বিস্তর ক্ষয়ক্ষতি হয় নৌযান দুটোর। পাইলট সাঁতরাতে দেখেন সেনাবাহিনীর পোষাকধারী যাত্রীদের।

একই সময় তুমুল আক্রমণে চট্টগ্রাম নৌবন্দর একদমই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এভাবেই ভেস্তে যায় পাকিদের একটি পালানোর চেষ্টা।

সূত্র : ভারতীয় নৌবাহিনীর দলিলপত্র

কৃতজ্ঞতা : জন্মযুদ্ধ ‘৭১ (পান্ডুলিপি)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *